মশার ওষুধ খুঁজে পাচ্ছে না ঢাকার দুই সিটি ব্যবস্থাপনা

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২১, ০৩:২৭ এএম

মশার উৎপাতে নাকাল রাজধানীবাসী। কিন্তু ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কর্র্তৃপক্ষের জন্য মশক নিধনের কার্যকর ওষুধ পাওয়াই এখন সবচেয়ে জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একাধিকবার দরপত্র আহ্বান করেও আশানুরূপ কার্যকর ওষুধ পাচ্ছে না সংস্থা দুটি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) অনেকটা তড়িঘড়ি করে যুক্তরাজ্য থেকে আনা নোভালিউরন নামে মশা নিধনের একটি ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখছে। আর কার্যকর ওষুধ সংকটের পাশাপাশি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বিভিন্ন ওয়ার্ডে মশক নিধনে নিয়োজিত কর্মীদের ছাঁটাই করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, শীত মৌসুমে সাধারণত কিউলেক্স মশা বেশি কামড়ায়। এ মশা যন্ত্রণা দিলেও রোগ ছড়ানোর শঙ্কা থাকে না। কিন্তু কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে ঢিমেতালে কার্যক্রম চলমান থাকায় রাজধানীজুড়ে এর উৎপাত দিন দিন বেড়েই চলছে।

মশা নিধন কার্যক্রমের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জোবায়দুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মশক নিধনে ডিএনসিসি কয়েকটি ধাপে কাজ করে যাচ্ছে। কার্যকর মশার ওষুধ ছিটানোসহ মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করার কাজটি আমরা করে যাচ্ছি নিয়মিত। সম্প্রতি খালের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের কাছে আসার পর আমরা খাল পরিষ্কারেও নেমেছি। খালগুলো পরিষ্কারের পর স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে মতবিনিময় করে সচেতনতা বাড়ানোর কাজটিও করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শীতকালে মূলত কিউলেক্স মশা বেশি থাকে। এসব মশা অস্বস্তি বা যন্ত্রণা দিলেও রোগ ছড়াতে পারে না। বর্তমানে ডিএনসিসি যুক্তরাজ্য থেকে আনা মশার ওষুধ নোভালিউরনের কার্যকারিতা পরীক্ষা করছে। আশা করছি নগরবাসীর সহযোগিতা পেলে মশক নিধনে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।’

জানা গেছে, শীত মৌসুমে কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে লার্ভিসাইড ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত আগেই নিয়েছিল ডিএনসিসি। যুক্তরাজ্য থেকে আনা নোভালিউরন ওষুধ ব্যবহার শুরু করেছে সংস্থাটি। নোভালিউরন নামের এই ওষুধ ডিএনসিসিকে সরবরাহ করেছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘টেক ইন্টারন্যাশনাল’। ইতিমধ্যে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ওষুধ কিনেছে সংস্থাটি। এই ওষুধ ব্যবহারের পাশাপাশি ল্যাব ও মাঠপর্যায়ে পরীক্ষাও চালিয়ে যাচ্ছে ডিএনসিসি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সহযোগী অধ্যাপক তাহমিনা আক্তারের তত্ত্বাববধানে জনপ্রতিনিধিসহ ডিএনসিসির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এসব পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। যেসব প্রাণীর দেহে ‘কাইটিন’ নামে একটি উপাদান রয়েছে, শুধু সেসব প্রাণীর লার্ভার বৃদ্ধি ঠেকিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এই ওষুধ। মশার লার্ভায় কাইটিন নামে একটি উপাদান থাকায় স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে তা মশার জন্ম নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম ‘নোভালিউরন’ এমনটাই দাবি সংশ্লিষ্টদের।

এদিকে গত বছরের শেষের দিকে মাঠ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ায় এসিআই ফর্মুলেশন লিমিটেডের সরবরাহ করা এক লাখ লিটার ওষুধ ফেরত দিয়েছে ডিএসসিসি। ৯-১০ মাসে একাধিকবার দরপত্র আহ্বান করেও ভালো মানের ওষুধ না পাওয়ায় তা চূড়ান্ত করতে পারেনি সংস্থাটির কর্র্তৃপক্ষ। এভাবে কেটে যায় বেশকিছু সময়। এর আগে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের পর বিদেশ থেকে সরাসরি ওষুধ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয় দুই করপোরেশনকে। এরপর বিদেশ থেকে ম্যালাথিউন ৫ শতাংশ আমদানি করে ডিএসসিসি। আমদানি করা এ ওষুধটি সরাসরি ব্যবহার উপযোগী না হওয়ায় এর সঙ্গে ৯৫ শতাংশ ডিজেল ও ২৫ থেকে ৫০ এমএল সাইট্রোনেলা মিশিয়ে ছিটাতে হয়। ডিজেল এবং ওষুধের ফর্মুলেশন (মিশ্রণ) সঠিক হতে হয়। কিন্তু এ কাজ করার জন্য সিটি করপোরেশনের নিজস্ব কোনো প্রযুক্তি নেই। তারা অন্য একটি সংস্থার সহযোগিতায় তা ব্যবহার করেছে।

ডিএসসিসির ভান্ডার বিভাগ জানায়, মশা মারার ওষুধ ফর্মুলেশন করতে গত বছরের ১ জানুয়ারি ৬ লাখ ৪০ হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইডিং ওষুধের জন্য দরপত্র আহ্বান করে ডিএসসিসি। সেখানে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২ কোটি ৪১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু তিন দফা দরপত্রে এ প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত করতে পারেনি তারা। পরে চতুর্থ দফায় এর পরের দরপত্রে চূড়ান্ত করে ডিএসসিসি। এতে সর্বনিম্ন দরদাতা হয় এসিআই ফর্মুলেশন কোম্পানি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি লিটার ওষুধ ১২৯ টাকা দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। ওই ওষুধ সরবরাহ করার জন্য কার্যাদেশ পাওয়ার পর এক লাখ লিটার ওষুধ সরবরাহ করে এসিআই কোম্পনি। কিন্তু আবারও মান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি মশা নিধনের ওষুধ।

এছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত থাকা কর্মীর সংখ্যা কমানোর পর দৈনন্দিন কার্যক্রমে কিছুটা ভাটা পড়েছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। মাস দুয়েক আগে ডিএসসিসির বিভিন্ন অঞ্চলের ওয়ার্ডে নিয়োজিত নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী রেখে বাকিদের সচিব দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। যেখানে প্রতিটি ওয়ার্ডে ১৩ থেকে ১৮ জন করে কর্মী ছিল সেখানে ৩ থেকে ৭ জন করে কর্মী কমিয়েছে ডিএসসিসি। গত বছরের ৩১ অক্টোবর সংস্থার অঞ্চল-২ থেকে ২৫ জন কর্মীকে মাঠপর্যায় থেকে সরিয়ে আনা হয়। এই অঞ্চলের ১ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ৪ জন, ২ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ৩ জন, ৩ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ৫ জন, ৪ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ৫ জন, ৫ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ৩ জন এবং ১৩ নম্বর ওয়ার্ড থেকে ৫ জন সরিয়েছে কর্র্তৃপক্ষ। এভাবে প্রায় প্রতিটি অঞ্চল থেকে মশক নিধন কর্মী কমানো হয়েছে বলে জানা যায়।

তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি ওয়ার্ডকে ৮ থেকে ১০টি সেক্টরে ভাগ করে প্রতি সেক্টরে কমপক্ষে ৪ জন করে জনবল রাখা উচিত। এক্ষেত্রে একটি সেক্টরে একজন লার্ভিসাইডিং, একজন অ্যাডাল্টিসাইডিং, একজন পরিস্থিতি কতটা উন্নতি বা অবনতি হয়েছে তা দেখভাল করবে এবং অন্যজন এলাকার নাগরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক বা যোগাযোগ রাখবে, যাতে তারাও মশক নিয়ন্ত্রণ কাজে যুক্ত থাকতে পারে। এভাবে কাজগুলো শুরু করলে মশার উৎপত্তিস্থলও চিহ্নিত করে ধ্বংস করা সম্ভব হবে। কিন্তু লোকজন যা আছে সেখানেও আরও কমানো হচ্ছে। এতে মশক নিধনের কার্যক্রমে গতি কমে আসবে।

এ বিষয়ে কথা বলতে ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. শরীফ আহমেদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত