পুরো বিশ্ব যখন করোনায় আক্রান্ত, লকডাউনে সব কিছু বন্ধ, ঘরবন্দি মানুষ, রুটি-রুজির পথ বন্ধ হয়ে অসহায় জীবন শ্রমজীবী মানুষের; ঠিক তখনই ব্যতিক্রমী কিছু মানুষ সমাজের কাছে নিজের দায়বদ্ধতাকে উপলব্ধি করে মানবতার হাত প্রসারিত করছেন। কেউ নীরবে, কেউবা সরবে। সেই ব্যতিক্রম মানুষের মধ্যে যেমন মিডিয়া অঙ্গন বা বিনোদন জগতের তারকারা রয়েছেন; তেমনি রয়েছে কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। অসহায় মানুষের পাশে খাদ্যসামগ্রী ও চিকিৎসা সুরক্ষাসামগ্রী নিয়ে অকুণ্ঠচিত্তে দাঁড়িয়েছেন তারা।
সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন বিনোদন জগতের তারকারা
করোনাকালে অসহায় মানুষের সাহায্যার্থে বিনোদন জগতের তারকারাও সাধ্যমতো পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের কেউ কেউ এককালীন সাহায্য দিয়েছেন; কারও কারও সহযোগিতা এখনো চলমান।
করোনাকালে বাংলাদেশি তারকাদের মধ্যে অনন্ত জলিল ও বর্ষা সবচেয়ে বেশি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। করোনা পরিস্থিতির শুরুতে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অনন্ত জলিল তার কারখানার শ্রমিকদের ১২ কোটি টাকা পারিশ্রমিক দিয়েছেন। দু’বার পাঁচ শতাধিক বেকার শিল্পীকে সহায়তাসামগ্রী দিয়েছেন। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নিজ বাসার সামনে ৩৫০ জনের হাতে তুলে দিয়েছেন খাদ্য ও জীবাণুনাশক সামগ্রী। নিজ গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জে ১০০০ পরিবারের মধ্যে একইভাবে খাদ্য ও জীবাণুনাশক সামগ্রী বিতরণ করেন চিত্রনায়িকা বর্ষা। পাশাপাশি ৫০০ অসহায় মায়ের কাছে তার সন্তানের জন্য এক মাসের দুধ ও খাদ্যসামগ্রী উপহার দিয়েছেন এ অভিনেত্রী। করোনাকালীন ঈদে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অসহায় ভক্তদের জন্য দু’দফায় ২০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন অনন্ত। তাদের বিভিন্ন ধরনের সাহায্য কার্যক্রম এখনো চলমান।
করোনায় বছরব্যাপী আরও এক নায়িকার সহায়তা কার্যক্রম চোখে পড়েছে। তিনি হচ্ছেন নিপুণ। নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে প্রতিষ্ঠানের সব কর্মীকে প্রতি মাসে বেতন চালু রেখেছেন। কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতে অসহায় মানুষের চাহিদা অনুযায়ী আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। ঈদে এফডিসির শিল্পী সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যদের ঘরে ঘরে ঈদ উপহার পাঠিয়েছেন। এছাড়া তার কাছ থেকে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেকেই সহযোগিতা পেয়েছেন।
চিত্রনায়িকা পপিও নিজ এলাকা খুলনায় কয়েকবার অসহায় মানুষের মধ্যে খাদ্যদ্রব্যসহ মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভস ও স্যানিটাইজার বিতরণ করেছেন। চিত্রনায়িকা অপু বিশ্বাসকেও দেখা গেছে সাহায্য করতে। করোনার শুরুর দিকে তিনি শতাধিক কর্মহীন অসহায় মানুষের মধ্যে খাবার, মাস্ক ও গ্লাভস বিতরণ করেছেন।
চিত্রনায়ক বাপ্পী চৌধুরী নারায়ণগঞ্জে নিজ এলাকার কয়েকটি গার্মেন্টসের শ্রমিকদের মধ্যে সাহায্য বিতরণ করেছেন। চিত্রনায়ক জায়েদ খানকে দেখা গেছে শিল্পী সমিতির ব্যানারে অনেকের জন্য সাহায্য এনে দিতে। চিত্রনায়িকা বিদ্যা সিনহা মিম ও মিষ্টি জান্নাতসহ আরও কিছু অভিনেত্রী বিচ্ছিন্নভাবে করোনাকালে অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন।
চরাঞ্চলের নিম্ন আয়ের অসহায় মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন অভিনেতা আজিজুল হাকিম ও তার স্ত্রী জিনাত হাকিম। তাদের খাদ্যদ্রব্য বিতরণ করা হয় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ থানার উজানচরের ৫০০ পরিবারের মধ্যে। বন্যায় প্রতিবছর ক্ষতিগ্রস্ত হয় ওই অঞ্চলের মানুষ। এর মধ্যে অনগ্রসর এই অঞ্চলের মানুষের দুর্বিষহ জীবনকে থামিয়ে দিয়েছে করোনা মহামারী। করোনা মহামারীর শুরুতেই হাকিম দম্পতি চেয়েছিলেন অসহায় ওইসব মানুষের পাশে দাঁড়াতে। করোনার প্রকোপে লকডাউন শুরু হলে সেটা সম্ভব হয়নি। তবে কিছু মানুষকে আর্থিক সাহায্য দিয়েছিলেন তারা।
বরিশালে বাসদের ‘মানবতার বাজার’
করোনা সংকটকালে বরিশাল নগরীর দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। তারা নগরীতে বিনামূল্যে খাদ্য ও ওষুধ বিতরণের জন্য ‘মানবতার বাজার’ নামে একটি বাজার স্থাপন করেছে। সেখান থেকে মানুষ এক দিনের খাদ্যপণ্য নিতে পারেন। বাজারে কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধও রাখে সংগঠনটি। এছাড়া তখন গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সব ধরনের রোগীদের হাসপাতালে নিতে বিশেষ অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থাও করে। সামাজের নানা স্তর থেকে মানুষ মানবতার বাজরের কার্যক্রম চালিয়ে নিতে অর্থ সহায়তা করেছেন বলে জানান স্থানীয় বাসদ নেতারা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছাত্রলীগের ‘এক টাকার বাজার’
করোনাকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের ফরদাবাদ ইউনিয়ন ছাত্রলীগের উদ্যোগে চালু করা হয় ‘এক টাকার বাজার’। এলাকার দরিদ্র মানুষ ওই বাজারে এক টাকায় শাক-সবজি কেনার সুযোগ পেত।
সিলেটে ‘মানবতার ঘর’
সিলেটে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ন্যাশনাল প্রেস সোসাইটি’ হতদরিদ্রদের সহায়তায় তৈরি করে ‘মানবতার ঘর’। নগরীর ২৪নং ওয়ার্ডে তৈরি করা এ ঘরের বিভিন্ন তাকে রাখা হয় চাল, ডাল, তেলসহ নানা খাদ্যপণ্যের প্যাকেট ও কিছু জামা কাপড়। যার যা প্রয়োজন তিনি এ ঘর থেকে নিয়ে গেছেন। আবার কেউ সাহায্য করতে চাইলে এই ঘরে নিজের সাধ্যমতো জিনিস রেখে গেছেন। নগরীর বিত্তবানরা সংগঠনটির এ উদ্যোগে সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন।
মাশরাফীর জীবাণুনাশক চেম্বার
ক্রিকেটার মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরুর পরপরই অসহায় মানুষদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। তিনি নিজ জেলা নড়াইল ও ঢাকার মিরপুরের দরিদ্র মানুষদের ত্রাণ দেওয়ার পাশাপাশি আরও বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেন। নড়াইল-২ আসনের এমপি মাশরাফী তার ‘নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে একটি ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম গঠন করেন। যারা নড়াইল ও লোহাগড়ার তৃণমূল এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন।
অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে প্রিয় ব্যাট নিলামে দিলেন সাকিব-মুশফিক
পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে করোনাকালের শুরুতেই সাকিব আল হাসান চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে থেকে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন দেশের করোনাদুর্গত মানুষের পাশে থাকতে। নিজের প্রিয় গত বিশ্বকাপের ব্যাটটা নিলামে তুলে দিলেন। কত প্রিয়, সেটি জানাতে গিয়ে সাকিব বলেছিলেন, ‘এই ব্যাট দিয়ে খেলেই অসাধারণ একটা বিশ্বকাপ কাটালাম। প্রয়োজনে কখনো ব্যাটে টেপ লাগিয়ে নিয়েছি, তবু পুরো বিশ্বকাপে শুধু এই একটা ব্যাট দিয়েই খেলেছি।’ বিশ্বকাপে দুটি সেঞ্চুরিসহ ৬০৬ রান করেছেন, তার আগে অন্যান্য খেলায় এই ব্যাট দিয়েই আসে ১৫০০ রান। সাকিবের কাছে অমূল্য এই ব্যাটের দাম নিলামে উঠল ২০ লাখ টাকা। সাকিব আল হাসান ফাউন্ডেশন সেই টাকা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াল। আর করোনায় মানবতার ডাকে আরও যারা সাড়া দিচ্ছেন, তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার সরঞ্জাম দিয়ে এবং কোথাও অ্যাম্বুলেন্স কিনে দিয়ে তিনি সাহায্য করেছেন।
স্মারক প্রিয় মুশফিকুর রহিমও আঁকড়ে ধরে ছিলেন একটি বিশেষ ব্যাট। যে ব্যাট দিয়ে ২০১৩ সালে গল টেস্টে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এসেছিল তার প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি, সময়ের প্রয়োজনে কভিড-১৯-কে হারাতে সেই ব্যাট তিনি তুলে দিলেন নিলামে। দাম উঠল ১৭ লাখ টাকা, নিজের ফাউন্ডেশনের জন্য ব্যাটটা কিনে নেন ক্রিকেটের বিশ্বতারকা শহীদ আফ্রিদি। নিলামের সেই টাকা মুশফিক দান করেন করোনায় অসহায়দের জন্য। এছাড়া নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতালের প্রবেশ পথে তিনি জীবাণুনাশক একটি চেম্বার স্থাপন করেন। হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা এই চেম্বারে প্রবেশ করে জীবাণুমুক্ত হয়ে তারপর হাসপাতালে প্রবেশ করেন।
পথের পশুদের পাশে মানবিক মানুষ
করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে দেশ যখন লকডাউনের কবলে, বন্ধ খাবারের দোকান, তখন উচ্ছিষ্ট খেয়ে বেঁচে থাকা পথের পশু-পাখি চরম খাদ্যসংকটে পড়ে। এ সময় পথের এ পশুদের পাশে দাঁড়িয়েছে কিছু মানবিক মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ইসতিয়াক আহমেদ হৃদয় ও তার বন্ধুরা ব্যক্তি উদ্যোগে ক্যাম্পাসে থাকা প্রায় ৪০০ কুকুরের খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। নিজেদের টাকায় এই খাবারের ব্যবস্থা করেন তারা। প্রতিদিন ক্যাম্পাসের ৭-৮ জায়গায় কুকুরগুলোকে খাবার দিতেন তারা। বাদ পড়েনি বিড়াল-কাকও। ক্যাম্পাসের বিড়াল এবং কাকগুলোকেও তারা নিয়মিত খাবার দিয়েছেন। এক পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ইসতিয়াক ও তার বন্ধুদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। আরও বেশকিছু মানুষের সহযোগিতায় ইসতিয়াকের দল কুকুরদের খাবার দেওয়ার কাজ চালিয়ে যান। পথের পশু ও পাখিদের খাবার দিতে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তি উদ্যোগে এরকম আরও কয়েকজন এগিয়ে আসেন। কোথাও কোথাও চাঁদা তুলেও কুকুর, বিড়াল বা কাকের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেছেন অনেকে।
ইতিবাচক ভূমিকায় ছাত্রলীগ
স্বাভাবিক সময়ে কমিটি কিংবা আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে প্রায়ই সংঘর্ষে জড়িয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। তবে করোনার সময় সংঘর্ষ কিংবা দখলবাজিতে দেখা যায়নি। মহামারীতে মানবিক কাজে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে তারা। মার্চে করোনা মহামারী ছড়িয়ে পড়লে নেতাকর্মীদের নিয়ে মানবিক কাজে এগিয়ে আসেন সংগঠনের নেতাকর্মীরা। শ্রমিকসংকটে কৃষকের ধান কাটা থেকে শুরু করে করোনা মহামারীতে বিনামূল্যে স্যানিটাইজার, মাস্ক ও খাবার বিতরণ এবং একসময় করোনার মধ্যে বন্যায় ডুবে যাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে খাবার পৌঁছে দিয়েছে সংগঠনটি। জেলা পর্যায়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দিয়ে মানবিক কাজে মানুষের পাশে দাঁড়ায় তারা। গণভবনে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী সংগঠনটির প্রশংসা করে বলেন, ‘ছাত্রলীগ স্যানিটাইজার তৈরি করেছে। বিনা পয়সায় বিলি করেছে। বিভিন্ন জায়গায় তারা মানুষের ঘরে ঘরে খাবার বিতরণ করেছে। ছাত্রলীগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেখানে খাবার নেই সেখানে খাবার দিতে হবে।’
করোনা মহামারীতে সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য বিনামূল্যে জরুরি অক্সিজেন সরবরাহ করেছে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরীর ‘জয় বাংলা অক্সিজেন সেবা’ উদ্যোগ। ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও শুভাকাক্সক্ষীদের আর্থিক সহায়তায় ১২টি অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে গত বছর জুনে এ সেবা কার্যক্রম শুরু করেন তিনি। মানুষের জীবন বাঁচাতে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে ছুটেছেন তিনি ও তার টিমের অন্য সদস্যরা।
অসহায় মানুষের পাশে ছাত্রদল
করোনার মধ্যে অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়েছে ছাত্রদল। বিভিন্ন স্থানে তারা অসহায়দের মধ্যে খাবার ও সুরক্ষাসামগ্রী বিতরণ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অসহায়, কর্মহীন ও দুস্থদের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছে দলটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। টিএসসি, তিন নেতার মাজার, দোয়েল চত্বর এলাকায় তারা বেশ কয়েক দিন খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করে। খাদ্যসামগ্রী তালিকায় ছিল চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আলু, ছোলা ইত্যাদি। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছাত্রদল ত্রাণ বিতরণের ধারাবাহিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এছাড়া সংগঠনটির জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগেও করোনায় অসহায় মানুষদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
নানা কর্মসূচি ছাত্র ইউনিয়নের
করোনাকালে অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন। সংগঠনটি মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, খাদ্যসামগ্রী বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ঢাকাসহ সারা দেশে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিয়েছে ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা। দোকানপাট, মসজিদ, বাজার ও মোড়ে মোড়ে হাত ধোয়ার জন্য সাবান ও পানির ব্যবস্থাও করা হয় সংগঠনের পক্ষ থেকে। মার্চ-এপ্রিলে সংগঠনটি নিজস্বভাবে তৈরি করা ১ লাখ ৫০ হাজার বোতল হ্যান্ড স্যানিটাইজার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, হলি ফ্যামিলি হাসপাতালসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করেছে। যাদের পক্ষে স্যানিটাইজার ক্রয় করা সম্ভব নয়, তাদের বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষের মাঝেও হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ করেছে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা।
সাধ্য অনুযায়ী সহযোগিতায় বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন
করোনাকালে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। একসময় যারা নিজেদের অর্থায়নে মানুষের সেবা প্রদান করতেন, করোনাকালে তাদের আর্থিক সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছে অনেকেই। দেশের জনগণের অর্থায়নে লক্ষ লক্ষ দুস্থ মানুষের জন্য খাদ্যসামগ্রী দিচ্ছে বিদ্যানন্দ। করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ লাখ শ্রমজীবী পরিবারের সদস্যদের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়ার টার্গেট নিয়েছিল তারা। শুধু তাই নয়, চিকিৎসাসমগ্রী, চিকিৎসদের পিপিই প্রদানও করেছেন তারা। আর এ কাজে সহযোগিতা করতে অনেকেই নীরবে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, দিচ্ছেন। নিজেদের বাসন্তী নামক পোশাক তৈরির কারখানায় মাস্ক তৈরি, মিরপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে হাত ধোয়ার জন্য পানির ব্যবস্থা, বিনামূল্যে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, সাবান ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়েছে সংগঠনটি। সংগঠনের প্রতিনিধিরা জানান, সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে পথচারী, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের লোকদের জন্য।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে মানুষের হাত ধোয়ার জন্য রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের পাশের দেয়ালে রং করে পানির টেপ ও বেসিন বসিয়ে পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওয়েট টিস্যুতে হ্যান্ডস্যানিটাইজার যুক্ত করে মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। এসব টিস্যু দিয়ে লোকজন তাদের মোবাইল ফোন, হাত পরিষ্কার করে তা নিরাপদ স্থানে ফেলে দেবে। এতে সংক্রমণ ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে। এছাড়া মসজিদ, সড়ক, জনবহুল জায়গা জীবাণুমুক্ত করতে জীবাণুনাশক স্প্রে করা হচ্ছে।
মানুষের পাশে ‘এসো সবাই’
করোনাসংকট চলাকালে ও সংকট-পরবর্তী সময়ে অসহায়, দুস্থ মানুষকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে দেশ ও দেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে সামাজিক উদ্যোগ ‘এসো সবাই’। আগ্রহীদের কাছ থেকে অনুদান সংগ্রহ করে তা সমাজের অসহায় ও ভুক্তভোগীদের কাছে পৌঁছে দেয় উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
এই স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক উদ্যোগটি নিয়েছেন করপোরেট ব্যক্তিত্ব ও গীতিকবি আসিফ ইকবাল, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) পরিচালক দিদারুল আলম সানি, ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সি অ্যানালাইজেন বাংলাদেশ লিমিটেডের চেয়ারম্যান রিসালাত সিদ্দীক, কনসিটো পিআরের নির্বাহী পরিচালক মাহজাবীন ফেরদৌস, গায়ক মাহাদী ফায়সাল ও সংগীত পরিচালক অদিত রহমান।
আগ্রহী দাতাদের কাছ থেকে নগদ অর্থ এবং প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী, যেমনখাদ্যদ্রব্য, সুরক্ষা সরঞ্জাম, স্যানিটাইজার ইত্যাদি সংগ্রহ করে তা অসহায় ও দুস্থদের মধ্যে বিতরণ করাই তাদের কাজ। দাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই উদ্যোগের সঙ্গে ইতিমধ্যে যোগ দিয়েছে ইভ্যালি, ফর্টিজ, আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেড, ম্যারিকো বাংলাদেশ লিমিটেড, লাইফবয়, ইপিলিয়ন এবং সামিট গ্রুপ। উদ্যোগটি বাস্তবায়নের সঙ্গে আছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের এক টাকায় আহার প্রকল্প, অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ক্যানসার এইড ট্রাস্ট (বিএএনসিএটি), মিশন সেভ বাংলাদেশ, আমাল ফাউন্ডেশন এবং নড়াইল এক্সপ্রেস।
যতদিন প্রয়োজন ততদিন কাজ করবে স্মাইল ফাউন্ডেশন
নিজেদের তহবিল থেকে ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির সহায়তায় মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ বিভিন্ন সামগ্রী বিতরণ করছেন স্মাইল ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবী কর্মীরা। তারা বলছেন, সমাজের অসহায় মানুষদের মধ্যে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ করা হচ্ছে। আমরা বাংলাদেশ জুড়ে অ্যান্টিভাইরাল পণ্যগুলোর ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়তা করতে চাই। যতদিন প্রয়োজন হবে, ততদিন পর্যন্ত এ কাজ অব্যাহত রাখব আমরা।
শহরে গ্রামে সেভ দ্য টুমরো
করোনাভাইরাস প্রতিরোধে দেশব্যাপী কাজ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘সেভ দ্য টুমরো’। সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক শরিফ ওবায়দুল্লাহ বলেন, এ সংকটকালে দেশব্যাপী আমাদের কার্যক্রম আছে। কেউ ঢাকায়, আবার কেউ গ্রামে কাজ করছেন। আমরা আলাদা আলাদা করে টিম ভাগ করে দিয়েছি। যাতে দেশের এই পরিস্থিতিতে নিজ গ্রামের মানুষের জন্য খাবার দেওয়া আর সচেতন করার মাধ্যমে কিছু করা যায়।
অসহায়ের পাশে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা
লকডাউনে ঢাকা শহরে যাদের বাড়িতে খাবার নেই, তাদের খাবার সরবরাহ করেছে তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) একটি দল। যারা বাড়ির বাইরে বের হতে পারছেন না, তাদের বাড়িতে প্যাকেট পৌঁছে দিয়েছেন এবং অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার মতো কাজগুলো করেছেন তারা। হিজড়া সাহায্যকারী দলেরই একজন ২৮ বছর বয়সী মুনমুন জানান, প্রোটেকটিভ পোশাক, মাস্ক, গ্লাভস পরার পরও করোনাভাইরাসের ভয় তার থেকেই যায়। তারপরও সে সেই ভয়কে জয় করতে চান। মুনমুনের ভাষায়, ‘মরতে আমাদের সকলেই হবে, তবে ভালো কোনো কাজ করে যদি মারা যাই মানুষ আমাদের মনে রাখবে।’
লেখকদ্বয় : সাংবাদিক
