অনিয়মের বৃত্তে স্বাস্থ্য খাত

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০২১, ১১:৫৩ পিএম

স্বাস্থ্য খাত দুর্বৃত্তায়নের চিরায়ত চক্র থেকে বেরোতে পারছে না। দেশের এ গুরুত্বপূর্ণ খাতে নিয়মিত বিরতিতে অনিয়ম-দুর্নীতির খবর সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসছে। বরাবরই বলা হয়, জিডিপির অনুপাতে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ খুব অপ্রতুল; কিন্তু এই সীমিত বরাদ্দের চেয়েও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এর উল্লেখযোগ্য অংশ লুটপাট। করোনাভাইরাস মহামারীতে স্বাস্থ্য খাতের নানা অসংগতি, অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতার আরও চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। এমতাবস্থায় করোনা মোকাবিলায় সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে পাঁচটি হাসপাতালের যে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গিয়েছে, তা দেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। 

রবিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘৫ হাসপাতালে সাড়ে ৫ কোটি টাকা লোপাট’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনা মহামারী মোকাবিলায় সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে পাঁচটি হাসপাতালে টাকা খরচে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। দেশের ১২টি হাসপাতালের জন্য সরকারের বরাদ্দ দেওয়া মোট ১৭৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকার মধ্যে হাসপাতালগুলো খরচ করেছে ৬২ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এরমধ্যে সরকারি সংস্থার তদন্ত অনুযায়ী, পাঁচটি হাসপাতাল করোনা মোকাবিলার ওই অর্থ ব্যয়ে কমপক্ষে সাড়ে ৫ কোটি টাকার অনিয়ম করেছে। টাকা খরচে অনিয়মের তালিকায় থাকা এই হাসপাতালগুলো হলো কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, মহানগর জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মুগদা জেনারেল হাসপতাল।  দৈনিক শ্রমিক নিয়োগ, কোয়ারেন্টাইন খাতে ব্যয়, বিধিবহির্ভূত কেনাকাটা, হোটেলে অবস্থানের ক্ষেত্রে প্রকৃত কক্ষ থেকে বেশি কক্ষের ব্যবহার দেখিয়ে ভাড়া পরিশোধ এবং এক কোডের বিল অন্য কোডে ব্যয়সহ সরকারের প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ না করে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ লোকসান করা হয়েছে। করোনা মোকাবিলার বিশেষ অর্থ বরাদ্দ থেকে ব্যয়ের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০০৮, ২০১৬ সালে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা নির্দেশনা এবং বাংলাদেশ ট্রেজারি রুলসসহ সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান না মানার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। 

কভিড-১৯ মহামারী আসার পর তা মোকাবিলার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, ব্যর্থতা, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়। রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি হেলথ কেয়ার নামের বেসরকারি দুই প্রতিষ্ঠানকে খোঁজখবর না নিয়ে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষার অনুমতি দেওয়ার অভিযোগের কথা আমরা জানি। তারা করোনার নমুনা পরীক্ষা না করেই হাজার হাজার মানুষকে পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে এবং তার ফলে দেশের ভেতরে তো বটেই, আন্তর্জাতিক পরিসরেও বাংলাদেশের করোনা পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা ভীষণভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এ দেশের পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা। শুধু ওই দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেই নয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আরও পাঁচটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে করোনা পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছিল সরেজমিন পরিদর্শন না করে, তাদের প্রস্তুতি ও সক্ষমতার বিষয়ে কোনো খোঁজখবর না নিয়েই। প্রশ্ন হলো, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সচেতন সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এত ব্যাপক মাত্রায় অনিয়ম-দুর্নীতি কি সম্ভব হতে পারে? এমনকি করোনা রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার সরঞ্জাম, বিশেষত এন-৯৫ মাস্ক ও পিপিই কেনা ও সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির খবর মিলেছিল।  এসব ছাড়া চিকিৎসকদের খাবার কেনার খরচ, ভার্চুয়াল সভার খরচ ইত্যাদি ক্ষেত্রেও অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আবুল কালাম আজাদকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল এবং ওই অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালক আমিনুল হাসানকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল।

এ সময়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনা মোকাবিলায় সরকারের কিছু কার্যক্রমে উন্নতি হলেও গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রমে এখনো সুশাসনের ব্যাপক ঘাটতি বিদ্যমান। বিশেষ করে করোনা মোকাবিলায় প্রাসঙ্গিক আইন, যথা করোনা মোকাবিলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১২ এবং সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮-এর কোনোটিই যথাযথভাবে এখনো অনুসরণ করা হয়নি এবং করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতে বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পে ক্রয়সহ সব ধরনের ক্রয়ে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০০৮ অনুসরণ করা হয়নি। এক্ষেত্রে তারা যে ১৫ দফা সুপারিশ করেছিল তা আমলে নিয়ে স্বাস্থ্য খাতের পুনর্গঠন করা যেতে পারে। 

যদি মহামারীকালেও হাসপাতালগুলোতে দুর্নীতির মচ্ছব চলতে থাকে তাহলে দেশের মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হবে কীভাবে? এমনকি সরকারি তদন্ত সংস্থাকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে সহযোগিতা না করার যে অভিযোগ উল্লিখিত হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে উঠেছে, সে ব্যাপারেও জরুরিভিত্তিতে কঠোর পদক্ষেপ কাম্য। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে অবিলম্বে হাসপাতালগুলোর দুর্নীতি তদন্ত ও যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জোরদার উদ্যোগ জরুরি। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের বর্তমান ৫ শতাংশ বরাদ্দ বাড়িয়ে হাসপাতাল অবকাঠামো নির্মাণে মনোযোগ দিতে হবে।  একইসঙ্গে সেই বরাদ্দ যাতে দুর্নীতিতে লোপাট না হয় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত