করোনার টিকা নিয়ে বিতর্ক চলুক, বাণিজ্য নয়

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২১, ১০:৫৯ পিএম

সবকিছু নিয়েই কি ব্যবসা চলে? বিপন্ন মানুষ যখন সহায়তা চায় তখন যদি উত্তর আসেফেলো কড়ি মাখো তেল; সেসময় বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসে এ কথা। কিন্তু পুঁজিবাদ তো একটি কথা ভালোভাবেই প্রচার করেছে এবং মানুষকে অভ্যস্ত করিয়েছে যে টাকা ছাড়া কিছুই পাওয়া যাবে না। করোনা সংক্রমণের কারণে এ শতাব্দীর সবচেয়ে আতঙ্ক ছড়ানো কাল অতিক্রম করছে বিশ্ববাসী এবং দেখছে ব্যবসার কত রূপ। করোনার ভয় মোকাবিলা করতে ভ্যাকসিনই শেষ ভরসাএর সঙ্গে এই ভয়টাও আছে যে, ভ্যাকসিন কতটা কার্যকর হবে আর কত টাকা লাগবে। ধনী দেশ এবং দেশের ধনীরাই কি ভ্যাকসিন নেবে? শুরুতে তো বটেই শেষ পর্যন্ত সবটুকুই? তাদের প্রয়োজন মেটানোর পরেও মজুদ করে রাখবে কি? সাধারণ মানুষ ট্যাক্সের জোগানদাতা হয়েও লাইনের শেষে দাঁড়াবে এবং অবশেষে কিছু পাওয়ার আশায় থাকবে?

বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে ধনী দেশগুলো বেশিরভাগ করোনার টিকা অগ্রিম বুকিং দিচ্ছে। অগ্রিম কেনা এসব ডোজের সংখ্যা এত বেশি যে, তা দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমস্ত বাসিন্দাকে দুইবার টিকা দেওয়া যাবে। আর ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র তা দিয়ে জনগণকে টিকা দিতে পারবে চারবারের বেশি, কানাডার ক্ষেত্রে তা ছয়গুণ! আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যা আগাম অর্ডার পেয়েছে তা দেখলেও বিস্ময় জাগে! তবে কি ভ্যাকসিন সিন্ডিকেটের কবলে পড়তে যাচ্ছে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো?

৭০টির মতো প্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিন তৈরির প্রতিযোগিতায় থাকলেও বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যত আগাম অর্ডার পেয়েছে তা নিয়ে বিবিসির এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে :

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা৩২৯ কোটি ডোজ। ফাইজার-বায়োএনটেক১২৮ কোটি, নোভাভ্যাক্স১৩৮ কোটি, জনসন অ্যান্ড জনসন১২৭ কোটি, সানোফি/জি এসকে১২৩ কোটি, মডার্না৭৮ কোটি, স্পুটনিক৩৪ কোটি (এখন তারা বলছে এর পরিমাণ ১০০ কোটি), কিউরভ্যাক৪১ কোটি, সিনোভ্যাক২৬ কোটি। এছাড়া কোভ্যাক্স জোট১৪ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন তৈরির এবং বিক্রির আগাম অর্ডার পেয়েছে। অর্থাৎ বিশ্বের ৭০০ কোটি মানুষের জন্য ভ্যাকসিন সরবরাহ করার সক্ষমতা ইতিমধ্যেই অর্জিত হয়েছে। কিন্তু কথা তো সেই একটাই। টাকা ছাড়া টিকা নেই।

ব্রিটেনের প্রভাবশালী পত্রিকা ইকোনমিস্টের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধনী দেশগুলো সম্ভাব্য টিকার উৎপাদন সক্ষমতার অধিকাংশই কিনে ফেলেছে। গত ১২ নভেম্বরে প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সম্ভাব্য টিকা পাওয়ার প্রতিযোগিতায় উন্নয়নশীল অনেক দেশ (যেমন : নেপাল, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া) থেকে পিছিয়ে আছে। আবিষ্কারে এগিয়ে থাকা টিকাগুলো যদি সফলও হয়, তবু ২০২২ সালের আগে বাংলাদেশসহ বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬১ শতাংশ মানুষ টিকা নিতে পারবে না বলে সতর্ক করেছে অক্সফাম (সূত্র : বিবিসি বাংলা)। তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে টিকাপ্রাপ্তির এই দীর্ঘ সময়ে পুরনো সেই সতর্কতা রক্ষার নিয়মগুলো অনুসরণ করার বিকল্প নেই।

করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) প্রকোপ ঠেকাতে বিশ্বজুড়ে টিকা তৈরির সাফল্যের সংবাদ প্রতিদিনই প্রকাশিত হচ্ছে। এগিয়ে থাকা বেশ কয়েকটি টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান তাদের তৈরি করোনা টিকার কার্যকারিতা সম্পর্কে জানিয়েছে। সেই সঙ্গে টিকাগুলোর সম্ভাব্য বাজারদর সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই টিকা দিতে শুরু করেছে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ। ভ্যাকসিন বা টিকা উৎপাদনে এগিয়ে থাকা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের টিকা ও টিকার দাম সম্পর্কে যা জানা গেছে তা হলো :

মডার্না : যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি মডার্না ইনকরপোরেশনের দাবি, তাদের তৈরি টিকা করোনা ঠেকাতে ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কার্যকর। তৃতীয় পর্যায়ের ফলের ওপর ভিত্তি করে পাওয়া তথ্যের কথা উল্লেখ করে সম্প্রতি এমন দাবি করেছে মডার্না। মডার্নার আশা, তাদের টিকা রেফ্রিজারেটরে ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৩০ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে। আর মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এটা সংরক্ষণ করা যাবে ৬ মাস। ক্রয়াদেশের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে সরকারের কাছে প্রতি ডোজ করোনা টিকার দাম ২৫ থেকে ৩৭ ডলার করে রাখবে যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ কোম্পানি মডার্না। মডার্নার প্রধান নির্বাহী স্টিফেন ব্যানসেল জার্মানির একটি সাপ্তাহিককে এ কথা জানিয়েছেন। তবে গত আগস্ট মাসে মডার্না জানিয়েছিল, টিকার প্রতিটি ডোজের দাম তারা রাখতে পারে ৩২ থেকে ৩৭ ডলার। তবে উৎপাদন বেশি হলে দাম কমে আসতে পারে।

ফাইজার-বায়োএনটেক : প্রথমে নতুন টিকা দিয়ে কভিড-১৯ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষার দাবি করেছিল ফাইজার-বায়োএনটেক। পরে মডার্নার টিকার কার্যকারিতার ফল প্রকাশের পর ফাইজার টিকার কার্যকারিতার নতুন তথ্য জানায়। ফাইজারের দাবি তাদের টিকা করোনা ঠেকাতে প্রায় ৯৫ শতাংশ কার্যকর। তবে তাদের টিকা মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পরিবহন ও সংরক্ষণ করতে হবে। ফাইজার-বায়োএনটেক জানিয়েছে, তাদের তৈরি টিকার প্রতি ডোজের দাম পড়তে পারে ২০ ডলার করে। সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি বলছে, সেটি সত্যি হলে মডার্নার চেয়ে ফাইজারের টিকার দাম কম হতে পারে।

স্পুটনিক ফাইভ : ফাইজারের করোনা টিকার কার্যকারিতাবিষয়ক ঘোষণার পরপরই রাশিয়া ঘোষণা দিয়ে জানায় যে তাদের তৈরি স্পুটনিক ফাইভ টিকা ৯২ শতাংশ কার্যকর। স্পুটনিক ফাইভ টিকার অফিশিয়াল টুইটার অ্যাকাউন্টে বলা হয়েছে, মার্কিন ওষুধ কোম্পানি ফাইজার ও মডার্নার চেয়ে রাশিয়ার করোনা টিকার প্রতি ডোজের দাম অনেক কম পড়বে। স্পুটনিক ফাইভ টিকা তৈরি করেছে গামালেয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট।

স্পুটনিকের টুইটার অ্যাকাউন্টে আরও বলা হয়, ফাইজার ও মডার্নাএই দুটি টিকারই দুটি করে ডোজ নিতে হবে। সে হিসাবে ফাইজারের টিকা নিতে খরচ হবে ৩৯ মার্কিন ডলারের মতো। মডার্নার টিকা নিতে খরচ হবে ৫০ থেকে ৭০ ডলারের বেশি। স্পুটনিক ফাইভ টিকারও দুটি ডোজ নিতে হবে। কিন্তু ফাইজার ও মডার্নার চেয়ে এর দাম অনেক কম পড়বে। তবে কত কম পড়বে, তা এখনো জানায়নি তারা।

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা : যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি করোনার টিকা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে পারে আর এর সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও জটিলতা কম। ‘দ্য ল্যানসেট’-এ অক্সফোর্ডের টিকার দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সীদের দেহেও এই টিকার রোগপ্রতিরোধ সংক্রান্ত প্রতিক্রিয়া ভালো। গবেষকরা বলছেন, বয়স্ক মানুষের দেহে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের করোনাভাইরাসের টিকার প্রতিক্রিয়া ‘উৎসাহব্যঞ্জক’। অন্যদিকে, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার বরাত দিয়ে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, তাদের টিকার প্রতি ডোজের দাম পড়তে পারে ৩ থেকে ৪ ডলার। প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অবশ্য জানিয়েছে, অক্সফোর্ডের টিকা মুনাফার উদ্দেশে নয়, অলাভজনকভাবে বাজারজাত করা হবে এবং একই সঙ্গে বিশ্বের সব প্রান্তে প্রয়োজন অনুযায়ী পৌঁছে দেওয়া হবে এ টিকা।

বাংলাদেশ অক্সফোর্ড-আ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে সংগ্রহ করবে। তিন কোটি ডোজ পাওয়া যাবে বলে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা ও আশাবাদ সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ পাওয়া গেলে ৩ কোটি ডোজ পেতে সময় লাগবে ৬ মাস। কিন্তু কখন থেকে সেটা শুরু হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। দাম কত হবে তা নিয়েও স্পষ্ট কিছু বোঝা যাচ্ছে না। সেরাম ইনস্টিটিউটের কাছ থেকে ৩ ডলার দামে টিকা সংগ্রহ করবে বেক্সিমকো। বেক্সিমকো একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, সরকার বেক্সিমকোর কাছ থেকে নেবে। এবং দাম নাকি হবে ৫ ডলার, পরিবহন খরচ এক ডলার। আবার শোনা যাচ্ছে বেসরকারিভাবে আমদানি হবে টিকা। তার দাম কত হবে, কে জানে? বাজারের ওপর সবকিছু ছেড়ে দেওয়া সমাজে এর উত্তরও ব্যবসায়ী আর বাজারই জানে।

টিকা কখন আসবে তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, টিকা সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিতরণের সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে কি? অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, বাংলাদেশের সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও শিশুদের টিকা সংরক্ষণ ও বিতরণের জন্য যে ব্যবস্থা আছে, তার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা হলো মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ফলে কাগজে-কলমে এই ব্যবস্থা আছে ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায়, করোনার টিকা সংরক্ষণের জন্য ‘কোল্ড চেইন’ বা ‘শীতল ব্যবস্থা’ থাকলেও জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে টিকা সংরক্ষণ ব্যবস্থা নাই বললেই চলে। তাছাড়া, রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় ও উপজেলায় টিকা পরিবহন ও বিতরণের জন্য যে পরিবহন ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে, সেগুলোর উপযুক্ততা কেমন আছে এবং কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

জানুয়ারিতেই টিকা আসবে বলে যে আওয়াজ তোলা হয়েছিল সে অনুযায়ী প্রস্তুতি কিন্তু দৃশ্যমান হয়নি। মাস্ক, স্যানিটাইজার, পিপিই, অক্সিজেন, আইসিইউ, ভেন্টিলেটর নিয়ে যা হয়েছে আর বাণিজ্যিক হাসপাতালগুলো যেভাবে করোনার দুর্যোগকে ব্যবসার সুযোগে পরিণত করেছিলতা মানুষের মনে ভয় ধরিয়েছে। এখন করোনার টিকাও বাণিজ্যের কবলে পড়বে কি-না সে আশঙ্কাও বাতিল করা যায় না।

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত