গণপিটুনির ব্যাপারটার কাছে যদি যাই। পুলিশ যখন লোক-হত্যাজনিত মারাত্মক অপরাধ করে ফেলে, জনতার রুদ্ররোষে দগ্ধ হওয়ার কাহিনী তৈরি করাটা তখন তাদের পক্ষে বেশ সুবিধাজনক হয়ে দাঁড়ায়। অবশ্য সব হত্যা-অপরাধের জন্য নয়; গুম, বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার, এগুলো বাদ। এগুলো তো কোনো ‘অপরাধ’ই নয়। তবে বাহিনীগত হননের বাইরে ব্যক্তিগত পর্যায়ে হত্যাকান্ডও ঘটে। যেমন সিলেটে যুবক রায়হানকে হত্যা করা। তাকে হত্যা করে এক পুলিশ অফিসার রটিয়ে দিয়েছিল যে রায়হান একজন ছিনতাইকারী, জনতা তাকে ধরে আচ্ছা করে পিটিয়েছে; পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে, উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়, সেখানে তার মৃত্যু ঘটে। এই গল্প প্রচার করা হয়েছে। লোকে সেটা মেনেও নিত, অর্থাৎ মেনে নিতে বাধ্য হতো। পুলিশ সাহেবের দুর্ভাগ্যক্রমেই হবে ঘটনাস্থলে সিসি ক্যামেরা ছিল, সেটি আবার সচল অবস্থাতেই ছিল এবং তাতে গণপিটুনির চিহ্নমাত্র দেখা যায়নি। সাংবাদিকরা সে খবর ফাঁস করে দিয়েছেন। ঘটনাস্থল একটি বাজার, সেখানকার দোকানিরা এই পুলিশ কর্মকর্তার চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ ছিলেন, এত দিন মুখ খুলতে সাহস পাননি, এবার তারাও বলেছেন রায়হান মোটেই ছিনতাইকারী নয়, সে একটি হাসপাতালে কাজ করে, তার কাছ থেকে চাঁদা আদায় করার জন্যই থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। নিশ্চয়ই তাকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। রায়হানের পরিবারের সদস্যরাও জানিয়েছেন যে, রায়হান তার মোবাইলে টাকা নিয়ে থানায় যেতে তাগিদ দিয়েছে, বলেছে নইলে তাকে ছাড়বে না। ছাড়বে না অর্থ সেও জানে, তার আত্মীয়রাও জানেন। মেরে ফেলবে। টাকা সংগ্রহ করে তারা থানায় গেছেনও; কিন্তু গিয়ে শোনেন রায়হান সেখানে নেই, পাওয়া যাবে তাকে হাসপাতালে। হাসপাতালে গিয়ে জীবিত রায়হানকে আর পাওয়া যায়নি। হন্তারক পুলিশের দারোগা সাহেব তখন কী করবেন? দ্রুত গা-ঢাকা দিলেন। তা ঢাকাটা তিনি ভালোই দিয়েছিলেন। একেবারে সীমান্ত পার হয়ে চলে গেছেন ভারতে, সেখানে খাসিয়া পল্লীতে খাসিয়া সেজেছিলেন। ধরা পড়লেন ২২ দিন পর। এপারের খবর ওপারে যায়, খাসিয়ারা শুনেছে ঘটনার কথা। তাদের সন্দেহ হয়েছে। তারা তাকে আটক করেছে। তারপর এপারের লোকের কাছে নিয়ে এসেছে। মাঝখানে টাকাপয়সার দেওয়া এবং নেওয়া ঘটেছে। নাকি ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সাহেব নাকি লোকগুলোকে বলেছিলেন ছেড়ে দিলে দ্বিগুণ টাকা দেবেন। তারা রাজি হয়নি। পেশাদার হলে হয়তো রাজি হতো; খুনের মামলার পলাতক আসামি ফসকে গেল কী গেল না তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে টাকাটা গুনে গুনে নিয়ে নিত। এখন বিচার হবে, শাস্তিও হবে আশা করা যায়, কিন্তু রায়হান তো আর ফিরে আসবে না। কী ছিল তার অপরাধ?
সে ব্যবসায়ীটিরই-বা কী অপরাধ, যিনি ঢাকার কাছে কেরানীগঞ্জে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন, ১২ অক্টোবর রাতে? দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরছিলেন রাত ৮টায়। পথিমধ্যে পুলিশ তাকে থামিয়েছে, তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আছে বলে ধরে নিয়ে এসেছে ঢাকার কোতোয়ালি থানায়। মুক্তিপণ দাবি করেছে দুই লাখ টাকা। করোনাকালে অত টাকা দিতে পারবে না জানালে পুলিশের একজন নিজের পকেট থেকে কতগুলো ইয়াবা বড়ি বের করে বলেছে এগুলো তোমার পকেটে ছিল। তোমাকে চালান দেওয়া হবে। ব্যবসায়ী সাড়া দিতে ব্যর্থ হওয়ায় পরের দিন তাকে ঠিকই মাদক পাচার মামলায় অভিযুক্ত করে আদালতে হাজির করা হয়েছে এবং আদালত, যথাপ্রত্যাশিত তাকে জেলে পাঠিয়ে দিয়েছে। বাইরে থেকে তার লোকজন চেষ্টা-তদবির করে শেষ পর্যন্ত ৩০ অক্টোবর তাকে জামিনে জেলখানা থেকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছে। ব্যবসায়ীটির বুকে কিছুটা সাহস অবশিষ্ট ছিল মনে হয়; বেরিয়ে এসে তিনি কোতোয়ালি থানার ওসিসহ চারজন পুলিশ ও একজন ইনফরমারের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছেন ঠুকে। পত্রিকায় বের হয়েছে খবরটা। এটি যে বিচ্ছিন্ন বা একক কোনো ঘটনা তা কে বলবে, বিভিন্ন মাত্রায় এসব ঘটনা যত্রতত্র যখন-তখন ঘটছে। কে কার খবর রাখে?
আর জনতার হাতে গণপিটুনি? সিলেটের রায়হানের মৃত্যু নিয়ে যখন নীরব জনবিক্ষোভ চলছে, ঠিক সে সময়েই জানা গেল চট্টগ্রামে আকরাম নামের একজন ছিনতাইয়ের কাজে লিপ্ত অবস্থায় জনতার হাতে পিটুনি খেয়েছেন। র্যাব তাকে উদ্ধার করে নিয়ে হাসপাতালে রওনা দেয়, কিন্তু দুর্ভাগ্য তার, এমন মারই সে খেয়েছেন যে হাসপাতালে আর পৌঁছাতে পারেননি, পথিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছেন। পরিবার বলছে, হত্যাকান্ড। যে পত্রিকাটিতে এর কিছুটা বিস্তারিত বিবরণ এসেছে তার স্থানীয় সংবাদদাতা অল্পবিস্তর তদন্ত করেছেন। তিনি জানতে পেরেছেন যে, গণপিটুনির ঘটনা কেউ দেখেনি, ঘটলে অদৃশ্যভাবে ঘটে থাকবে। ময়নাতদন্তে জানা গেছে কারও হাতের আঘাতে নয়, শক্ত কোনো বস্তুর আঘাতের দরুনই আকরাম প্রাণ হারিয়েছেন। (ডেইলি স্টার, ১৫. ১১.২০)
করোনাকালেরই তো একটি ঘটনা, লালমনিরহাটে। মানুষটি উচ্চশিক্ষিত, গেছেন মসজিদে, নামাজ পড়েছেন সবার সঙ্গে, তারপর মসজিদে খাদেমের সঙ্গে কী নিয়ে কথা-কাটাকাটি হয়েছে। মসজিদে বইপত্র কী আছে তিনি দেখতে চেয়েছেন। রটে গেল তিনি কোরআন শরিফে পা রেখেছেন। আর যায় কোথায়, মারধর শুরু হলো। লোকজন ছুটে এলো। প্রথমে শয়ে শয়ে, পরে হাজারে হাজারে। পিটিয়ে তাকে মেরে ফেলেই যে ছেড়ে দেওয়া হলো তা নয়, আগুনে পুড়িয়ে ফেলাও হলো। এমনই পোড়ানো যে দেখে আর চিনার উপায় রইল না।
লোকে আসলে খুবই রেগে আছে। কার বিরুদ্ধে রাগ বোঝে না। রাগটা আসলে পুরো ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই। কিন্তু ব্যবস্থাটাকে তো দেখা যায় না, লুকিয়ে থাকে। উত্তপ্ত লোকরা তাই একে ধরে ওকে ধরে। ধরে দুর্বলদেরই এবং রাগটা ঝাড়ে তাদের ওপরেই। প্রবলের সঙ্গে পারে না, প্রবলকে দেখলে ভয় পায়, সালাম দেয়। দুর্বলকে হাতের কাছে পাওয়া যায় এবং দুর্বলকেই মারে।
এমনকি বড় বড় মানুষও দুর্বলের ওপর এ ধরনের বলপ্রয়োগের ব্যাপারে অনুৎসাহী নন। ধরা যাক ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের কথা। খুবই সম্মানিত ব্যক্তি। বিশ্বনন্দিত। গত বছর শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। কেন পেলেন? কারণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে বিবাদ মিটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন। কিন্তু নিজের দেশের ভেতর তিনি কী করছেন? ইথিওপিয়ার শাসনাধীন তিগ্রে’র জনগোষ্ঠী আবি আহমেদের দলের একচেটিয়া শাসন মানতে নারাজ। তারা লিবারেশন ফ্রন্ট গঠন করেছে। ফ্রন্ট বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। তা দেখে আবি আহমেদ তপ্ত হয়েছেন। বিদ্রোহ দমনে তিনি সশস্ত্রবাহিনী পাঠিয়েছেন। তাতে কাজ হচ্ছে না দেখে বিমানবাহিনী তলব করে বোমাবর্ষণ ঘটিয়েছেন। হাজার হাজার তিগ্রে পালিয়ে গেছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র সুদানে। নিহতের সংখ্যা দ্রুতই এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্ববাসী কী করবে? জাতিসংঘ মধ্যস্থতা করতে চেয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন প্রয়োজন নেই, আমাদের সমস্যা আমরাই মেটাব। আফ্রিকার কয়েকটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা আসতে চেয়েছিলেন; ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
উত্তপ্ত এই পৃথিবীতে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কারটা ইদানীং রীতিমতো কৌতূহলেরই ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৌতুকেরও। শান্তির যা হাল শান্তি পুরস্কারেরও তাই। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আমিরের নাম নাকি প্রস্তাবিত হয়েছে আগামী বছরের শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য। মোটেই অস্বাভাবিক নয়; এবং নোবেল পুরস্কারটা যদি এই দুই নতুন বন্ধু ভাগাভাগি করে নেন, তাহলেও বিস্ময়ের কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ ঘটবে না। তারা তো নিজেদের মধ্যে বহুকালের পূর্বশত্রুতা মিটিয়ে ফেলে কোলাকুলি করেছেনই, তদুপরি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিতে বিঘœ সৃষ্টিকারী ফিলিস্তিনিদের কাছে তারা এই বার্তাটিও জোরেশোরে পৌঁছে দিয়েছেন যে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা বাদ দিয়ে তাদের উচিত ইসরায়েলের কাছে আত্মসমর্পণ করা। নতজানু হও। যত দ্রুত হবে ততই তোমাদের রক্তক্ষয় হ্রাস পাবে। শান্তিরক্ষায় তৎপর (নিজের দেশে যদিও দুর্নীতির দায়ে মামলাগ্রস্ত) ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তো ইতিহাসই সৃষ্টি করেছেন সৌদি রাজপুত্র সালমানের সঙ্গে দেখা করে। এবার গোপনে করেছেন, এরপর প্রকাশ্যেই করবেন। গোপন রাখার ব্যাপারটায় সৌদি আরবেরই আগ্রহ বেশি; হাজার হোক মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বের তারা বনেদি দাবিদার আর সেই বিশ্বের সবচেয়ে নিন্দিত শত্রু ইসরায়েলের সঙ্গে বন্ধুত্ব? ইসরায়েল ও সৌদি আরবের, উভয়েরই স্বার্থ আছে ইরানকে কাবু করায়। ইসরায়েল ঠিক করেছে ফিলিস্তিনিদের দাস বানাবে, সে-ক্ষেত্রে ইরান মস্ত বাধা। ফিলিস্তিনিরা উত্ত্যক্ত করে, ইরান হুমকি দেয়, উভয়কেই জব্দ করা চাই। আর এতে সাহায্য পাওয়া যাবে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বাদশাহ ও আমিরদের। হায়রে আরব জাতীয়তাবাদ; তোমার দুর্দশায় ক্রন্দনেরও আজ কেউ নেই। কোথায়-ই বা গেল প্রসিদ্ধ সেই ‘আরব বসন্ত’?
ডোনাল্ড ট্রাম্প তো চাইছিলেনই ইরানকে বসিয়ে দেবেন, জর্জ বুশ যেমনটা ঘটিয়েছেন ইরাকের ও আফগানিস্তানের বেলায়। হোয়াইট হাউজ ছাড়ার আগে কিছু একটা করার জন্য ট্রাম্পের হাত নিশপিশ করছিল। ইরানের একজন সেনাধ্যক্ষকে আগেই মেরেছেন, আরও কিছু করার মতলবে ছিলেন। সেটাও সম্ভব হয়েছে। ইরানের শীর্ষ পরমাণুবিজ্ঞানীকে সরিয়ে দেওয়া গেছে। কাজটা ট্রাম্প সরাসরি করেননি, ইসরায়েলের ঘাতকরা করেছে; কিন্তু তারা তো একই, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট এবং সৌদি আরবের রাজপুত্র আপনজন, অতিঘনিষ্ঠ ইয়ার-দোস্ত, অভিন্ন স্বার্থের আলিঙ্গনে আপাত-আবদ্ধ। শীর্ষ পরমাণুবিজ্ঞানীকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে ইরানকে শুধু যে দুর্বল করা হলো তা-ই নয়, অভিসন্ধি আরও ছিল। ফাঁদ পাতা হয়েছিল। ইরান রেগে যাবে, রেগে আত্মহারা হবে এবং ভয়ংকর একটা ‘প্রতিশোধ’ নেওয়ার ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবে; তখন মানব জাতিকে রক্ষা করার স্বার্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ইরানকে আক্রমণে ‘বাধ্য হতে’ হবে। বুশের পক্ষে ইরাককে ধ্বংস করার জন্য সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাতটা ছিল ইরাকের কল্পিত যুদ্ধপ্রস্তুতি; এবার ইরানের ক্ষেত্রে দেখানো যেত একেবারে সরাসরি আক্রমণ। আর সেই সুযোগে ট্রাম্প সাহেব হয়তো তার নিজের দেশে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে, জরুরি অবস্থা জারি করে ফেলতেন, ক্ষমতা হস্তান্তর বিলম্বিত হতো। সৌভাগ্যক্রমে ইরান ওই ফাঁদে পা দেয়নি।
তাপ কমবে না, বাড়বেই। তাপের বৈশ্বিক বৃদ্ধি ঘটছে, সেটা প্রাকৃতিক; কিন্তু তার পেছনের কারণ মানুষ। ঘটবে মানুষের নিজের হাতে তৈরি অগ্নিকাণ্ড। আগুন লাগবে আমাজনের বনে এবং ঢাকার বস্তিতেও। বস্তিতে আগুন প্রতিবছরই লেগে থাকে। গত তিন বছরে এক হাজার বাস্ত পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বস্তিবাসী এবং অন্যরাও বলেছেন পেছনে রহস্য আছে। তদন্তও হয়েছে। কিন্তু সব রহস্য চাপা পড়ে গেছে ছাইয়ের নিচে। তবে সত্য হয়ে রয়েছে বাস্তবাসীর অসহায় ক্রন্দন। গায়ের কাপড়টা ছাড়া পুড়ে সবই শেষ, অনেকেই বলেছেন। শেষ পর্যন্ত দায়ী হয়েছে সেই নন্দ ঘোষই। অতি পুরনো ব্যক্তি সে, মরে না; সব দুর্ঘটনা সে-ই ঘটায়।
লেখক ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
