সংস্কৃতির বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ও শক্তি

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২১, ০২:২৪ এএম

আমার কাছে একটি বই আছে। বইটির নাম ‘ল্যাংগুয়েজ অব দ্য ল্যান্ড’। বইটির লেখক লেসলী রে। কোপেনহেগেন থেকে ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইনডিজিনাস অ্যাফেয়ার্স বইটি বের করে ২০০৭ সালে। আর্জেন্টিনা ও চিলি দেশের মাপুচে জাতির ওপর বই। আদিবাসী মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাস হলো, ভূমিরও মুখের ভাষা আছে, ওরা কথা বলে। পাহাড়, মাটি, জমি, বালুচর খোঁড়াখুঁড়ি করলে ভূমিও কষ্ট পায়। তারও যন্ত্রণা হয়। মানুষের অত্যাচার, সীমাহীন লোভ-লালসা, মিথ্যা, ভণ্ডামি, স্বার্থপর অপরিণামদর্শী আচরণের ফলে পৃথিবী এখন বিপন্ন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মানুষসহ প্রাণী ও প্রকৃতির জীবন বিপন্নপ্রায়। এই যে শব্দ ‘ল্যাংগুয়েজ অব দ্য ল্যান্ড’, এটি এসেছে মাপুচেদের মাতৃভাষা থেকে। মাপুচে অর্থ হলো পিপল অব দ্য ল্যান্ড। অর্থাৎ ভূমির সন্তান বা জনগণ। ‘মাপু’ শব্দের অর্থ ভূমি। আর ‘চে’ শব্দের অর্থ মানুষ। যেমন বাংলাদেশে সাঁওতালি ‘হড়’ শব্দের অর্থ মানুষ, গারোদের আচিক ভাষায় ‘মান্দি’ শব্দের অর্থও মানুষ। অনেক পরে জানলাম, ম্রো ভাষায় ম্রো শব্দের অর্থও মানুষ। তার মানে দাঁড়াল একটি জাতির নামের অর্থ হয় মানবের নামে। এ রকম জানা জাতি, নানা ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য ও সৌন্দর্য নিয়ে আমাদের পৃথিবী। এই বৈচিত্র্য আমাদের শক্তি। বৈচিত্র্য নিয়ে আমরা যেন গর্ব ও আনন্দ করতে শিখি। আমরা যেন বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ও শান্তি খুঁজে ফিরি। বৈচিত্র্য কোনোভাবেই সমাজের ও দেশের জন্য হুমকি নয়, বরং সৌন্দর্য ও শক্তি। আসুন আমরা সবাই এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সমাহারকে আমাদের দেশে স্বীকৃতি দিই, উদ্যাপন করি।

২. স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হতে চলল। বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে চলেছি আমরা। বড় বড় মেগা প্রকল্প, রাস্তাঘাট, ভবন-সেতু নির্মাণ, হাজার কোটি টাকার সব প্রকল্প, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, প্রবৃদ্ধির কথা বলছি। ঠিক আছে একদিকে। অন্যদিকে মানবাধিকারের কী অবস্থা? মানুষের সাংস্কৃতিক ও মানবিক মূল্যবোধ, নান্দনিক চর্চা, সুবচন, গণতন্ত্র, সুশাসন, সব মানুষের মর্যাদা, সমতা, উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার খবর কী? প্রান্তিক জাতিসত্তা ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের মর্যাদা ও সম্মানের মান কোন স্তরে? জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা কত দূরে? সব মিলিয়ে মহাশ্বেতা দেবীর কথাই মনে পড়ে। তিনি তার ‘গঙ্গা-যমুনা-ডুলং-চাকা’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘গঙ্গা-যমুনার সঙ্গে ডুলং, নেংসাই, চাকা এসব নদীকে মেলানোর কাজ তো শুরুই হয়নি। কবে হবে তা জানি না। শুধু এটা জানি যে পরিণামে মূলস্রোতকে, সমগ্র দেশকে ভীষণ দাম দিতে হবে এই উপেক্ষার। আর কাদের উপেক্ষার? যারা সত্যিই তো অনেক অনেক সভ্য আমাদের চেয়ে। মেয়ের বাপ পণ দেয় না, সতীদাহ বা পণের কারণে বধূ হত্যা জানে না, কন্যাসন্তানকে হত্যা করে না, বিধবাবিবাহ স্বীকৃত, উপযুক্ত কারণ থাকলে বিবাহবিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহ স্বীকৃত, এমন উন্নত সামাজিক প্রথা যাদের, তাদের উপেক্ষা করলাম। তারা যে সভ্য, উন্নত, শ্রদ্ধেয় মূলস্রোত সেটা জানার চেষ্টাই করল না। এর দাম আমাদের দিয়ে যেতে হচ্ছে, হবে। কোনো দিন ভারতের সত্যি ইতিহাস লেখা হবে। সে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না, যদি আমরা এখনো না বুঝি।’ মহাশ্বেতা দেবী কথাগুলো ভারতের আদিবাসীদের বিষয়ে সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের উদ্দেশে বলেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগণের জন্য কথাগুলো কি প্রযোজ্য নয়?

বাংলাদেশে আমরা দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করছি। আমরা বলছি যে, বাংলাদেশের সব নাগরিক বাঙালি নয় এবং এ জন্য বাঙালি জনগণের দুঃখ পাওয়ার কারণ তো নেই-ই, বরং তারা খুশি হতে পারে। কারণ এ দেশ অনেক জাতির, অনেক ভাষার ও সংস্কৃতির মানুষের দেশ। রাষ্ট্রে আদিবাসীদের ছোট ছোট অধিকার দিলে, সম্মান করলে, উন্নত করলে, সমগ্র দেশটাই উন্নত হয়। এ নিয়ে বাঙালি জাতি তখন গর্ব করতে পারে যে, অন্যান্য জাতির অধিকারের প্রতি তারা কত সহনশীল ও শ্রদ্ধাশীল। এখানে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নদী আছে, আবার শঙ্খ-মেননেং-সীমসাং-চেংগী-মাইনী নদী আছে। গারো ও খাসি পাহাড়, চিম্বুক, ফুরামন আছে। সমুদ্র উপকূলে রাখাইনরা আছেন এবং সুন্দরবনে আছেন মু-ারা। আসামকে নিয়ে ভূপেন হাজারিকার একটি গান আছে, ‘পাহাড় এসে সমতলে বাজায় করতালি, বিহুর সঙ্গে মিশে গেছে কখন ভাটিয়ালি।’ এভাবেই তো আদিবাসীদের সঙ্গে বাঙালিদের সংবাহন বিন্দু গড়ে উঠতে পারে।

৩. আদিবাসীদের কাছে ভূমি হলো তাদের অস্তিত্বের শেষ চিহ্ন। আমরা বলি, আমাদের কাছ থেকে ভূমি কেড়ে নেওয়ার অর্থ হলো একটি বাগান থেকে ফুল ছিঁড়ে নেওয়ার মতো। ভূমি নেই তো আদিবাসীদের জীবন নেই। ভূমি নেই তো আনন্দ নেই, উৎসব নেই, সংস্কৃতি নেই। ভূমিহীন মানুষ সংস্কৃতিচর্চা করবে কোথায়? তার নৃত্য করার, কথা বলার, গান করার, ভালোবাসার, মনের কথা বলার জায়গা কোথায়? তাঞ্জানিয়ার এক মাসাই আদিবাসী জাতিসংঘের অধিবেশনে গিয়ে বলেছেন, ভূমিবিহীন মানুষ হলো স্ট্রাইপবিহীন জেব্রার মতো।

আকাশ, বাতাস, সমুদ্র, নদী, পাহাড়-পর্বত, ভূমি ও প্রকৃতির সঙ্গে রয়েছে আদিবাসীদের নিবিড় স¤পর্ক। তাদের সংস্কৃতিতে ভূমি হলো মা, অরণ্যের মধ্যে তারা জননীর প্রাণের সন্ধান করেন, তারা প্রকৃতিকে অনুভব করতে পারেন। তারা বন ও স¤পদকে কোনো দিন বেচাকেনার বিষয় হিসেবে দেখেন না, কিন্তু জীবনের অংশ হিসেবে দেখেন। কিন্তু আধুনিক সভ্যতা বন, স¤পদ, প্রকৃতি সবকিছু ভোগ ও বাণিজ্যিক দৃষ্টিতে দেখে। বাগানের গাছ থেকে ফুল তুলে নিলে যেমন ফুল শুকিয়ে যায়, অরণ্য ধ্বংস হওয়ার ফলে আদিবাসীদের জীবনও আজ বিপন্ন। আদিবাসীরা বনকে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে জীবনের অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানান।

৪. তবে একটি ভালো খবরও আছে, কোথাও কোথাও রুখে দাঁড়াচ্ছেন আদিবাসীরা। এখন আদিবাসীদের এই নিজস্ব সংগ্রামকে শক্তিশালী করা দরকার। নিজ বাসভূমে পরবাসীর দুঃখ ঘুচাতে হলে ভূমি রক্ষার কাজই সবার আগে করা দরকার। যে ভূমিতে সাঁওতাল বাস করেন উত্তরবঙ্গে, সে জমির কাগজ বা দলিলপত্র থাকুক বা না থাকুক, সে জমি সাঁওতালের। সরকারের খাতায় সে জমি খাস হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে, কিন্তু আদিবাসী সংস্কৃতিতে সে জমি ওই আদিবাসীরই। আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমির অধিকার আন্তর্জাতিক সনদে স্বীকৃত, যার একটি হলো আইএলও কনভেনশন ১০৭, যা বাংলাদেশ সরকারও র‌্যাটিফাই করেছে। সুতরাং যে আদিবাসী মধুপুরের বনে কাগজপত্রবিহীন ভূমিতে বাস করেন, আনারস-আলু-আদা-পেঁপে বাগান করেন, সে জমি বংশপরম্পরায় তাদের। তাদের কাছ থেকে অন্যরা যদি সে জমি জোরপূর্বক কেড়ে নিতে চায়, সেটা হবে আন্তর্জাতিক সনদের লঙ্ঘন, যা মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত হবে। খাসিয়াদের জন্যও একই কথা প্রযোজ্য।

৫. আমাদের এই বৈচিত্র্যময়তার ও ভিন্নতার সৌন্দর্যের কথাই বলতে হবে সবার মধ্যে। Diversity is not a threat, বরং এটি যে সুন্দর, এ কথাটাই ছড়িয়ে দিতে হবে মানুষের হৃদয়ে। তখনই সমাজের সর্বত্র আদিবাসীদের প্রতি মানবিক ভালোবাসা জেগে উঠবে, আদিবাসীদের দুঃখ-বেদনা সবাইকে আহত করবে, ওদের দুঃখে সমভাবে দুঃখী হবে বাংলাদেশ। তাই প্রগতিশীল মুক্ত-সংস্কৃতিমনা বাঙালিদের আদিবাসীদের পাশে থাকা দরকার। আদিবাসীদের একটু অধিকার দিলে এ রাষ্ট্রের কী এমন ক্ষতি হয়? বরং আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি, গান, ইতিহাস, গল্প, সাহিত্য নানাভাবে আমাদের এ গরিব দেশকে সমৃদ্ধ করতে পারে। কিন্তু এসবের জন্য দরকার সংখ্যাগরিষ্ঠদের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক বিশাল হৃদয়ের কিছু মানুষ, যারা সংখ্যালঘু জনগণের পাশে মানবতাকে ভালোবেসে দাঁড়াতে পারেন? যে জাতির মানুষ বিশ্বাস করে, ভূমিরও ভাষা আছে, যাদের ওয়ার্ল্ডভিউ হলো ‘ধরিত্রী মানুষের নয়, বরং মানুষই ধরিত্রীর’, যাদের সংস্কৃতিতে ধরিত্রী হলো জননী, যারা চিরকাল বন-প্রকৃতি-নদী পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করেছে, এমন উন্নত সংস্কৃতি চিন্তার মানুষের বৈচিত্র্যকে কেন আমরা সম্মান করব না?

লেখক মানবাধিকারকর্মী ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত