সম্ভবত রাবেয়া খাতুনই ঢাকার সিনিয়র সাহিত্যিকদের সেই হাতেগোনা ক’জনের ভেতর পড়বেন যার সঙ্গে সামনা-সামনি পরিচয় বা কথাবার্তা একবারের জন্যও আমার হয়নি। লেখালিখির গোটা জীবনে সেলিনা হোসেন, রিজিয়া রহমান, হাসান আজিজুল হক, শওকত আলী, রশীদ হায়দার, আল মাহমুদসহ জীবিত-প্রয়াত বা পুরুষ কি নারী লেখক নির্বিশেষে এদের অনেকের সঙ্গেই অন্তত একবার সামনা-সামনি দেখা বা কথা হয়েছে। অথচ, রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে সেটা হয়নি। তবে, ‘অনন্যা’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক দিল মনোয়ারা মনু আপা যতদিন বেঁচে ছিলেন এবং ‘অনন্যা’র দায়িত্বে ছিলেন, ঈদ সংখ্যায় তাকে একটা লেখা দিতেই হতো। মাঝে মাঝে ‘অনন্যা’ অফিসে গেলে মনু আপার কাছে রাবেয়া খাতুনকে নিয়ে অনেক গল্প শুনতাম। ‘অনন্যা’য় মিসরসহ নানা দেশে রাবেয়া খাতুনের ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী মুদ্রিত হতো। একবার ঈদ সংখ্যায় একটি উপন্যাসও পড়লাম। এপার বাংলার দুই তরুণী পাশের দেশের দার্জিলিংয়ে বেড়াতে গিয়ে বাসে তাদের নাম শুনে এক মধ্যবয়সিনী নারীর রক্ষণশীল উক্তির প্রতিবাদে সেখানকার দুই যুবকের প্রতিবাদ এবং তারপর পারস্পরিক বন্ধুত্ব তৈরি হওয়ার কাহিনী। উপন্যাসের নামটা মনে নেই, পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল কি না সেটাও জানি না। তবে, অত আগের প্রজন্মের লেখক হয়েও ভাষা খুব গতিশীল এবং প্রেমের দৃশ্যের চিত্রায়ণ যত সাবলীলভাবে করেছেন, সেটা এই প্রজন্মের মেয়ে হয়েও তো আমি পারি না বা অদ্যাবধি পারিনি।
তবে, সিরিয়াস কথাশিল্পী রাবেয়া খাতুনকে আমি চিনেছিলাম বলতে গেলে শৈশবেই। পাবনায় থাকার সময়ে বাসাভর্তি বইপত্রের ভেতরে সে-সময়কার একটি নির্বাচিত গল্প সংকলনে তার একটি গল্প বোঝা না বোঝার ভেতরেই কেমন এক ঘোর তৈরি করেছিল আমার ভেতরে। কাহিনীর নায়ক একটি প্রত্যন্ত জনপদে কাজে গেছে। একদিন বুনো পাড়ায় একটি নিমন্ত্রণে যায় সে। মাদল বাজছে আর নাচছে বুনো মেয়েরা। সেই মাদলের শব্দ এত তীক্ষè ভাষা-ভঙ্গিমায় লেখা ছিল যে আজও আমার হৃদয়ে সেই শব্দ যেন শুনতে পাই। দুঃখিত আমি সেই গল্পটির নামও ভুলে গেছি।
বাংলাদেশে আমাদের প্রকাশনা জগতের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো দেশি লেখকদের বইপত্র দোকানে প্রায়ই পাওয়া যায় না। নার্স বা সেবিকাদের জীবন নিয়ে লেখা রাবেয়া খাতুনের একটি উপন্যাস বিস্তর দোকানে দোকানে খুঁজেও আমি পাইনি। আমাদের দেশেরই সিনিয়র অনুবাদকের করা হেনরি ল্যুইস মর্গানের ‘এনসিয়েন্ট সোসাইটি’র অনুবাদ বইয়ের দোকানে আপনি খুঁজে তেমন একটা পাবেন না পাবেন ওপার বাংলার অনুবাদ। আমাদের প্রজন্মের লেখকদের বইই যেখানে খুঁজে পাওয়া কঠিন, সেখানে রাবেয়া খাতুনের প্রজন্মের বই কীভাবে পাবেন? এজন্যই ‘দেশ রূপান্তর’ থেকে আমাকে যখন তার ওপর লিখতে বলা হলো, তখন দ্বিধাগ্রস্ত বোধ করছিলাম যে কী লিখব তাকে নিয়ে। যতটা পড়া উচিত ছিল তাকে, তার কিছুই যে পড়িনি!
‘অনন্যা’র দিল মনোয়ারা মনু আপা অবশ্য রাবেয়া খাতুনকে নিয়ে অনেক গল্প প্রায়ই করেছেন। বিবাহ বিচ্ছিন্ন জীবনে কয়েকটি সন্তানকে মানুষ করার সংগ্রাম এবং সেই পরিশ্রম ভুলতেই হয়তো সাহিত্যের সঙ্গে তার ক্রমাগত জড়িয়ে যাওয়া। ‘সাগর (ফরিদুর রেজা সাগর) কিন্তু মায়ের এই স্যাক্রিফাইস ভোলেনি,’ খুব ধীরস্থির ও মৃদুভাষী মনু আপা বলতেন, ‘রাবেয়া আপা যে বয়সে ডিভোর্সি হলেন...বাচ্চাগুলো ছোট ছোট...চাইলে আবার বিয়ে করতে পারতেন। দেখতেও সুন্দরী ছিলেন। কিন্তু পুরুষেরা যেমন সহজে বাচ্চাদের ছেড়ে আর একটি বিয়ে করতে পারে, মেয়েরা তো তা পারে না। সাগর সেজন্যই আজও পৃথিবীর যে দেশে বেড়াতে যাক, সঙ্গে করে মা’কে নিয়ে যাবে। জানে যে মা ঘুরতে ভালোবাসে।’ ‘চ্যানেল আই’-এর স্বনামধন্য ফরিদুর রেজা সাগর যে সুযোগ্য মায়ের সুযোগ্য সন্তান, সেটাও মনু আপার কাছ থেকেই জেনেছিলাম।
একটা বিষয় সামান্য অবাক লাগছে। এই যে রাবেয়া খাতুনের প্রয়াণের পর তাকে নিয়ে যতগুলো লেখায় চোখ বোলালাম, কখনোই তার জীবনের দীর্ঘ, একা মায়ের সংগ্রামের কথা কোথাও লেখা হয়নি। সে প্রসঙ্গ অনুক্ত, অনুচ্চারিত। কেন? একজন নারী বিবাহবিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন বলেই সেটা ‘নিরুক্ত’ থাকতে হবে? সে প্রসঙ্গ সন্তর্পণে এড়িয়ে যেতে হবে? কিন্তু সেই বিচ্ছেদ তো তার জীবনের সৃজন, সন্তানদের বড় করাসহ কোনো কাজে কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। তবে কেন এই প্রসঙ্গটি আমরা সন্তর্পণে এড়িয়ে গেলাম? তবে কি এই দক্ষিণ এশীয় সমাজে হাজারটা দাম্পত্য সমস্যা সত্ত্বেও পাড়া-পড়শির সামনে হাসিমুখে বর-বাচ্চাসহ সতী-লক্ষ্মী নারীর জীবন অথবা মেরে-কেটে যাবতীয় ইন্দ্রিয় দমনকারী জীবন ছাড়া নারীর আর কোনো জীবন আজও আমাদের সমাজে গৃহীত নয়? অথচ, রাবেয়া খাতুন সেই কত আগে সমাজে বিবাহবিচ্ছিন্ন নারীর যাবতীয় সংকট মেনে নিয়ে কী বিপুল সফল এক লেখক ও মা হিসেবে তার জীবন কাটিয়েছেন!
দেশভাগেরও বারো বছর আগে ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাবেয়া খাতুনের জন্ম। তদানীন্তন ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে মামাবাড়ি পাউসার গ্রামে। তার বাবার বাড়ি ছিল শ্রীনগর থানার ষোলোঘর গ্রামে। মা হামিদা খাতুন ছিলেন গৃহিণী আর বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরে। বড় হয়েছেন অবশ্য পুরান ঢাকার রায় সাহেব বাজারের নাসিরুদ্দিন সর্দার লেনে আর পুরান ঢাকার সেই বিচিত্র অলিগলির জীবন উঠে এসেছে তার উপন্যাসে। ‘বায়ান্ন গলির এক গলি’র মতো অসামান্য উপন্যাস পেয়েছি আমরা। সংগীতপ্রিয় বাবার গলায় রাগ সংগীত শুনে সংগীতের প্রতি ভালোবাসা জন্মেছিল তার, যদিও সেই সময়ের রক্ষণশীল বাতাবরণে একটি কন্যাশিশু হিসেবে সংগীতচর্চার অখ- পরিবেশ ছিল না তার। পঞ্চাশের দশকের পূর্ব পাকিস্তানে এক তরুণী লিখতে শুরু করেছেন, ভাবা যায়? পঞ্চাশটির বেশি উপন্যাস আর চারশোর বেশি ছোটগল্পে পরিপূর্ণ ‘ঠাকুরমা’র ঝুলি’ বা ‘ঠানদিদির থলে’ নিয়ে পঁচাশিতে অন্তিম যাত্রা এই কথাশিল্পীর। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘মধুমতী’ প্রশংসা কুড়িয়েছিল ওপার বাংলা থেকেও। বিখ্যাত ‘দেশ’ পত্রিকায় এই উপন্যাস সম্পর্কে লেখা হয়েছিল, ‘ঢাকাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্য ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। মধুমতী উপন্যাসে এই সমাজের ছবি। ...লেখিকার ভঙ্গি অনায়াস এবং কাহিনীর গতি স্বচ্ছন্দ।’
একাত্তরের স্মৃতিকথা বলুন অথবা শিশু-কিশোরদের জন্য রচনাবলি বা ভ্রমণকাহিনী, রাবেয়া খাতুনের ভাষা সবসময়ই ছিল গতিশীল ও আধুনিক। রাবেয়া খাতুন স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন (২০১৭), পেয়েছেন একুশে পদক। এছাড়াও বাংলা একাডেমি পুরস্কার, হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার, নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক, জসীম উদ্দীন পুরস্কার, শেরে বাংলা স্বর্ণপদক, চন্দ্রাবতী স্বর্ণপদক, টেনাশিনাস পুরস্কার, ঋষিজ সাহিত্য পদকসহ আরও বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
তবে, পুরস্কারের থেকেও তার বড় অর্জন সেই সময়ে কথাসাহিত্য রচনা শুরু করে মেয়েদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। পরিশেষে এ-কথা বলতেই হয় যে, গ্রন্থ বা পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেই পাকিস্তান আমলে একজন নারী হিসেবে তার সাহিত্য সাধনার সূচনা ও সেটা টেনে নিয়ে যাওয়া। এবার এই ২০২০ অনেককেই আমাদের কাছ থেকে টেনে নিয়ে গেল। খুব সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন বিশিষ্ট নারীনেত্রী আয়শা খাতুন। আয়শা আপারা রাজপথে আন্দোলন করেছেন আর রাবেয়া আপারা করেছেন লেখার টেবিলে বসে। সব মিলিয়েই তো নারীর অগ্রযাত্রার পথ প্রস্তুতির দীর্ঘ কাজ। সেই কাজের অদেখা দীপশিখা রাবেয়া খাতুন...আপনাকে দেখার সৌভাগ্য হয়তো আমার হয়নি। তবু আপনি আমার প্রণতি গ্রহণ করুন ও অমরলোকে চিরশান্তিতে থাকুন।
লেখক : কথাসাহিত্যিক
