যে ভাইরাস কর্মকর্তাদের সাধারণ মানুষের কাছে নিয়েছে

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২১, ১২:১০ এএম

চলমান মহামারী প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে গেছে। সারা দেশের মানুষ যখন করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত থাকতে নিজেকে ঘরবন্দি করে রেখেছেন, ঠিক তখনই প্রশাসনের কর্মকর্তারা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তাদের ফোন দেওয়ার সংস্কৃতি দেশে নেই বললেই চলে। ভয়ভীতি নিয়ে অভাবগ্রস্ত মানুষ যখন কর্মকর্তাদের ফোন দিয়েছেন বা এসএমএস পাঠিয়েছেন তখন কর্মকর্তারা তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। সাধারণ মানুষকে অবাক করে দিয়ে মাঠপ্রশাসনের কর্মকর্তারা নিজেরাই খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য সহায়তা নিয়ে তাদের কাছে পৌঁছে গেছেন।

করোনাভাইরাসের বিস্তারের শুরু থেকে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ডিসি ও ইউএনওরা মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের সঙ্গে পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন। এ কাজ করতে গিয়ে অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এরপরও তারা থেমে থাকেননি। সুস্থ হয়ে পুনরায় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা প্রশাসন নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। করোনাকালে কর্মহীন ও হতদরিদ্রদের জন্য অনেক উদ্যোগ ছিল ব্যতিক্রমী। প্রশাসনের কর্মকর্তারা কোথাও ‘মানবতার ঘর’ করেছেন। ভাসমান কোয়ারেন্টাইন চালু করেছেন। মিনি ট্রাকে কেবিন আর অ্যাম্বুলেন্স করে রোগীর সেবায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। ফুড ব্যাংক, ভ্রাম্যমাণ বাজারও বসানো হয়েছিল। শুধু মাঠপ্রশাসনই নয়, মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কিছু কর্মকর্তার কর্মকা-ও ছিল চেখে পড়ার মতো। অনেক কর্মকর্তা একাধিকবার করোনা আক্রান্ত হয়েও অফিসে ছুটে গেছেন। নিজের দায়িত্বটুকু পালনের মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মহিবুল হাসান অফিস করে চার দফায় করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। করোনা পজিটিভ থেকে নেগেটিভ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আবার অফিসে পৌঁছে গেছেন। প্রয়োজনীয় বাজেট ছাড়ের কাজ করে তিনি সাধারণ মানুষের সেবায় অংশ নিয়েছেন। এ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিবরাও সাপোর্ট দিয়েছেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও সাড়া দিয়েছেন। পাশে ছিলেন স্বরাষ্ট্রসহ আরও কিছু মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা। সবাই বাসায় নিরাপদে বসে পরিস্থিতি থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এরকম কোনো সুযোগ ছিল না। নিয়মিত অফিস করতে গিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের সচিবসহ একাধিক কর্মকর্তা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে নির্দেশনা নিয়ে লকডাউনের সময়সীমা নির্ধারণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত ছিলেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা। পুরো বিষয়টি সমন্বয় করেছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় করোনাভাইরাসের প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দিয়েছে অতিরিক্ত জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ।

নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলা প্রশাসন চালু করেছিল মানবতার ঘর। যেখানে গরিবদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখা হয়েছিল। বিত্তবান ও দানশীলরা যেখানে টাকা ও খাদ্যসামগ্রী রেখে গিয়েছিলেন। যাদের খাবারের প্রয়োজন, তারা নিঃসংকোচে মানবতার ঘর থেকে তার প্রয়োজনীয় খাবার বা অন্যান্য জিনিসটি নিয়ে যেতে পেরেছেন। মানবতার ঘরের মাধ্যমে প্রায় সাত হাজার কর্মহীন অসহায় মানুষকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। মানবতার ঘরের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিদিন আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা হয়েছিল। গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায় ত্রাণের জন্য ফুড ব্যাংক খোলা হয়েছিল।

শুধু নওগাঁ-গাইবান্ধা নয়, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রায় প্রত্যেক জেলা-উপজেলায় ছিল এমন নানা উদ্যোগ। পটুয়াখালীতে পটুয়াখালী-ঢাকা রুটের যাত্রীবাহী ‘এ আর খান-১’ লঞ্চকে প্রাতিষ্ঠানিক ভাসমান কোয়ারেন্টাইন ইউনিট হিসেবে চালু করেছিল জেলা প্রশাসন। কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিদের দেখভাল করার জন্য ছিলেন ডাক্তার। চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করার লক্ষ্যে কক্সবাজারে চালু করা হয়েছিল ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল। একটি মিনি ট্রাককে কেবিন বানানো হয়েছিল। সঙ্গে ছিল একটি অ্যাম্বুলেন্স। এগুলো নিয়ে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে চিকিৎসা দিয়েছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন।

মৌলভীবাজার জেলায় চালু করা হয়েছিল ভ্রাম্যমাণ বাজার। যেখান থেকে ঘরে বসে কেনা যাচ্ছিল প্রতীকী মূল্যে চাল, ডাল, তেল, আলু ও পেঁয়াজ। ‘সময়ের দাবি ত্রাণ যাবে বাড়ি’ কর্মসূচির মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষের বাড়ি বাড়ি ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছে ঠাকুরগাঁও ও চাঁদপুর জেলা প্রশাসন। ঠাকুরগাঁও জেলায় এ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ছয় হাজার মানুষকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের ফোনকলের ভিত্তিতে এসব ত্রাণ দেওয়া হয়েছিল। নওগাঁ জেলা প্রশাসনে স্বেচ্ছায় শ্রম দিয়েছে ৪৫০ জনের একটি মানবিক দল। প্রশাসনের এসব উদ্যোগ দেশব্যাপী প্রশংসিত হয়েছিল।

ঠাকুরগাঁও ও সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক করোনা রোগীদের বাড়িতে গিয়েছেন এবং সঙ্গে নিয়েছেন একঝুড়ি ফল ও উপহারসামগ্রী। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি সবজি ক্রয় করে তা ত্রাণ ও ইফতারের সঙ্গে দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করেছেন অনেক জেলা-উপজেলা প্রশাসন। এতে একদিকে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয়েছে, তেমনি দরিদ্ররাও পেয়েছেন পুষ্টিকর সবজি।

ফেইসবুকে দেখে ভিক্ষুকের বাড়িতে খাবার নিয়ে হাজির ডিসি

ফেইসবুকে একটি ছবি দেখে সংশ্লিষ্ট ঠিকানায় খাবার পৌঁছে দেন নওগাঁর জেলা প্রশাসক হারুন-অর-রশীদ। তার ফেইসবুক বন্ধুদের একজন সাবিয়া বেগমের একটি ছবি পোস্ট করে। সেখান থেকে ডিসি জানতে পারেন সাবিয়ার বয়স ৭০ বছর। সম্বল বলতে নওগাঁ শহরের বাঙ্গাবাড়িয়া এলাকায় সরকারি জমিতে টিনের তৈরি একটি ঘর। মানুষের বাড়ি ভিক্ষা করে জীবন চলত তার। কিন্তু করোনাভাইরাস আতঙ্কে তখন কেউ বাড়িতে ঢুকতে দিত না। ফলে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছিল তার। এক দিন তিনি অন্যের ফেলে দেওয়া ভাত ধুয়ে খাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। বিষয়টি নজরে এলে ওই বৃদ্ধার বাড়িতে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসমাগ্রী নিয়ে হাজির হন নওগাঁর জেলা প্রশাসক। শুধু ওই সাবিয়া বেগমই নন, করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে কর্মহীন হয়ে পড়া আরও ২৪টি পরিবারের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন ডিসি। তার উদ্যোগে জেলায় প্রায় ৪০ হাজার পরিবারের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। কেউ যাতে সামাজিকভাবে হেয় না হন, সেজন্য জনসমাগম না করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হয়।

নাটোরের জেলা প্রশাসক মো. শাহরিয়াজ ও সদর ইউএনও জাহাঙ্গীর আলম করোনাভাইরাসের কর্মহীন হয়ে পড়া অভাবী মানুষদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাদ্য সহায়তা দিয়েছেন। তাদের সঙ্গে এসি (ল্যান্ড) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরাও ছিলেন। তারা প্রতিদিনই ছুটেছেন গ্রাম থেকে গ্রামে।

ভিড় এড়াতে গভীর রাতে ত্রাণ বিতরণ

করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মাঝে রাত ৪টায় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিয়ে বিস্মিত করেছেন দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাহমুদুল আলম। দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছয়টি দল শহরের বিভিন্ন এলাকায় ৫০০ পরিবারকে রাত ৪টা থেকে সকাল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত এ ত্রাণ বিতরণের কাজ করেন। গভীর রাতে ত্রাণ বিতরণ করার কারণ জানতে চাইলে জনসমাগমের কথা বলা হয়। দিনে ত্রাণ দিতে গেলে অনেক মানুষ সমবেত হয়। মানুষ যাতে একজনের সঙ্গে আরেকজনের কাছাকাছি আসতে না পারে সেজন্যই গভীর রাতে ত্রাণ দেওয়া হয়। করোনায় কর্মহীন ও ক্ষতিগ্রস্তরা জেলা প্রশাসক বরাবর খাদ্যসামগ্রীর জন্য আবেদন করলে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে এসব ত্রাণ কর্মহীনদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন কুষ্টিয়ার ডিসি

করোনাভাইরাসের প্রথম ধাক্কায় কুষ্টিয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়া সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষের বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল খাদ্যসামগ্রী। ছুটে গিয়েছেন জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন নিজেও। অসহায় মানুষদের খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিতে তিনি প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়েছেন। সেই সঙ্গে তিনি জীবাণুনাশক ও মাস্ক বিতরণ করেছেন। সাধারণ মানুষকে নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব সম্পর্কেও বুঝিয়েছেন। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সবাইকে বাড়িতে অবস্থান করার অনুরোধ জানিয়েছেন এবং জরুরি প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে বের হলে মাস্ক ও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

হোম কোয়ারেন্টাইন দেখার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন ইউএনও

হোম কোয়ারেন্টাইনে অবস্থান করছেন কি না তা পর্যবেক্ষণের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জুবায়ের হোসেন চৌধুরী। মার্চ থেকে শুরু করে এপ্রিল পর্যন্ত তিনি এ কাজ করেছেন। ওই সময় বিদেশফেরতদের ওপর কঠোর নজরদারির নির্দেশনা ছিল। জুবায়ের হোসেন তালিকা ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের শনাক্ত করেছেন। ওই সময় সদর উপজেলায় ইতালি প্রবাসী দুজন ছিলেন। তাদের বিষয়ে কঠোর মনিটরিং চালানো হয়েছিল। নির্দিষ্ট সময়ের আগে তাদের বাইরে বের হতে দেওয়া হয়নি। তারা কোথাও যাওয়ার চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হয়। পাশাপাশি প্রতিটি ইউনিয়নে ২১ সদস্য ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ১১ সদস্যের কমিটি গঠন করে দিয়েছিলেন ইউএনও। কমিটির সদস্যরা করোনার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করেছে।

সাহস জোগাতে গিয়ে নিজেই করোনা আক্রান্ত হলেন খালেদা খাতুন

করোনা সংক্রমণ শুরু থেকেই পিরোজপুরের কাউখালীতে এ ভাইরাসের বিস্তার থেকে সাধারণ মানুষকে দূরে রাখতে নিরলসভাবে কাজ করেছেন ইউএনও খালেদা খাতুন রেখা। কেউ আক্রান্ত হলে নিজেই তার বাড়িতে গিয়ে সাহস জুগিয়েছেন। এ কাজ করতে করতে তিনি নিজেই একসময় করোনা পজিটিভ হয়েছেন। মানুষের জীবন নিরাপদ রাখতে শুরু থেকে লকডাউন সফল করতে নিজেই হ্যান্ডমাইক নিয়ে প্রচার চালিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের জীবন নিরাপদ রাখতে সতর্কতামূলক চিঠি পৌঁছে দিয়েছেন বাড়িতে। ঘরবন্দি মানুষকে বাঁচাতে কাঁচাবাজার, ফল, মাছসহ প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে গেছেন প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের দোরগোড়ায়। ঘরবন্দি মানুষের জন্য জরুরি ওষুধ সরবরাহ করেছেন। কাউখালীর সন্ধ্যা নদী তীরবর্তী জনপদের মানুষের জন্য ট্রলারে করে খাদ্য সরবরাহ করেছেন।

ফোনকল পেলেই ত্রাণ নিয়ে দে ছুট

করোনাভাইরাসে জনজীবনে নেমে এসেছে দুর্ভোগ ও অভাব-অনটন। উখিয়াবাসীকে বিভিন্ন নির্দেশনা দিতে তাদের কাছে গিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান চৌধুরী। মোবাইল ফোনকল পেলেই গ্রামগঞ্জে ত্রাণ নিয়ে ছুটে যান ওই কর্মকর্তা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মোবাইল ফোনের কললিস্টের সূত্র ধরে অসহায়, হতদরিদ্র, কর্মহীন পরিবারের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন তিনি।

কান ধরে দাঁড় করানো সেই ৩ বৃদ্ধের কাছে ক্ষমা চাইলেন ইউএনও

মাস্ক না পরায় কান ধরিয়ে ছবি তোলা সেই তিন বৃদ্ধের বাড়িতে গিয়ে ক্ষমা চেয়েছিলেন যশোরের মনিরামপুর উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ শরিফী। ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়ে তিন পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল দেন তিনি। খাবার ফুরিয়ে গেলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করে পুনরায় খাবার সংগ্রহ করেন তারা। এর আগে মনিরামপুরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইয়েমা হাসানের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়। স্থানীয় চিনাটোলা বাজারে অভিযানের সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের সামনে পড়েন দুই বৃদ্ধ। এর মধ্যে একজন বাইসাইকেল চালিয়ে আসছিলেন এবং অন্যজন রাস্তার পাশে বসে কাঁচা তরকারি বিক্রি করছিলেন। তাদের মুখে মাস্ক ছিল না। এ সময় পুলিশ ওই দুই বৃদ্ধকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করলে সাইয়েমা হাসান শাস্তি হিসেবে তাদের কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখেন। শুধু তাই নয়, এ সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিজেই তার মোবাইল ফোনে এ চিত্র ধারণ করেন। কিছুক্ষণ পর অন্য এক ভ্যানচালককে অনুরূপভাবে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখেন। এ ঘটনায় সারা দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইয়েমা হাসানকে প্রত্যাহার করেছিল।

জনগণের সেবায় বিরামহীন ছুটেছেন ফুলপুরের করোনাযোদ্ধারা

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সামনের সারিতে থেকে কাজ করেছেন ময়মনসিংহের ফুলপুরের সাবেক ইউএনও মো. সাইফুল ইসলাম, ওসি ইমারত হোসেন গাজী, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. রাশিদুজ্জামান খান, আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. প্রাণেশ চন্দ্র প-িত ও স্কাউট লিডার তাসফিক হক। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিরলস পরিশ্রম করেছেন। জনগণের সেবায় ছুটে গেছেন পুরো পৌর ও উপজেলা এলাকায়। এসব কর্মকর্তা উপজেলাবাসীর কাছে থেকে ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছেন। ফুলপুরে করোনাভাইরাসের প্রভাবে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, কর্মহীন ও লকডাউনে আটকা পড়াদের বাড়ি গিয়ে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন তারা। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে সচেতনতাবিষয়ক প্রচার, জীবাণুনাশক স্প্রে ও পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করেন।

অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ইউএনও মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার পর শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকা এক মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে হাজির হয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সদর ইউএনও নাহিদা বারিক। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ ও সদর উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শাহাজাহান ভূঁইয়া জুলহাস। করোনাভাইরাসের প্রথম ঢেউয়ে নারায়ণগঞ্জ করোনাভাইরাস সংক্রমণের হটস্পট ছিল।

খাদ্য নিয়ে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন কর্মকর্তারা

করোনার প্রথম ঢেউয়ের সময় কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার জাফরাবাদ ইউনিয়নের পশ্চিম জাফরাবাদ গ্রামের ফাতেমা আক্তার অসুস্থ ছিলেন। তার ছেলে আল-আমিন রাজধানী ঢাকায় দিনমজুরের কাজ করতেন। ২৬ মার্চ সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এদিনেই খালি হাতে বাড়ি ফিরে যান তিনি। এ অবস্থায় খেয়ে না-খেয়ে দিন পার করছিলেন তারা। বিষয়টি জানার পর করিমগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তসলিমা নূর হোসেন নিজে পরিবারটির খোঁজ নিতে বাড়িতে যান। সেখানে গিয়ে পরিবারটিকে ১০ কেজি চাল, পাঁচ কেজি আলু ও দুই কেজি ডাল সহায়তা হিসেবে দেন। আমলিতলা বাজারে সেলুনে কাজ করতেন আনোয়ার হোসেন। সেলুনে কাজ করে যে টাকা পেতেন তা দিয়ে স্ত্রী-কন্যা নিয়ে চলত তার। দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তার রোজগারও বন্ধ হয়ে গেছে। দুদিন কোনোরকমে পার করলেও এরপর থেকে তার হাত খালি। চাল-ডাল কেনার টাকা নেই। লজ্জায় এ কথা কাউকে বলতেও পারছিলেন না। জাফরাবাদ ইউপি চেয়ারম্যান বিষয়টি জেনে তার নামটিও তালিকায় রাখতে ইউএনওকে অনুরোধ করেন। ইউএনও তার হাতে তুলে দেন খাদ্যসামগ্রী।

রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে অসহায় মানুষের পাশে ইউএনও

সময়টা বড্ড খারাপ ছিল। সারাবিশ্ব লড়াই করেছে অদৃশ্য এক রোগের বিরুদ্ধে, কখনো করছে। অসহায়ভাবে দিন পার করেছেন সিলেটের হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার হাজার হাজার মানুষ। হতাশাগ্রস্ত মানুষের পাশে ছিলেন সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার পাল। তিনি বরাদ্দকৃত খাদ্যসামগ্রী প্রতিনিয়ত মানুষের দরজায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাকে থামাতে পারেনি রোদ কিংবা বৃষ্টি। অনেক সময় গভীর রাতেও খাদ্যসামগ্রী নিয়ে ছোটেন তিনি। শতবাধা পেরিয়ে মানুষের দরজায় খাদ্য নিয়ে উপস্থিত হন এই ইউএনও। চক্ষুলজ্জার কারণে যেসব মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা ত্রাণ নিতে লাইনে দাঁড়াতে পারেননি তাদের এসএমএস পেলেই সেসব অভাবী মানুষের বাড়িতে গোপনে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বজিৎ কুমার পাল। কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার একেএম সাইফুল উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকায় অসহায় মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মাঝে দ্রুত খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেন। এতে অনেক অসহায় মানুষ জরুরি ত্রাণ পেয়েছেন। তিনি মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্যও কাজ করেছেন। কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে করোনা নিয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে তৎপর ছিলেন ইউএনও লামইয়া সাইফুল। তিনি হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা প্রবাসীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। নাঙ্গলকোটে বিদেশ থেকে ফিরে আসা প্রবাসীরা কোয়ারেন্টাইন মানছিলেন না। প্রবাসীরা যাতে সঠিকভাবে হোম কোয়ারেন্টাইনের নিয়মনীতি মেনে চলেন তার জন্য তিনি ব্যাপক প্রচার চালান।

ঢাকার নবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় সতর্কবার্তা নিয়ে বাড়ি বাড়ি যেতে দেখা গেছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচএম সালাউদ্দীন মনজুকে।

ধুনটে ইউএনওর ‘ভালোবাসার থলে’

বগুড়ার ধুনট উপজেলায় করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের বাড়িতে খাদ্য সহায়তা পাঠিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। সাবেক ইউএনও রাজিয়া সুলতানা আক্রান্তদের বাড়িতে গিয়ে তাদের প্রতি সমবেদনা জানান। এ সময় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে মনোবল চাঙ্গা রেখে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সবাইকে পরামর্শ দেন। পাশাপাশি পরিবারগুলোকে খাদ্য সহায়তা দেন। খাদ্য সহায়তা হিসেবে তাদের জন্য ১০ কেজি চালের সঙ্গে ডাল, তেল, লবণ ও আলুসহ নানা পদের সবজি ভর্তি করে প্যাকেট পাঠান তাদের বাড়িতে। স্থানীয়রা এসব প্যাকেটকে ‘ভালোবাসার থলে’ নাম দিয়েছেন। করোনা সংক্রমণ শুরুর পর থেকেই নিয়মিত সরকারি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন ইউএনও স্নিগ্ধা তালুকদার। কর্মহীনদের মাঝে সরকারি সহায়তা বিতরণ, উপজেলাজুড়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ এবং ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করতে তার তৎপরতা জেলাজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত ইউএনও নিজেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা আসমাউল হুসনা লিজা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি শুরু থেকেই করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে নিরলসভাবে কাজ করেছিলেন। কেউ করোনা পজিটিভ হলে তার বাড়িতে তিনি নিজেই ফল নিয়ে যেতেন। উৎসাহ জোগাতেন করোনা রোগীকে। শেষ পর্যন্ত এ মহামারী করোনা তার ঘরেই হানা দিয়েছে। প্রথমে তার স্বামী প্রকৌশলী ইসতিয়াক আহমেদ করোনা পজিটিভ হন। এরপর তারও করোনা ধরা পড়ে।

লেখক : সাংবাদিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত