কোটির বেশি মানুষকে চিকিৎসা দিয়েছে ১৬২৬৩

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২১, ১২:২৩ এএম

চীনের উহান প্রদেশে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে প্রথম করোনা সংক্রমণ ঘটে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বিশ্ববাসী এ বিষয়ে অবহিত হয়। ভাইরাসটি তখনো ছিল চীনকেন্দ্রিক। তবে আতঙ্ক বিরাজ করছিল বিশ্বজুড়ে। দিন যত এগোয়, ভাইরাসের ব্যাপ্তিও বাড়তে থাকে। ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম এই ভাইরাসটি শনাক্ত হয়। দিনে দিনে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। চারদিকে সৃষ্টি হয় এক ভীতিকর পরিবেশ। কী করা উচিত? কীভাবে বুঝবে আক্রান্ত কি না? আক্রান্ত হলেই-বা কী করতে হবে। এ নিয়ে চারদিকে ধোঁয়াশা তৈরি হয়। দেশের হাসপাতাল ও প্রাইভেট চিকিৎসাকেন্দ্রেও মিলছিল না জরুরি স্বাস্থ্যসেবা। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসা প্রার্থী মানুষের কাছে আশার আলো হয়ে দেখা দেয় জাতীয় স্বাস্থ্য বাতায়নের টেলিমেডিসিন সেবার হটলাইন ১৬২৬৩। করোনার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এক কোটিরও বেশি মানুষ এই হটলাইনের মাধ্যমে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সেবা নিয়েছেন। সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে যাদের মধ্যে পরে কভিড-১৯ সংক্রমণ ধরা পড়েছে, পরে তাদের হেল্পলাইন থেকে ফোন করেও খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে, দেওয়া হয়েছে পরামর্শ সেবা।

মহামারীর মধ্যে ১৬২৬৩ হেল্পলাইন সাধারণ মানুষের জন্য কতটা ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে পরিসংখ্যান ঘাঁটলেই তা বোঝা যায়। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর এ হটলাইনে ফোন করে টেলিমেডিসিন সেবা নিয়েছেন ১ কোটি ৫৪ লাখ ৭৭ হাজার ৫৪৯ জন। এর মধ্যে গত ৮ মার্চ থেকে ২৮ নভেম্বর এই ৮ মাসে সেবা নিয়েছেন ১ কোটি ৫ লাখ ৭৪ হাজার ৬৪৭ জন। দেশে করোনার প্রকোপ শুরুর পর থেকে হিসাব করলে প্রতিদিন গড়ে ৩৯ হাজার ৭৫৪টি কল এসেছে জাতীয় স্বাস্থ্য বাতায়নে। এর মধ্যে করোনাভাইরাস সম্পর্কিত তথ্যের জন্য কল ছিল ৮৩ লাখ ৮৯ হাজার ৬৮৩টি, করোনাভাইরাসের লক্ষণ-উপসর্গ নিয়ে কল দিয়ে সেবা নিয়েছেন ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৪ মানুষ। ২৮ নভেম্বর ২৪ ঘণ্টায় আসা ৯ হাজার ৫৮টি কলের মধ্যে ৩ হাজার ৬২৩টি কল ছিল করোনাভাইরাস সম্পর্কিত। সেদিন অতি জরুরি কল এসেছে ৫১১টি।

অন্যদিকে এ সময়ে স্বাস্থ্য বাতায়নের চিকিৎসকরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের খোঁজখবর নিতে ২ লাখ ৫৩ হাজার ২১৩টি কল করেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমরা নিরলসভাবে জাতীয় স্বাস্থ্য বাতায়নের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্য সাধ্যের সবটুকুই করছি আমরা। হাসপাতাল সেবার পাশাপাশি মানুষ যেন টেলিমেডিসিন সেবা পায়, সেদিকে লক্ষ রেখেই ২৪ ঘণ্টা এ সেবা চালু রাখা হয়েছে। কর্মীরা দিনরাত এই সেবা চালু রেখে চলেছেন, তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা।’

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩-এর প্রধান কার্যালয়। বেসরকারি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সিনেসিস আইটি এই কল সেন্টার পরিচালনা করছে। সরকারের তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উদ্যোগ অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই), আইসিটি বিভাগ এটি পরিচালনায় সহায়তা করছে। ৮৪ জন চিকিৎসক ও ৩৬ জন স্বাস্থ্য তথ্য কর্মকর্তা টেলিফোনে কভিড রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টা এই সেবা পাওয়া যায়। কর্মকর্তারা জানান, ১৬২৬৩ নম্বরের কল ছাড়াও ৩৩৩ নম্বরে আসা কলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কল সেন্টারে চলে আসে। এসব কলের অন্য প্রান্তে থাকা ব্যক্তিদের সহায়তা করেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য তথ্য কর্মকর্তারা।

জাতীয় স্বাস্থ্য বাতায়নের কল সেন্টারে কীভাবে একটার পর একটা কল আসছে এবং সেবাপ্রত্যাশীদের সমস্যা জেনে সমাধান দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, সে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন সিনেসিস হেলথের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘কোনো রোগী যখন পরামর্শের জন্য হেল্পলাইনে ফোন করেন, তা সরাসরি একজন চিকিৎসকের কাছে আসে। সেই চিকিৎসক রোগীর অবস্থা, তথ্য-উপাত্ত যাচাই করে রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা করেন এবং চিকিৎসার বিষয়ে পরামর্শ দেন। চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র ই-প্রেসক্রিপশন আকারে রোগীর মোবাইলে চলে যায়। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগে তিন থেকে পাঁচ মিনিট।’

মহামারী শুরুর পর থেকে স্বাস্থ্য বাতায়নে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন ডা. রেহনুমা। লকডাউনের সময়ও তিনি নিয়মিত অফিসে গেছেন। টেলিফোনে মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নিজে চিকিৎসক বলে ভয় থাকবে না বিষয়টা এমন না। প্যানডেমিকের (মহামারী) শুরুতে আমার পরিবারের একজন করোনায় মারা যান। কাছের কেউ চলে যাওয়ার ব্যথা আমি বুঝি। এ কারণে ভয় থাকলেও অফিস করেছি, মানুষকে সেবা দিচ্ছি।’

তথ্য বাতায়নের কর্মকর্তারা জানান, করোনা রোগীকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বা অ্যাম্বুলেন্স সেবা দেওয়ার ব্যাপারেও সেন্টার থেকে সহায়তা করা হচ্ছে। এ ছাড়া দাফন ও কবর দেওয়ার ক্ষেত্রেও সহায়তা করা হচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় সরকারের এই বড় উদ্যোগ ছাড়াও আরও কিছু প্রতিষ্ঠান করোনা রোগীদের টেলিমেডিসিন সেবা দিচ্ছে। এর কিছু আছে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। কিছু বড় হাসপাতালের নামকরা চিকিৎসকরাও টেলিফোনে সেবা দিচ্ছেন।

সর্বোপরি চিকিৎসকরা ব্যক্তিগত চেম্বার বা বাসা থেকে করোনা রোগীকে চিকিৎসা দিচ্ছেন মুঠোফোনের মাধ্যমে। ভিডিও কলের মাধ্যমে রোগী চিকিৎসকের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। চিকিৎসক হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারে ব্যবস্থাপত্র পাঠিয়ে দিচ্ছেন এমন ঘটনা স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হয়েছে। সেসব ব্যবস্থাপত্র ওষুধের দোকানে পাঠালে রোগী ঘরে বসে ওষুধ পাচ্ছেন।

স্বাস্থ্য বাতায়নের টেলিমেডিসিন সেবার হটলাইনে এ পর্যন্ত যত কল এসেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৩ শতাংশ মানুষ ফোন করেছেন সর্দি-জ্বরের মতো উপসর্গ নিয়ে। ১১ শতাংশ মানুষ করোনাভাইরাসের চিকিৎসা নিয়েছেন। এ ছাড়া ৯ শতাংশ জ্বর, ৮ শতাংশ শারীরিক দুর্বলতা, ৫ শতাংশ শুকনো কাশি, ২ শতাংশ গলাব্যথা, ২ শতাংশ অ্যাসিডিটির সমস্যা, ১ শতাংশ নাক দিয়ে পানি পড়া, ১ শতাংশ অ্যাজমা, ১ শতাংশ মানুষ মানসিক অসুস্থতার চিকিৎসা নিয়েছেন।

স্বাস্থ্য বাতায়নে চিকিৎসাসেবা নিয়ে রোগীদের সন্তোষজনক মনোভাবও উল্লেখযোগ্য। এ পর্যন্ত যত কল এসেছে তার মধ্যে মাত্র ২ শতাংশ রোগী সেবা সম্পর্কে অভিযোগ করেছেন। সেবা গ্রহীতাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার পর স্বাস্থ্য বাতায়ন থেকে টেলিফোন করে তার খোঁজ নিয়েছেন চিকিৎসকরা। কী করতে হবে, কী করা যাবে না এ-সংক্রান্ত নানা পরামর্শও পেয়েছেন তারা।

রাজধানীর ধানমন্ডির বাসিন্দা তমাল চৌধুরী জানান, গত জুনে তিনি তার শরীরে করোনার উপসর্গ দেখা দেয়। এ সময় কোনো হাসপাতালেই যেতে পারছিলেন না। অবশেষে স্বাস্থ্য বাতায়নের হটলাইনে ফোন করে করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ নেন। পরে পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হলে স্বাস্থ্য বাতায়ন থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরামর্শ নেন। মাঝেমধ্যে চিকিৎসকরাই তাকে ফোন করে খোঁজখবর নিয়েছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত