সাম্প্রতিক সময়ে করোনা থেকে মুক্তির সুবাতাস পাওয়া যাচ্ছে। শীতের শুরুতে যেভাবে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছিল ইউরোপের কোনো কোনো দেশে তা সত্যি হলেও অন্তত আমাদের দেশের অভিজ্ঞতা ততটা খারাপ হয়নি, বরং এখন সংক্রমণের হার ধীরে ধীরে কমছে। দৈনিক সংক্রমণ যেভাবে গত বছরের জুন ও জুলাইয়ে সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছেছিল ধীরে ধীরে তা কমে হাজারেরও নিচে চলে আসছে। সবচেয়ে আশার কথা হচ্ছে সংক্রমণের হার পাঁচ শতাংশের আশপাশে বা কোনো কোনো দিন তার থেকেও কম হচ্ছে।
করোনার টিকা নিয়ে সারা পৃথিবীতেই হইচই শুরু হয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে করোনার ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হয়েছে। ভ্যাকসিনের সঙ্গে সঙ্গে সারা পৃথিবীতেই একটা আশাবাদ জাগতে শুরু হয়েছে, মানুষ আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে যে সেই দিন হয়তো খুব বেশি দূরে না যেদিন করোনামুক্ত হবে এই পৃথিবী।
জাতিসংঘ বলছে করোনা শুধু কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বিশ্বব্যাংক বলছে করোনায় স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে পৃথিবীতে ২০২০ সালে সাড়ে আট কোটি থেকে সাড়ে এগারো কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। আইএলও বলছে, করোনার কারণে সারা পৃথিবীতে ২৪৫ মিলিয়ন মানুষ সার্বক্ষণিক কর্মসংস্থান হারাতে পারে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম প্রকাশিত ‘দ্য গ্লোবাল কম্পিটেটিভ রিপোর্ট২০২০’ আনুযায়ী করোনার অর্থনৈতিক ক্ষতি ২০০৮-০৯ সালের অর্থনৈতিক মন্দা থেকেও ব্যাপক এবং এখন পর্যন্ত বিশ্ব এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন হতে হবে উৎপাদন, মানুষ এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশের সমন্বয়ে। সামগ্রিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। কারোনার কারণে জনগণের মধ্যে সৃষ্ট প্রান্তিকতাকে বিবেচনায় নিতে হবে এবং তাদের জন্য সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা তৈরি করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তিকে দেশের প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে।
করোনা থেকে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় মানবসম্পদ হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। করোনাপরবর্তী সময়ে মানবসম্পদকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা যায় তা এখন আলোচনার বিষয় হওয় উচিত। যদিও এর জন্য মানবসম্পদকে যুগোপযোগী, নতুন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার মতো দক্ষতাসম্পন্ন করতে হবে এবং একইসঙ্গে দক্ষতা অর্জনের নতুন নতুন ক্ষেত্রের সঙ্গে পরিচিতি লাভ করাতে হবে। করোনায় ধনী ও দরিদ্র নির্বিশেষে বিশ্বের সব দেশের স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা সবার সামনে উন্মোচিত হয়েছে। শুধু বর্তমানের করোনার চ্যালেঞ্জ না ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনায় নিয়েই স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোর অগ্রাধিকার নির্ণয় করা প্রয়োজন।
করোনায় বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থার একটি ইতিবাচকতা সামনে এসেছে। সেটা হচ্ছে সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক কর্মকা-ের সক্রিয়তা ও কৃষিকেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা। করোনা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বড় বড় করপোরেটের ব্যবসা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে; বিশেষ করে আইসিটি, ই-কমার্স ও হেলথ সেক্টর ইত্যাদি। কিন্তু মনে রাখতে হবে কেবল কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানই বাংলাদেশের এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত রাখতে পারবে না। বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে আরও বেশি বেগবান করা এবং এজন্য নতুন নতুন সুযোগ তৈরি করা। আর বাংলাদেশ যেহেতু একটি কৃষিভিক্তিক দেশ তাই কৃষিকে কেন্দ্র করেই প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করার বিষয় বিবেচনা করতে হবে।
করোনার ক্ষতি থেকে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সমগ্র জাতির জন্য এক ধরনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে যাতে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে কাঠামোগত বেশ কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসা যায়। এই পরিবর্তন প্রক্রিয়া হওয়া উচিত ন্যায্য, সমতাপূর্ণ এবং দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। পরিকল্পনার বাস্তবায়নে অবশ্যই সেবাসমূহের বিকেন্দ্রীকরণ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই তা অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ জাতীয় জীবনে সাম্য ও সমতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করবে। সবসময় আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে যে, স্বল্পমেয়াদি প্রবৃদ্ধির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধি অর্জন অনেক বেশি মঙ্গলময়, যা জনগণের আর্থ-সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত শুধুই অর্থনীতি নয়।
করোনার সার্বিক ক্ষতি মোকাবিলা করে দেশ ও জাতিকে উন্নয়নের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকার গত বছরের শেষের দিকে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এই পরিকল্পনায় বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে দরিদ্রবান্ধব করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে আগামী পাঁচ বছরে সরকার এমন প্রচেষ্টা গ্রহণ করবে যেখানে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে, রপ্তানিমুখী উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি,কৃষির বহুমুখীকরণ, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সক্রিয়তা বৃদ্ধি, আধুনিক সেবা খাতের বিকাশ, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। সরকার বলছে, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২০২৫ সালের মধ্যে ১১.৩৩ মিলিয়ন নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। যদিও এই সময়ে বেকার ও ছদ্ম বেকারের পাশাপাশি সম্পূর্ণ নতুন ৭.৮১ মিলিয়ন কর্মক্ষম মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে।
সংবাদপত্রের সূত্র মতে, অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মোট ৬৪ হাজার ৯৫৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন অর্থের প্রয়োজন হবে বলে সরকার প্রাক্কলন করেছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৩০১ দশমিক ২ বিলিয়ন সরকারি খাত থেকে এবং ৫২ হাজার ৬৫৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন বেসরকারি বা ব্যক্তি খাত থেকে সংগ্রহ করা হবে, যা মোট সম্পদের ৮১ দশমিক ১ শতাংশ! এখন অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়ন নির্ভর করছে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকার কতটুকু কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করছে এবং দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পনার সঙ্গে কতটুকু সম্পৃক্ত করতে পারছে তার ওপর। এটা সত্যি যে, বর্তমান ব্যবস্থাপনায় অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারকে ভেতর ও বাহিরের অনেক প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হবে। বর্তমান করোনা সংকট কাটিয়ে জাতিকে সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদানে এজন্য সরকারকে যেমন অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাগত পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে, সরকারি প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে এবং একইসঙ্গে কার্যকর পরীবিক্ষণ ব্যবস্থা ও জবাবদিহির যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। সর্বোপরি সরকারকে বিকেন্দ্রীভূত দারিদ্র্যবান্ধব কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে, যাতে দেশের সব জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারে।
করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ইতিমধ্যে সরকার দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদানের ঘোষণা করেছে। কিন্তু প্রণোদনা প্যাকেজের বড় সমস্যা হচ্ছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা বড় বড় শিল্পপতিদের কাছে যায়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা জনগণের কাছে তা পৌঁছায় না। চুইয়ে পড়া নীতি এক্ষেত্রে কাজ করছে না, যেটুকু চুইয়ে পড়ে তা যৎসামান্যই। অর্থনীতি সচলের জন্য বৃহৎ শিল্পকেন্দ্রিক চিন্তার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ কীভাবে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে তা বিবেচনায় নিতে হবে এবং এজন্য সুনির্দিষ্ট সরকারি নীতিমালা ও উদ্যোগ আবশ্যক।
লেখক : উন্নয়নকর্মী
