যে নজিরবিহীন নিরাপত্তা আর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে ২০ জানুয়ারি জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেন তার তুলনা যুক্তরাষ্ট্রে নেই। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন, ভোট গণনা আর ফল প্রকাশে নাটকীয় দীর্ঘসূত্রতা এবং মামলা-মোকদ্দমা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যে উত্তেজনা চলছিল সেসব ছাপিয়ে বিশ^বাসীকে নতুন একটি শব্দ উপহার দিয়ে গেলেন সদ্যবিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শব্দটা ট্রাম্পিজম। ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে হেরে গিয়েও কিছুতেই ফল মেনে নিতে পারছিলেন না ট্রাম্প। ফল চ্যালেঞ্জ করে মোট ৬৩টি মামলা করে মাত্র একটিতে জিতেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু এরপরও ‘হার না মেনে’ তিনি নিজের সমর্থকদের প্ররোচিত করেন যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট ভবন ক্যাপিটল হিল দখল করতে। ৬ জানুয়ারি ট্রাম্পের সমর্থকরা যে সশস্ত্র কায়দায় স্বল্প সময়ের জন্য ক্যাপিটল হিল দখল করে নেয় তাতে বিস্মিত পুরো বিশ্ব। ক্যাপিটল হিলের ঘটনায় অভিযুক্ত করে প্রতিনিধি পরিষদ তাকে ‘ইমপিচ’ করে; যদিও সিনেটে তিনি ‘ইমপিচড’ হননি। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ট্রাম্পই একমাত্র প্রেসিডেন্ট, যিনি দু-দুবার ‘ইমপিচড’ বা অভিশংসিত হলেন। সে যা-ই হোক, বিশ্ব গণমাধ্যমের প্রখ্যাত কলামনিস্টরা লিখছেন ট্রাম্পের বিদায়ে চার বছর ধরে আটকে রাখা দম ছেড়ে এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে বিশ্ববাসী।
স্বস্তির খবর হলো রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষার পর নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শপথ নিয়েই হোয়াইট হাউজে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কর্মযজ্ঞে লেগে পড়েছেন। তিনি প্রথমেই যে ১৫টি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফিরে যাওয়া এবং বহুল সমালোচিত ‘মুসলিম অভিবাসন নিষেধাজ্ঞা’ রদ করা। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১৭ সালে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সাতটি দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে যে আদেশে ট্রাম্প স্বাক্ষর করেছিলেন সেটা বাতিল করে দিয়েছেন বাইডেন। হোয়াইট হাউজে বাইডেনের প্রেস সেক্রেটারি জেন পিসাকি বলেছেন, মুসলিম নিষেধাজ্ঞার বিষয়টির ইতি টেনেছেন প্রেসিডেন্ট। ধর্মীয় শত্রুতা ও বিদ্বেষ থেকে সরে আসার জন্য তিনি এ পদক্ষেপ নিয়েছেন। একই দিনে জো বাইডেন বলেছেন, ‘যখন সংকট মোকাবিলার বিষয় আসে, তখন নষ্ট করার মতো সময় থাকে না।’ বাইডেন যে সময়ে এই দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন সেটা বিবেচনা করলে তার এই মন্তব্য বুঝতে কারুরই অসুবিধা হওয়ার কথা না। একদিকে মানব ইতিহাসের ভয়াবহতম মহামারীতে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ও মৃত্যুর অভিজ্ঞতা, আরেক দিকে পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গদের মৃত্যুকে ঘিরে সহিংস আন্দোলন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে যখন তুমুল আলোড়ন চলছিল তার মধ্যেই বাইডেনের এই বিজয় এসেছিল। আর সর্বশেষ সহিংসতায় এই উত্তেজনা অতীতের সব মাত্রাকেই ছাড়িয়ে যায়।
জো বাইডেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একদিকে যেমন বিশ^ব্যাপী প্রত্যাশার পাহাড় তেমনি অন্যদিকে আগামীর যে সব চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে তার দৃষ্টান্তও ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হচ্ছে। বাইডেনের শপথ গ্রহণের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওসহ ট্রাম্প প্রশাসনের ২৮ জন শীর্ষ কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে চীন। আলজাজিরা জানায়, এক বিবৃতিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ঘটনা থেকে ট্রাম্প-আমলের চীন-যুক্তরাষ্ট্র তিক্ততার বিষয়টি যেমন বোঝা যায় তেমনি এই দুই বিশ্ব পরাশক্তির আগামী দিনের সম্পর্কের একটা ইঙ্গিতও পাওয়া যায় বটে। কেবল চীনই নয়, পুরো এশিয়ার সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বিষয়টি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হতে পারে। কেননা, বিশ^ব্যাপীই এখন ‘এশিয়ান সেঞ্চুরি’র কথা আলোচিত হচ্ছে। বলা হচ্ছে, উনিশ শতক ছিল ব্রিটেনের, বিশ শতক ছিল যুক্তরাষ্ট্রের, আর একুশ শতক হবে এশিয়ার। এশিয়ার তিনটি বড় অর্থনীতি চীন, ভারত ও জাপান আগামী দিনের বিশ্ব রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য যে নীতি প্রণয়ন করেছিলেন, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল চীন। বাইডেন এখন সে ‘অবস্থান’ থেকে বেরিয়ে আসেন কি না সেটাই দেখার বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্র নিজের অর্থনীতি এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা নিয়েই বিরাট চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। তার ওপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্টের কাছে দেশবাসী আর বিশ^বাসীর প্রত্যাশার পাহাড়। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিজ সম্প্রতি এক প্রবন্ধের শিরোনাম দিয়েছেন ‘কোথায় আমেরিকা?’ প্রবন্ধের সমাপনী মন্তব্যে তিনি বলেছেন, ‘যে অবস্থায় ট্রাম্প আমেরিকাকে রেখে যাচ্ছেন, তা কাটিয়ে উঠতে একজন প্রেসিডেন্ট বাইডেন নয়, বরং বেশ কয়েকটি প্রেসিডেনশিয়াল টার্মের প্রয়োজন হবে।’ অন্যদিকে, সাম্প্রতিক ট্রাম্পিজম যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে যেভাবে কলঙ্কিত করেছে, তাতে ট্রাম্প বিদায় নিলেও যুক্তরাষ্ট্র তথা বিশ্ব রাজনীতিতে কখন কোথায় এমন ট্রাম্পিজম আবারও ফিরে আসে তা নিয়েও চিন্তিত সমালোচকরা। বিশ্বের সব শান্তিকামী মানুষের মতো বাংলাদেশের মানুষও চায় জো বাইডেন এবং যুক্তরাষ্ট্র একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইতিবাচক ভূমিকায় নিজেদের প্রতিষ্ঠা করুক।
