টিকাদানের প্রস্তুতি ও সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনা

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২১, ১১:১৯ পিএম

করোনাভাইরাসের টিকা নিয়ে নানামুখী উদ্বেগ উৎকণ্ঠা এখনো কাটেনি। দেশের সব মানুষের জন্য করোনার টিকা নিশ্চিত করতে একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং কয়েক ধাপের পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এই বিষয়টি যেমন একদিকে নানা উৎস থেকে কবে, কয় ধাপে, কত টিকা পাওয়া যাবে তার ওপর নির্ভরশীল; তেমনি সেটা মানুষকে টিকাদানের প্রক্রিয়া এবং দেশের নানা সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করছে। কিন্তু এই মুহূর্তের উদ্বেগ টিকাদানের এই প্রক্রিয়া কবে থেকে শুরু হবে এবং সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির কতটা সম্পন্ন হয়েছে তা নিয়ে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি করোনাভাইরাসের টিকার প্রথম চালান আগামী ২৫ জানুয়ারির মধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছাবে বলে আশা করছে সরকার। সব কিছু ঠিক থাকলে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে মাঠ পর্যায়ে টিকা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেজন্য আগামী ২৬ জানুয়ারি থেকেই অনলাইনে নিবন্ধন শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু জেলা-উপজেলা থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে টিকাপ্রাপ্তির যোগ্য ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার তালিকা চূড়ান্ত করা এবং অনলাইন নিবন্ধনের সব প্রক্রিয়াই এখনো শেষ হয়নি।

এমন উদ্বেগের মধ্যেই বুধবার করোনাভাইরাসের টিকা প্রদানে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নির্ধারিত সাধারণ মানুষের কাছে যাতে নির্বিঘেœ টিকা পৌঁছায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করেছে কমিটি। জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, সদস্য পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানসহ সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে এক সভায় করোনার টিকাদানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ও নিবিড় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার এই আহ্বান জানিয়েছে কমিটি। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সারা দেশে ধাপে ধাপে কাদের আগে টিকা দেওয়া হবে সেই অগ্রাধিকার তালিকা তৈরির নীতিমালা তৈরি হলেও এখনো সব জেলা-উপজেলা থেকে মাঠপর্যায়ের চূড়ান্ত তালিকা তৈরি হয়নি। জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা এই তালিকা তৈরির কাজ তত্ত্বাবধান করছেন। এছাড়া তৃণমূলের তালিকা তৈরিতে যুক্ত রয়েছেন বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। এদিকে দেশব্যাপী করোনার টিকাদান কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করছে সরকার। স্মার্ট মোবাইল ফোনে অ্যাপটি ইনস্টল করে ফোন নম্বর ও এনআইডি নম্বর দিয়ে ব্যবহারকারীরা এখানে টিকা গ্রহণের জন্য নিবন্ধন করবেন।

কিন্তু টিকাপ্রাপ্তির অগ্রাধিকার তালিকা প্রস্তুত করার কাজে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে সামনে না রেখে জনপ্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সামনে নিয়ে আসার সমালোচনা রয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিদ ও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনায় অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে অগ্রাধিকার তালিকায় স্থান পাওয়া নিয়ে স্বাস্থ্যগত বিবেচনার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বেশি গুরুত্ব পেতে পারে। অন্যদিকে, অনলাইন নিবন্ধনের প্রক্রিয়ার কারণে গ্রাম ও শহরের প্রান্তিক মানুষরা প্রাযুুক্তিক সক্ষমতা ও সুযোগের অভাবে সংকটে পড়তে পারেন বলেও মনে করছেন কেউ কেউ। একইভাবে টিকাদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দক্ষতা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হলেও করোনার টিকা প্রদানের জন্য সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যবহৃত কেন্দ্রগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে না। কিন্তু সরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ এবং জেলা-উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় বা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের মতো স্থান নির্বাচনের কারণে স্বাস্থকর্মীরা ব্যবস্থাপনাগত সংকটে পড়তে পারেন বলেও মনে করছেন কেউ কেউ। এক্ষেত্রে সারা দেশের প্রত্যেক ওয়ার্ড পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা ১৫ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের যুক্ত করা হলে অধিকতর সুফল পাওয়া যেতে পারত।

অবশ্য, বলা বাহুল্য যে, বিকল্প যা-ই থাকুক না কেন, করোনার টিকাদানের প্রক্রিয়ায় সরকার যে পথে এগোচ্ছে সেটার সার্বিক প্রস্তুতি দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি। এই প্রস্তুতি যথাযথ ও সুচারুভাবে সম্পন্ন না হলে টিকাদানের প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে সন্দেহ নেই। মনে রাখা দরকার, করোনা মহামারীর গতি-প্রকৃতিতে অনেক অনিশ্চয়তাই রয়ে গেছে। টিকাদানের মাধ্যমে জনগণের হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করতে হলে দেশের অন্ততপক্ষে ৮০ ভাগ মানুষকে টিকা দিতে হবে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত এত সংখ্যক টিকাপ্রাপ্তিই নিশ্চিত করা যায়নি। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনাভাইরাসের যে তিন কোটি ডোজ টিকা আমদানির চুক্তি করেছে সরকার সেটির প্রথম চালান এ মাসের শেষে আসার কথা। এছাড়া বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক উদ্যোগ কোভ্যাক্স থেকে ফেব্রুয়ারির শুরুতে বাংলাদেশের করোনার টিকা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বাংলাদেশ ফাইজার-বায়োএনটেকের এই টিকা নিতে চায় কি না, তা ১৮ জানুয়ারির মধ্যে জানাতে হবে। এই টিকা মাইনাস ৭০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা না হলে টিকার গুণ নষ্ট হবে। কিন্তু এজন্য যে ‘কোল্ড চেইন’ দরকার, তা বাংলাদেশে নেই। ফলে এসব বিষয়ের সুরাহা দ্রুত হওয়া জরুরি। নইলে সামগ্রিক টিকাদান কর্মসূচিই হুমকির মুখে পড়তে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত