রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বিদেশি ক্রেতাজোট অ্যাকর্ড অ্যালায়েন্সের তত্ত্বাবধানে পোশাক খাতের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এর ফলে পোশাক খাতে দুর্ঘটনা কমছে। ছোটখাটো দুর্ঘটনা থাকলেও মারাত্মক ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। এতে কর্মক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এবং দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনা কমে এসেছে। প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক মিলে সদ্য বিদায়ী ২০২০ সালে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ৭২৯ শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন। আগের বছর ২০১৯ সালে এ ধরনের দুর্ঘটনায় এক হাজার ২০০ শ্রমিককে প্রাণ দিতে হয়েছিল। দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু সবচেয়ে বেশি পরিবহন খাতে। গেল বছর এ খাতে সর্বোচ্চ ৩৪৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮৪ শ্রমিক মারা গেছেন নির্মাণ শিল্পে। মৃত্যুর সর্বোচ্চ সংখ্যার বিবেচনায় তৃতীয় অবস্থানে আছে কৃষি। এ খাতের ৬৭ জন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যান।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিল্স) এক জরিপ প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। বিলসের এই জরিপটি সংবাদপত্রভিত্তিক। বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে জরিপটি পরিচালনা করা হয়। প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বিলসের উপ-পরিচালক ইউসুফ আল মামুন।
মৃত্যুর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে আহতের ঘটনা কম হয়েছে গত বছর। প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বছর কর্মক্ষেত্রে আহত হয়েছেন ৪৩৩ শ্রমিক। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৯৫। গত বছর আহতদের মধ্যে ৩৮৭ জন পুরুষ এবং নারী শ্রমিক সংখ্যা ৪৬। আহতদের সংখ্যার বিচারে শীর্ষে রয়েছে মৎস্য খাত। এ খাতের ৬৮ শ্রমিক আহত হয়েছেন বছরটিতে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নির্মাণ খাতে আহত হন ৪৯ জন শ্রমিক। তৃতীয় সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ খাতে ৪৮ জন শ্রমিক আহত হন। এছাড়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যার মধ্যে পরিবহন সেবায় ৪৭, তৈরি পোশাক কারখানায় ৩৭, জাহাজভাঙা শিল্পে ২৯ জন শ্রমিক দুর্ঘটনার শিকার হন। এর বাইরে অন্যান্য খাতে ৪০ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন বছরটিতে।
শিল্প দুর্ঘটনা কমে আসার কারণ প্রবণতা সম্পর্কিত বিলসের প্রতিবেদন নিয়ে জানতে চাইলে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কার্যকরী সভাপতি কাজী রুহুল আমিন বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বিদেশি ক্রেতা জোট অ্যাকর্ড অ্যালায়েন্সের তত্ত্বাবধানে পোশাক খাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। এর ফলে পোশাক খাতে দুর্ঘটনা কমছে। ছোটখাটো দুর্ঘটনা থাকলেও মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। তবে অবকাঠামো নিরাপত্তার পাশাপাশি শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তায় আরও মনোযোগের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বিলসের ভাইস চেয়ারম্যান শিরীন আখতারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার নির্বাহী পরিষদ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসাইন, আমিরুল হক আমিন, উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য নইমুল আহসান জুয়েল, নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাকিল আখতার চৌধুরী, বিলসের পরিচালক কোহিনূর মাহমুদ, নাজমা ইয়াসমীন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
হতাহতের পাশাপাশি শ্রমিক অসন্তোষ এবং শ্রমিক আন্দোলনের তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে বিলসের প্রতিবেদনে। এতে দেখা যায়, গত বছর বিভিন্ন খাতে মোট ৫৯৩টি শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২৬৪টি আন্দোলনের ঘটনাই পোশাক খাতে। এছাড়া ৫৯৬ জন শ্রমিক গত বছর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৩২ জন কর্মক্ষেত্রে এবং কর্মক্ষেত্রের বাইরে ৩৬৪ জন নির্যাতিত হন। সর্বোচ্চ ১৭৬টি শ্রম অসন্তোষ হয়েছে বকেয়া বেতনের দাবিতে।
এছাড়া বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে ৪৫টি, বোনাসের দাবিতে ৩৪টি, লে-অফের প্রতিবাদে ৩০টি শ্রম অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছিল।
জরিপে অভিবাসী শ্রমিকদের হতাহতের তথ্যও তুলে আনা হয়। এতে দেখা যায়, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে গত বছর ৫২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১১ জন। ১ জন নিখোঁজ হন। অভিবাসীদের মধ্যে হতাহতের ঘটনা নির্মাণ খাতে বেশি। এ খাতের ৬৩ জন শ্রমিক হতাহত হন। এর মধ্যে ৮ জন নিহত, ৫২ জন আহত ও ৩ জন শ্রমিক আত্মহত্যা করেন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কৃষি খাতে ৫৮ জন শ্রমিক হতাহত হন। বিদেশে কর্মরত গৃহশ্রমিকদের ৪৪ জন হতাহত হন। এরমধ্যে ১৬ জন নিহত, ২৩ জন আহত, ৪ জন আত্মহত্যা করেন।
