অতীত দিনের সিলেট: বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও একটি অলোক দর্শন পাঠ

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২১, ০৮:১০ পিএম

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ অতীতের কথা বলে আসছে। বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা, বিশ্বাসের কথা, সুখে দুঃখে দিন যাপনের কথা নবীনেরা আগ্রহভরে শোনে, পড়ে। সমবয়সীরাও জানতে চান পড়তে চান ওই প্রান্তের—ওই অঞ্চলের—ওই সমাজের—ওই ব্যক্তির অতীতের কথা। অতীত গুরুত্বপূর্ণ বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য। অতীত যথাসম্ভব পরিচিত করায় জীবন, জগৎ ও মানুষের কৃষ্টি। দেখায় মানুষের ও প্রকৃতির পরিবর্তন ও বিবর্তনের অনিবার্য অধ্যায়সমূহ। ফিকশনে, ননফিকশনে অতীত উঠে আসে। ব্যক্তির পর্যবেক্ষণ থেকে স্মৃতিচারণমূলক খণ্ড খণ্ড লেখা আর ধারাবাহিক আত্মকথার মাঝে কিঞ্চিৎ ফারাক থাকলেও দুইই অতীতের অভিজ্ঞতার কথা; দুইই লেখকের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির বয়ান।

অতীত বহুভাবে আমাদের সামনে আসে। গল্প-উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক, সিনেমা, ইতিহাস, ট্রাভেলগ, স্মৃতিকথার মাধ্যমে অতীতের ঘটনাবলির ভিতর-বাহির আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়। দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছিলেন, ‘ভবিষ্যৎ ভালো করে চালাতে চাইলে অতীত পড়া দরকার’। অতীতের কথা প্রেরণা দেয়; প্রথা-ঐতিহ্য-পরম্পরা সম্পর্কে সচেতন করে, সমৃদ্ধ করে।

কথা বলছি সাংবাদিক, কবি, গবেষক, অনুবাদক ও শিক্ষক নিজাম উদ্দীন সালেহ বিরচিত স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ ‘অতীত দিনের সিলেট’ প্রসঙ্গে। সিলেটের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত আপামর সাধারণের জীবনঘনিষ্ঠ কিছু অভিজ্ঞতার কথা লেখক তার স্মৃতির ভান্ডার থেকে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরেছেন বইটিতে।

২৩১ পৃষ্ঠার বইটিতে ২২৭ অনুশীর্ষ রয়েছে বিভিন্ন বিষয়ের। কিছু সারগর্ভ ও চমকপ্রদ অধ্যায়ের ভিত্তিতে আলাপ নিম্নরূপ:

ক.

কোন অঞ্চলের ছোট পরিসরের সাধারণ মানুষের জীবনাচার থেকে পাওয়া যেতে পারে মানবজাতির জন্যে অপরিহার্য অতুলনীয় দর্শনের সারাৎসার।

প্রসঙ্গত তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসটির উল্লেখ করা যায়। সেটা এ কারণে যে রাঢ় অঞ্চলের কোপাই নদীর হাঁসুলির মতো বাঁকের তীরের বাঁশবাদি গ্রাম, যে-গ্রামের দু’পাড়ায় থাকা ক্ষুদ্র কাহার জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস ও সংগ্রামকে উপজীব্য করে অসাধারণ ক্ল্যাসিক উপন্যাস লিখেছিলেন তারাশঙ্কর। সেটিতে উপন্যাস রূপে একটি গ্রামের দুই পাড়ার অতীতের একটি সময়খণ্ডের পালকি বাহকদের ও কৃষকদের জীবনচিত্র শৈল্পিকভাবে বিবৃত হয়েছে।

উল্লেখ্য, নিজাম উদ্দীন সালেহ তাঁর বইটিতে বিগত প্রায় অর্ধশত বছর সময়খণ্ডের টুকরো টুকরো দৃশ্য ধারণ করেছেন ভাষায়। ১ মার্কিন ডলার সমান ৫ টাকা পাওয়া যেত যে-সময়ে, সেই সময়ের সিলেটের সমাজজীবনের নানা দিকও আছে তাতে। আছে একটি সারগর্ভ টুকরো চিত্র; সারা দিন রিকশা চালিয়ে ৩/৪ টাকার বেশি রুজি করতে পারত না সে ঠিক, তবে এ রুজিতেই সংসার চালিয়ে নিজ দেশে (অন্য জেলায়) কয়েক বছরে রিকশাড্রাইভার লোকটি ‘১০ কানি’ জায়গার মালিক হতে পেরেছিল। এ সফলতা এসেছে তার পরিশ্রম, আন্তরিকতা ও দক্ষতার কারণে। সেই সময়ে এক কেজি চাল পাওয়া যেত চার আনায়।

খ.

বইটির শুরু হয়েছে আত্মস্মৃতি বলার বাকভঙ্গিতে। বিগত শতকের ষাটের দশকের কোনো এক সনে সিলেট শহরে তার পিতার পরিবার এসেছিলেন। তখন তিনি ৬/৭ বছরের বালক। সিলেট শহরের শিবগঞ্জ এলাকার লাল মাটি দেখে বালক নিজাম উদ্দীন বিস্মিত হয়েছিলেন। তিনি ঐ মাটি হাতে নিয়ে বারবার বুঝতে চেষ্টা করতেন—কেন এ মাটি লাল।

তিনি লিখেছেন "শাহজালালের (রহ) পুণ্যভূমির এই ব্যতিক্রমধর্মী মাটি একরাশ বিস্ময় নিয়ে প্রতিভাত হলো। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সেই মাটি পরীক্ষা করতাম, সারা দিন খেলা করতাম সেই মাটি নিয়ে। শহরের আরও কিছু জিনিস ও বিষয় আমার শিশু মনকে বিস্মিত ও আকৃষ্ট করতো। এর মধ্যে ছিলো বৈদ্যুতিক বাতি বিশেষভাবে বাসা থেকে পূর্বদিকে দৃশ্যমান সিলেট রেডিও স্টেশনের উঁচু টাওয়ারের লাল বাতি। সুখের বিষয়, লেখালেখি শুরুর পর কয়েক বছরের মধ্যেই সিলেট রেডিও স্টেশনের এই রিলে কেন্দ্র থেকে এক সাহিত্য অনুষ্ঠানে সরাসরি কবিতা পাঠের সুযোগ পেয়েছিলাম।"

গ.

মানুষ যখন থেকে কথা বলা শিখেছে, ঠিক সেই সময়খণ্ড থেকে জগতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দর্শন কী জিনিস মানুষ বুঝতে পারত না। খাওয়া, ঘুম, প্রজনন, মারামারি ও ভালোবাসা নিয়ে মশগুল থাকত প্রায় দুই মিলিয়ন বছর আগের হোমো সেপিয়েন্স, মানে আমরা যাদের বংশধর তারা। গবেষণা দেখায় দুই মিলিয়ন বছর আগে মানুষ চিল্লা-চিৎকার-কান্না করে করে মনের ভাব প্রকাশ শুরু করেছিল। তারপর ধীরে ধীরে ভাষা ফুটতে থাকে। তারপর পার হলো বহু সহস্র বছর। মানুষের অন্তর্দৃষ্টি ফুটল। বংশপরম্পরায় জগৎ দেখতে দেখতে দেখল ‘দর্শন’ দেখা যায়, টুকরো টুকরো জগৎ বাস্তবতার সত্য দেখা যায়। সক্রেটিস-পূর্ব আমলে মানুষ দর্শনের (দেখা) মাধ্যমে দর্শন (ফিলোসফি) বুঝবার যোগ্য হয়ে উঠল। কালক্রমে সে-দেখা বস্তুর অন্তর দেখার দিকে উন্নীত হলো।

‘অতীত দিনের সিলেট’ বইটিতে ‘ঘাতক ট্রাক ও বুধাই’ শীর্ষক অধ্যায়ের মাঝামাঝি লেখক চমৎকারভাবে একটি কার্য-কারণ তত্ত্বের সামনে হাজির করেন পাঠককে। তিনি লিখেছেন—

"আমি তখন নিতান্ত শিশু। জন্ম মৃত্যু সম্পর্কে তেমন কোন ধারণাই ছিল না। তবে সহজাত কারণে মৃত্যুকে ভয় পেতাম। অত্যন্ত শৈশবে আমাদের বাড়ির নিকটে রাস্তার ওপারে গোরস্থানে একটি শিশুকে কবর দিতে দেখে আমার বুকের গভীরে ভয় ঢুকে গিয়েছিল। আমি ভাবতে পারছিলাম না ছোট্ট শিশুটি মাটির অভ্যন্তরে থাকবে কীভাবে। তখন থেকে মৃত্যুকে আমি ভয় করতাম। কিন্তু ওই বালকটির মৃত্যুর কথা শুনে আমার সে-রকম কোনো অনুভূতি সৃষ্টি হয়নি। হ্যাঁ, এর পেছনে একটি বেদনাদায়ক কাহিনি আছে, সেটা নির্যাতনের, দুর্ভোগের।"

মানে ১০/১২ বছরের বুধাই ছেলেটি পথ আগলে খাবার বা দুই চার আনা যা পেত কেড়ে নিত। এ ছিল একটি শিশুর জন্য খুব যাতনা। তাই বুধাই ট্রাকের তলায় পিষ্ট হয়ে মারা যাওয়ায় শিশু নিজাম উদ্দীন খুশি হয়েছিল।

ঘ.

কবি আল মাহমুদ লিখেছিলেন, "অতঃপর অবশিষ্ট কিছুই থাকে না

জলপ্রিয় পাখিগুলো উড়ে উড়ে ঠোঁট থেকে মুছে ফেলে বাতাসের ফেনা"।

থাকে না থাকে না, কিছুই থাকে না। প্রবহমান সময়ে সবকিছু বয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে গেছে কত নগর প্রান্তর স্থলভাগ, কত স্মৃতিস্তম্ভ মুছে গেছে। 'কালের যাত্রার ধ্বনি' কেউ শুনতে পাক বা না পাক, কালের গর্ভে জন্ম মৃত্যুর লীলা চলমানতাবিহীন না। ইতিহাস সচেতন লেখক নিজাম উদ্দীন সালেহ তাঁর পাঠককে জানান, সিলেটের ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য রায়নগরের রাজা গিরিশচন্দ্রের বাড়িটির কিছুই অবশিষ্ট নেই।

উল্লেখ্য, রায়নগরের বিখ্যাত জমিদার মানিকচাঁদের পুত্র মুরারীচাঁদের সন্তানহীনা কন্যা ব্রজ সুন্দরী দেবী নিয়েছিলেন গিরিশ চন্দ্রকে দত্তক। ফলে তিনি রায়নগরের জমিদার মুরারীচাঁদের বিশাল সম্পত্তির মালিক হয়েছিলেন। রাজা গিরিশ চন্দ্র নিজে নিরক্ষর ছিলেন কিন্তু  শিক্ষার প্রসারে তিনি সম্পদ ব্যয় করেছিলেন। তিনিই তৎকালীন আসামের প্রথম কলেজ এম.সি. কলেজ (মুরারীচাঁদ কলেজ) ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এছাড়া তিনি ১৮৮৬ সালে রাজা গিরিশ চন্দ্র হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

ব্যক্তি মানুষ বা কোন গোষ্ঠী মরে যাওয়ার কারণেই তার বংশধারা নিশ্চিহ্ন হয় না ঢালাওভাবে। কোনো কারণে মানুষ দেশান্তরে যায়। জন্মভূমি ছেড়ে যেতে হয়। ব্যবসা বা চাকরির জন্য যায়। কেউ ফিরে কেউ ফিরে না। গ্লোবাল মোবিলাইজেশন হতে থাকে। বাঙালির সন্তান হয় ব্রিটিশ, আমেরিকান বা কানাডীয়। ভারতীয়ের সন্তান হয় আমেরিকান বা আফ্রিকান বা ইউরোপীয়। এমনও হতে পারে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ যার বর্তমান পরিচয়, তার চার/ছয় পুরুষ আগের পুরুষটি বা নারীটি হয়তো ব্রিটেন থেকেই ভারতে চলে এসেছিলেন একেবারে। অথবা হতে পারে তারই বিশ পুরুষ আগের লোকটি পশ্চিম এশিয়ার বা পশ্চিম আফ্রিকার কোন অঞ্চলের লোক। গবেষণা দেখায় আফ্রিকা থেকেই মানুষ ছড়িয়েছে বিশ্বব্যাপী। নিজাম উদ্দীন সালেহ লিখেছেন, "ষাটের দশকে সিলেট শহরে অনেক বিহারি ও জুনাগড়ির বাস ছিলো। এরা ভারত বিভক্তির সময় ভারতের বিহার ও জুনাগড় থেকে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। তারা উর্দুতে কথা বলতেন। শহরের বন্দরবাজারে তাদের অনেক দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। তারা ভারতীয় মাড়োয়ারিদের মতো জাত ব্যবসায়ী ছিলেন। খুব সামান্য পুঁজি দিয়ে কীভাবে বড় ব্যবসায়ী হতে হয়, তা তারা ভালোই জানতেন। সিলেট শহরের মিরাবাজারে দাদাপীরের মাজারের বিপরীতে রাস্তার পাশে এক বিহারি বা জুনাগড়ি পরিবার বাস করতেন।"

ঙ.

কবি নিজাম উদ্দীন সালেহ শিক্ষকতা করেছেন সাংবাদিকতার পাশাপাশি বহুদিন। তিনি লিখেছেন:

"আমি জীবনের বেশ কিছু সময় সাংবাদিকতার পাশাপাশি শিক্ষকতা করেছি। ইংরেজি বিষয় পড়াতাম। শিক্ষকতা জীবনে আমার অনেক ছাত্রছাত্রী এখন দেশে বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত এদের মধ্যে মধ্যে শাবির কৃতী অধ্যাপক সাহিত্যিক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল ও অধ্যাপিকা ড. ইয়াসমীন হকের ছেলেমেয়ে নাবিল ইকবাল ও ইয়েসিম ইকবাল রয়েছে। তারা অনেক আগেই যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সেখানে কর্মরত। এছাড়া বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী শিক্ষক ও সাহিত্যিক আহমদ রশিদ ও (রশিদ আহমদও) আমার ছাত্র। এছাড়া আমার আরেক ছাত্রের কথা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। সে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, সুদর্শন আমিমুল আহসান তামিম। স্কুলে পাঠ্যাবস্থায় অত্যন্ত ভদ্র নম্র স্বভাবের তামিম ছিল আমার প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। আমার লেখার ভক্ত। সবচেয়ে বড় পরিচয় সে সিলেটের সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব মরহুম ফজলুল করিমের পুত্র। তামিম বর্তমানে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত। বাঙালি কমিউনিটিতে সে সুপরিচিত। ফজলুল করিম আজাদ বয়সে বড় হলেও তার সাথে সম্পর্ক ছিল বন্ধুসুলভ।"

চ.

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর তৎকালীন অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রথম এবং শেষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল।

কিন্তু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সে নির্বাচনের পর বিজয়ী শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নি। এ কারণে সৃষ্ট তীব্র রাজনৈতিক সংকট শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দিকে যায়। যার সমাপ্তি হয় স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে।

সত্তরের নির্বাচনী প্রচারণার সময় একদিন বঙ্গবন্ধু সিলেট শহরের শিবগঞ্জ বাজারে সামান্য সময়ের যাত্রা বিরতি করে পথসভায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই সময়ের কৌতূহলী বালক নিজাম উদ্দীন সালেহ তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বইটির ১৫৩ পৃষ্ঠায় তিনি স্মৃতিচারণ করেন এভাবে: "নির্বাচনী সফরে বঙ্গবন্ধু এদিকে এসেছিলেন। আর স্থানীয়দের অনুরোধে শিবগঞ্জ বাজারে ৪-৫ মিনিটের জন্য যাত্রা বিরতি করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রেখেছিলেন। আমার মনে আছে ২-৩ মিনিট বক্তব্য রাখার পর বঙ্গবন্ধু চলে যান। তার চেহারায় কিছুটা উদ্বেগের ছাপ থাকলেও তা ছিলো প্রশান্ত ও গাম্ভীর্যপূর্ণ। তার মাঝে তখন বেশ তাড়া ছিল,  হয়তো নির্বাচনী প্রচারণার কাজে তখন অত্যন্ত ব্যস্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এই আমার প্রথম এবং শেষ স্মৃতি। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পরে সম্ভবত ১৯৭৬ সালে, আমি ঢাকায় বেড়াতে গেলে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি দেখতে গিয়েছিলাম।"

বইটিতে 'যুদ্ধের স্মৃতি' শীর্ষক অধ্যায়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন এক টুকরো স্মৃতিকথা রয়েছে।

ছ.

সিলেট শহরের আয়তন গত শতকের ষাটের দশকে কতটুকু ছিল?

এ প্রশ্নের উত্তর রয়েছে বইটির একটি অধ্যায়ে এভাবে:

"ষাটের দশকে পূর্বদিকে টিলাগড়, পশ্চিম দিকে মধুশহীদ-ভাতালিয়া, সাগরদীঘির পার, উত্তর দিকে আম্বরখানা-চৌকিদেখী এবং দক্ষিণ দিকে দক্ষিণ সুরমায় রেলস্টেশন এলাকার মধ্যেই বলা যায় সীমাবদ্ধ ছিল সিলেট শহর। এসব সীমানা পেরোলেই মনে হতো গ্রামাঞ্চলে এসে পড়েছি। সন্ধ্যার পর টিলাগড় পেরোলেই গা ছম ছম করত। মেজরটিলার দিকে যেতে ভয় করতো। বেবী ট্যাক্সি ও বাস চলাচল করলেও রাতে খুব কম রিকশা চালকই ওইদিকে যেতে চাইতো। কখনো চুরি, ডাকাতি কিংবা ছিনতাইয়ের ঘটনা না ঘটলেও ভয়াল নিস্তব্ধতা এবং পাহাড়টিলা জঙ্গলের পরিবেশ যে কারওর মনে ভয় ধরিয়ে দিতো। একই অবস্থা ছিল আম্বরখানার দিকে সালুটিকর সড়কে।"

জ.

‘টিলাগড়ের সাবাল পীর’ অধ্যায়টি আমাকে খুব স্পর্শ করেছে। এই পির সাহেবের কারামা সম্পর্কে আমিও শুনেছিলাম। ‘অতীত দিনের সিলেট’ বইয়ের এ অধ্যায়টির ম্যাগনেটিজম পাঠককে অধ্যায়টির শেষ পর্যন্ত ধরে রাখে। এমনিতেই আমি কামেল ইনসানদের কথা বা এ্যাক্সট্রাসেন্সরি পারসেপশনের কথা (ইএসপি) আগ্রহভরে শুনি বা পড়ি। অলোক দর্শন বা আনইউজুয়াল পারসেপশন, প্যারা সাইকোলজি ব্যাপারগুলো বেশ কৌতূহলোদ্দীপক।

বইটির ২১২ পৃষ্ঠায় লেখক জানিয়েছেন, "এছাড়া আরেকটি অলৌকিক ঘটনা আমি লক্ষ্য করেছি। একদিন আমার পাকস্থলীর অবস্থার বেশ অবনতি ঘটলে আমি পীরের বাসায় যাই। গিয়ে আমার অবস্থা জানালে, পীর সাহেব বললেন, 'হালুয়া খেলে কেনো'? আমি বললাম, 'আমি তো কোনো হালুয়া খাইনি'। তিনি বললেন, 'ওই যে কবিরাজী হালুয়া'। আমি বিস্ময়ে ‘থ’ বনে গেলাম। আসলেই আমি আমার পিতার আয়ুবেদী ফার্মেসীতে রাখা বেশ কিছু পরিমাণ চ্যবনপ্রাশ নামক হালুয়া খেয়ে ফেলেছিলাম। অত্যন্ত ভিটামিন সমৃদ্ধ ও শক্তিসম্পন্ন হওয়ায় সেটা হজম করতে না পারায় আমার পাকস্থলী আপসেট হয়ে পড়েছিলো । কথা হচ্ছে, পীর সাহেব জানলেন কিভাবে আমি চ্যবনপ্রাশ খেয়েছি!"

এই গুণী সাবাল পিরের অছিলায় বহু মানুষ দুরারোগ্য অসুখ থেকে মুক্তি পেয়েছেন বলে আমিও শুনেছিলাম আমার দাদির কাছ থেকে।

ঝ.

বইটির শেষ অধ্যায় সিলেটের কর্মবীর মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে নিয়ে। বিশেষত সিলেটের এ মেয়রের উদ্যোগে শহরের রাস্তা, গলিপথ প্রশস্ত করা, নালা খাল অপদখলমুক্ত করা, পানি নিষ্কাশন সহজীকরণ আর ব্যাপকভাবে সংস্কার করার দিকটি উল্লেখ করা হয়েছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও ঢাকার মেয়রও সিলেটের এ মেয়রের বীরোচিত কাজের প্রশংসা করেছেন। দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সকলের সুবিধার্থে কাজ করার মনন মেধা শক্তি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। নিজাম উদ্দীন সালেহ লিখেছেন:

"সিলেট এমসি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সে পাঠ্য ছিল ইংরেজ কবি লর্ড আলফ্রেড টেনিসনের ইউলিসিস কবিতাটি। ‘ইউলিসিস’ হচ্ছেন এমন এক ব্যক্তি যিনি কাজ না করে বসে থাকতে পারেন না । কবি টেনিসন তাকে 'ম্যান অব অ্যাকশন' অর্থাৎ কাজের লোক বলে আখ্যায়িত করেছেন তার কবিতায়। সিলেটের সিটি মেয়রকে দেখলে আমার সেই ইউলিসিসের কথা মনে পড়ে যায়। আসলেই আরিফুল হক একজন ‘ম্যান অব অ্যাকশন'।"

বইটিতে সাধারণ মানুষের জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট অধ্যায়গুলো তাৎপর্যপূর্ণ।

অসাধারণ রুশ লেখক লেভ তলস্তয় নিজে জমিদার হয়েও সমাজের 'উচ্চ শ্রেণির' মানুষের অন্তঃসারশূন্য জীবন যাপনের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন, তথাকথিত উপরতলার অহংকারী লোকেরা প্যারাসাইটের জীবন যাপন করে মরে যায়। ওরা কেবল অমুক তমুকের জীবন যাপন অনুসরণ করতে ব্যতিব্যস্ত থাকে। তাদের কাজ-কর্মে বিশ্বাসে আন্তরিকতা থাকে না। অপরদিকে সাধারণ কৃষক শ্রেণির মানুষ অকৃত্রিম, আন্তরিক ও ধর্মপ্রাণ। তলস্তয় সাধারণ মানুষের জীবনের কাছে ফিরে এসে দেখতে পেয়েছিলেন জীবন কীভাবে অর্থবহ হয়।

কবি নিজাম উদ্দীন সালেহ বিরচিত 'অতীত দিনের সিলেট' পাঠকপ্রিয় হোক। বইটি প্রকাশিত হয়েছে পাণ্ডুলিপি প্রকাশন থেকে।

লেখক: সারওয়ার চৌধুরী, অনুবাদক ও কবি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত