স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণে কুশলতা ও দূরদৃষ্টি

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১১:০৬ পিএম

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব উদযাপনের অনেক আগেই জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিল (ECOSOC) কর্র্তৃক বাংলাদেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে শর্তাধীন স্বীকৃতি পায়। এই উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের তকমা পেতে জাতিসংঘ এখন যে তিনটি মানদন্ড নির্ধারণ করেছে, ২০১৮ সালে সেগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় যেকোনো দুটি মান অর্জনের স্থলে বাংলাদেশ তিনটিই অর্জন করতে সক্ষম হয়। নিয়ম অনুসারে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের উন্নয়ন নীতি কমিটির (CDP) দ্বিতীয় ত্রিবার্ষিক সভার পর্যালোচনায় উপযুক্ততার সুপারিশ পেলে এবং পরবর্তী তিন বছর পরিবৃত্তি মেয়াদে সবকিছু ভালো থাকলে চূড়ান্তভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে উন্নয়ন নীতি কমিটির যে ত্রিবার্ষিক সভা হওয়ার কথা, সেখানে বাংলাদেশের বিষয়টি দ্বিতীয়বারের মতো পর্যালোচনা করা হবে। ওই সভায় উপস্থাপনের জন্য ঢাকায় এখন প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্র তৈরির কাজ চলছে। অথচ কিছু বিশেষ সুবিধা লাভের লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালে এই স্বল্পোন্নত দেশের দলে ঢোকার জন্য রীতিমতো সংগ্রাম করতে হয়েছে; তখন বাংলাদেশ সব মানদন্ডে পাস করলেও বিরাট জনসংখ্যার দেশ হওয়ায় ওই কমিটির অধিকাংশ সদস্য আমাদের অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করেন। পরে জনসংখ্যার মানদন্ড নির্ধারিত হয় সর্বোচ্চ ৭৫ মিলিয়ন।

স্বল্পোন্নত দেশগুলো সাধারণত তিন ধরনের সুবিধা ভোগ করে থাকে :

ক) আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে, বিশেষ করে শুল্ক, কোটা এবং পণ্যের উৎসবিধির ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়; খ) উন্নয়ন-অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতাসহ উন্নয়ন সহায়তা; এবং গ) জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাঁদা প্রদানে সিলিং সুবিধা, সভায় যোগদানে প্রণোদনাপ্রাপ্তি, বৃত্তিপ্রাপ্তি প্রভৃতি ও অন্যান্য ধরনের কিছু বিশেষ সহযোগিতা। স্বল্পোন্নত দেশপুঞ্জ থেকে উত্তরণ ঘটলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে, ঋণ-গ্রহণ-যোগ্যতা মান (credit worthiness) বেড়ে যাবে, দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে, অপবাদ-বদনাম ও পরনির্ভরতা ঝেড়ে ফেলে আত্মনির্ভরশীল এবং আত্মমর্যাদাশীল উন্নয়ন-প্রয়াসী জাতি হিসেবে আমাদের নতুন পরিচয় হবে। দেশের সাম্প্রতিককালের নজর-কাড়া অগ্রগতি এই প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পূর্ণ রূপে সংগতিপূর্ণ; চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, কৃষি খাতের অনন্য সাফল্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দারিদ্র্যবিমোচন খাতে সফলতা প্রকৃত অর্থেই ঈর্ষণীয়। এগুলো দেখে দেশি-বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠান আমাদের ভূয়সী প্রশংসা করছে; সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ প্রাক্কলন করে বলেছে, ২০৩৫ সাল নাগাদ বিশ্বের ২৫তম অর্থনীতির দেশ হবে বাংলাদেশ। কভিড-১৯-এর আগ্রাসনের মধ্যেও গত বছর অনেক শক্তিশালী দেশকে পেছনে ফেলে এখানে ৫.২৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে; অতিমারীর শুরুতেই লক্ষাধিক কোটি টাকার ১৯টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা ও বাস্তবায়ন করে দেশের স্থবির হয়ে যাওয়া অর্থনীতিকে যেভাবে উজ্জীবিত করা হয়েছে, তাতে সরকারেরও ভূয়োদর্শন ও দূরদৃষ্টির প্রতিফলন ঘটেছে। কভিডের অভূতপূর্ব আবির্ভাবে হোঁচট না খেলে আমাদের ভিশন-৪১ অর্থাৎ উন্নত রাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জনের পথ যে মসৃণ হয়ে যেত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু কভিডের এই দুঃসময়ে স্বল্পোন্নত দেশের গন্ডি থেকে বের হয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কী কী চ্যালেঞ্জ সামনে আসবে এবং সেসবের প্রকটতা কেমন হবে, সে বিষয়ে সিপিডি  (Centre for Policy Dialogue)-সহ দেশীয় গবেষকরা একাধিক মূল্যায়নপত্র তৈরি করেছেন। সেগুলো থেকে দেখা যায় যে, প্রথমোক্ত শ্রেণির সুবিধা ছাড়া অন্য সুবিধাদির আর্থিক ও সামাজিক মূল্যমান উল্লেখযোগ্য নয়; বর্তমান আর্থিক সক্ষমতার বিচারে আমরা ওইগুলো উপেক্ষা করতেই পারি। তবে আমাদের মতো পক্ষোদ্ভেদ (সদ্য উড়তে শেখা) অর্থনীতিতে প্রথমোক্ত ক্যাটাগরির সুবিধার প্রভাব ও গুরুত্ব অনেক বেশি; দেশের অর্থনীতির আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সে গুরুত্বের মাত্রা আরও বেড়ে যাবে।

স্বল্পোন্নত দেশপুঞ্জের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ বর্তমানে যে শুল্ক সুবিধা ও উৎসবিধির শিথিলতা, শুল্কমুক্ত-কোটামুক্ত সুবিধা ভোগ করে আসছে, চূড়ান্তভাবে সেখান থেকে উত্তরণ ঘটলে সেগুলো অন্তর্হিত হবে এবং দেশকে তখন উন্নত ও উন্নয়নশীল সব দেশের সঙ্গে সমানতালে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে হবে। শুধু তা-ই না, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সদস্য হিসেবে দেশের অভ্যন্তরেও রপ্তানি বৃদ্ধির স্বার্থে রপ্তানিকারকদের কোনো প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়া যাবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নে একক দেশ হিসেবে এ মুহূর্তে বাংলাদেশের পোশাক-পণ্য রপ্তানির পরিমাণ তাদের মোট আমদানির শতকরা ৯ ভাগ; তখন, অর্থাৎ চূড়ান্ত উত্তরণের তিন বছর পর এটাকে ৬.৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। তখন উৎসবিধির আঁটসাঁট প্রয়োগ শুরু হয়ে গেলে আর এখনকার মতো ২৫-৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করে রপ্তানি করা সম্ভব হবে না। স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধা উঠে গেলে মোটের ওপর আমাদের রপ্তানির পরিমাণ ৭ থেকে ১৪ শতাংশ কমে যেতে পারে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাক্কলন করা হচ্ছে। সিপিডির হিসাব অনুযায়ী আমাদের রপ্তানি হারানোর পরিমাণ হতে পারে ৮ শতাংশ; অর্থের হিসাবে যার পরিমাণ ২.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

আমাদের এখনো কাঠামোগত অনেক অপর্যাপ্ততা এবং সমস্যা রয়েছে। এখানে রপ্তানি খাত বৈচিত্র্যপূর্ণ নয়; সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা। দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে তৈরি-পোশাক থেকে। এর মধ্যে মাত্র পাঁচটি পণ্যেই আসে ৭৩ শতাংশ। আবার মাত্র পাঁচটি দেশে ৬১ শতাংশ পণ্য রপ্তানি হয়। শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা তলানির কোটায়; প্রতি-শ্রম ঘণ্টায় ৩.৪ মার্কিন ডলার, যেটা প্রতিযোগী অন্যান্য দেশের মধ্যে শুধু কম্বোডিয়ার ওপরে। পরিশীলিত মিশ্রপণ্যের পরিমাণ আমাদের রপ্তানি পণ্যের ঝুড়িতে নেই বললেই চলে। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পরিবেশ প্রতিযোগীদের তুলনায় অনেক নিচে; সহজে ব্যবসা করার সূচক এখনো ১৬৮।

আমাদের উত্তরণ এমন একসময়ে ঘটতে চলেছে, যখন বিশ্ব অভূতপূর্ব এক সর্বগ্রাসী অতিমারীর কবলে জর্জরিত; কবে এর শেষ তাও আমরা জানি না। এই অতিমারীর প্রভাবে বিগত বছর রপ্তানি আয় ১৬.৯৩ শতাংশ এবং আমদানি ৮.৫৬ শতাংশ কমে যায়। বিগত বছরের জুলাই-মার্চ সময়ে এফডিআই (FDI) কমে দাঁড়ায় ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩.৯৭ মার্কিন ডলার। উন্নয়নের ইঞ্জিন হিসেবেখ্যাত বেসরকারি বিনিয়োগও স্থবির হয়ে আছে। তৈরি-পোশাক খাতের অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, যেগুলো চালু করা হয়েছে, সেগুলো ৫৫ শতাংশের বেশি সামর্থ্য কাজে লাগাতে পারছে না। দেশে বেকার সমস্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, বিদেশে কর্মরত অনেকে কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। দারিদ্র্যের হার বেড়ে সরকারি হিসাবেই ২৯.৪ শতাংশে উঠে গেছে। কভিডের প্রভাবে বিশ্বে মন্দাবস্থার অশনিসংকেত দেখা দিচ্ছে। তৈরি-পোশাক আমদানিকারকরা পণ্যের অর্ডার ও মূল্য কমিয়ে দিচ্ছেন। বৈশ্বিক বাণিজ্য ও রাজনীতির ক্ষেত্রে সংরক্ষণবাদ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে বিজিএমইএ  (Bangladesh Garments Manufacturers and Exporters Association)-এর প্রেসিডেন্ট রুবানা হক দেশকে স্বল্পোন্নত দেশের ক্লাব থেকে স্নাতক হিসেবে নির্বিঘ্নে বের করে আনতে ১০ বছরের পরিবৃত্তি কাল চেয়েছেন।

আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ ও টেকসই করার জন্য অনেক কাজ দক্ষতার সঙ্গে করার প্রয়োজন হবে। রপ্তানিপণ্য বৈচিত্র্যপূর্ণ করতে হবে, পরিশীলিত মিশ্রপণ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে, অর্থনৈতিক কূটনীতিসমৃদ্ধ করে রপ্তানির গন্তব্য বহুমুখী করতে হবে, বিভিন্ন দেশ, জোট ও আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোয় বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে আমাদের দর-কষাকষির দক্ষতা বাড়াতে হবে। চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের উপযোগী করে যুব সম্প্রদায়কে গড়ে তুলতে হবে; মধ্য মেয়াদে শিক্ষাব্যবস্থাকেও চাহিদা-উপযোগী ও দক্ষতানির্ভর করতে হবে। ‘জিএসপি প্লাস’ সুবিধা পেতে মানবাধিকার, শ্রমিক অধিকার ও পরিবেশ সংরক্ষণ-সংক্রান্ত কনভেনশনসহ যে ২৭টি কনভেনশন স্বাক্ষর করতে হবে, উৎপাদন ও উৎপাদন-খরচে তার বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এগুলো কাটিয়ে উঠতে সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু এই অতিমারীর মধ্যে আমরা যদি জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের উন্নয়ন নীতি কমিটি সিডিপির সভায় দ্বিতীয়বারের মতো স্নাতক হিসেবে উত্তীর্ণ হই, তাহলে মসৃণ পরিবৃত্তির জন্য আমাদের হাতে সময় থাকবে মাত্র তিন থেকে পাঁচ বছর। এ সময়টাকে সমাপ্য কর্মযজ্ঞের বিবেচনায় অনেকেই পর্যাপ্ত মনে করেন না। এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন সিডিপির সভায় বাংলাদেশের সঠিক ভূমিকা পালন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিডিপির ত্রিবার্ষিক সভায় তাদের উপদল কর্র্তৃক প্রণীত এ দেশের দুর্বলতা প্রোফাইল ও প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন যেমন পর্যালোচনা করা হবে, তেমনি সরকারের অভিমত উপস্থাপনের জন্য আমাদের প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। সার্বিক পর্যালোচনায় টেকসই উত্তরণের পথে কভিড-সৃষ্ট নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত প্রতিবন্ধকতাগুলো দৃশ্যমান হলে সিডিপি-পরবর্তী ত্রিবার্ষিক সভা পর্যন্ত সুপারিশ স্থগিত রাখতে পারে। তাতে অতিরিক্ত তিন বছর সময় পাওয়া যাবে। সেটা যদি নাও হয়, স্নাতক হিসেবে মসৃণ পরিবৃত্তির জন্য যে তিন বছরমেয়াদি কৌশলপত্র তৈরি করা হবে, তার মেয়াদ সব সময় যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করা হয় না; সরকারের অভিমত এবং অর্থনীতির প্রয়োজন বিবেচনা করে এই সময় সাধারণত বৃদ্ধি করা হয়। সেখানে অর্থনীতির দৃঢ় ভিত্তি রচনার প্রয়োজনীয় সময় হাতে পাওয়ার কৌশল নেওয়া যেতে পারে।

স্বাধীন সিঙ্গাপুরের স্থপতি লি কুয়ান ইউ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে অর্থনীতিকে টেকসই করার জন্য স্বেচ্ছায় বহু দিন ধরে তার দেশের তৃতীয় বিশ্বের মর্যাদা অক্ষুণœ রাখেন। শেষে বিগত শতাব্দীর নব্বই দশকের শেষের দিকে বিশ্বব্যাংকের পীড়াপীড়িতে উচ্চ আয়ের উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে তার দেশ নতুনভাবে শ্রেণিভুক্ত হয়। কভিডের ধ্বংসযজ্ঞ কেটে উঠতে এবং অর্থনীতির বুনিয়াদ শক্ত করতে দেশের স্নাতক হিসেবে উত্তরণে কয়েক বছর বেশি লাগলে তাতে অসম্মানের কিছু নেই; অসম্মান তখনই হতে পারে যদি আমরা যেনতেনভাবে দ্রুত স্নাতক হয়ে পাছে মধ্য আয়ের ফাঁদে পড়ে যাই। আমরা আশা করব দেশের এই সন্ধিক্ষণে টেকসই সমৃদ্ধি অর্জনে আমাদের নেতারা দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়ে উপযুক্ত নীতি-উপায়ন্তর গ্রহণ করবেন।

লেখক  খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত