করোনায় দারিদ্র্য ও বেকারত্ব

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২১, ১১:০৮ পিএম

করোনাভাইরাস মহামারীতে দেশের অর্থনীতি আসলে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তাতে সমাজে কতটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সেটা যথাযথভাবে নিরূপণে বিশদ গবেষণা পরিচালনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মহামারীর অভিঘাত থেকে অর্থনীতি বাঁচাতে বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সরকার যে সোয়া লাখ কোটিরও বেশি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ বরাদ্দ ও বিতরণ করেছে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোয় সেটা কতটুকু প্রভাব রাখতে সক্ষম হয়েছে সেটাও জানা জরুরি। কেননা, মহামারীর শুরুর দিকে লকডাউন পরিস্থিতির সময় থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক নানা গবেষণা ও জরিপে বারবার দেশে ব্যাপকহারে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধির নানা তথ্য-উপাত্ত সামনে আসছে। ইতিমধ্যেই দেশি-বিদেশি নানা জরিপে এসব তথ্য প্রকাশিত হলেও সরকার বিষয়টি কতটা আমলে নিচ্ছে সেটি স্পষ্ট নয়। কিন্তু এড়িয়ে গেলে কিংবা নীরব থাকলেই দারিদ্র্য ও বেকারত্বের সংকট দূর হবে না। এজন্য বিশদ পর্যালোচনা ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।      

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং‘সানেম’ শনিবার প্রকাশিত এক দেশব্যাপী জরিপের ফলে দাবি করেছে করোনাকালে বাংলাদেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০১৮ সালে ছিল ২১.৬ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে ছিল ২৪.৩ শতাংশ। এর মধ্যে চরম দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে ২৮.৫ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে ছিল জাতীয়ভাবে ১২.৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ছিল ৯.৪ শতাংশ। এছাড়া করোনার প্রভাবে ব্যাপক হারে বৈষম্যও বেড়েছে। ‘দারিদ্র্য ও জীবিকার ওপর কভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব : সানেমের দেশব্যাপী জরিপ’ শিরোনামের এক ওয়েবিনারে প্রতিষ্ঠানটি এই দারিদ্র্য বৃদ্ধির তথ্য তুলে ধরে। আয়োজকরা জানিয়েছেন, এই জরিপের উদ্দেশ্য ছিল কভিড পূর্ববর্তী সময়ের সঙ্গে কভিড-পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও কর্মসংস্থানের স্বরূপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া। ২০১৮ সালে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সঙ্গে সানেমের করা জরিপের মধ্যে থেকে ৫ হাজার ৫৭৭টি খানার ওপর এই জরিপটি ফোনকলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ২০২০ সালের ২ নভেম্বর থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী এই জরিপটি পরিচালিত হয়। লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, করোনাকালে শহরাঞ্চলের মতো গ্রামাঞ্চলেও চরম দারিদ্র্য অত্যধিক হারে বেড়েছে। জরিপের ফল বলছে, গ্রামাঞ্চলে চরম দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালে ছিল ১৪.৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ১১.২ শতাংশ এবং মহামারীর সময়ে ২০২০ সালে গ্রামাঞ্চলে চরম দারিদ্র্যের হার বেড়ে হয়েছে ৩৩.২ শতাংশ। অন্যদিকে, শহরাঞ্চলে চরম দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালে ছিল ৭.৬ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৬.১ শতাংশ কিন্তু ২০২০ সালে বেড়ে হয়েছে ১৯ শতাংশ।

অন্যদিকে, মহামারীকালে দেশে বেকারত্ব বৃদ্ধির নানা পরিসংখ্যানও সামনে আসছে। সানেমের দারিদ্র্য বৃদ্ধি সংক্রান্ত জরিপের ফল প্রকাশের দিনই তৈরি পোশাক খাতে করোনার অভিঘাত নিয়ে একটি গবেষণার ফল প্রকাশ হয়। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ম্যাপড ইন বাংলাদেশের (এমআইবি) যৌথভাবে পরিচালিত ‘কভিড মহামারীর কারণে পোশাক খাতের নাজুক পরিস্থিতি, ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা ও পুনরুদ্ধার : মাঠপর্যায়ের জরিপ থেকে যা পাওয়া গেল’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে গবেষণাটির ফল তুলে ধরেন আয়োজকরা। এই গবেষণায় দাবি করা হয়েছে করোনায় দেশের অন্তত ৩ লাখ ৫০ হাজার পোশাক শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। বেকার হওয়া পোশাক শ্রমিকদের এই সংখ্যা খাতটিতে মোট শ্রমিকের ১৪ শতাংশ। এছাড়া একই সময়ে ২৩২টি বা ৭ শতাংশ তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। লে-অফ ঘোষণা করেছে ২ দশমিক ২ শতাংশ কারখানা। এছাড়া সামগ্রিকভাবে পোশাক খাতের জন্য যে প্রণোদনা প্যাকেজ রয়েছে, তা থেকে ৭০ শতাংশ কারখানার চাহিদা পূরণ হলেও বিজিএমইএ’র সদস্য নয়, এমন প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য ছোট কারখানা মিলিয়ে বাকি ৩০ শতাংশ কারখানা প্রণোদনার বাইরে থেকে গেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের কারখানাগুলো বেশি বিপদে আছে। তাদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে। পাশাপাশি ছোট কারখানাগুলোর জন্য প্যাকেজ থেকে ঋণ নেওয়ার পদ্ধতি সহজ করতে হবে।

করোনা মহামারীতে দেশের অর্থনীতিতে এমন যেসব ক্ষতি হলো এটি কি স্বল্পমেয়াদি, নাকি এত বছরের অগ্রগতির ওপরে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ল, সেটি বিশদ ব্যাখ্যা দাবি করে। দেশের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি মহামারীতে কর্মসংস্থানে যে পরিবর্তনগুলো হয়েছে সেসব চিহ্নিত করে বেকারত্ব দূরীকরণের নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এসব জরিপের ফল একই সঙ্গে এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দেশে স্বাভাবিক সময়েও যেমন আয় বৈষম্য, সম্পদ বৈষম্য ও ভোগ বৈষম্য বজায় ছিল, মহামারীকালেও সেটা বজায় থেকেছে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অসম। ফলে সামগ্রিকভাবে আয়, সম্পদ ও ভোগ বৈষম্য দূর করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত