জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যথাযথ প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণের অভাবে বাংলাদেশে প্রতি বছর ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ফল ও সবজি নষ্ট হয়। এছাড়া উৎপাদনের ভরা মৌসুমে বাজারে শাকসবজি ও ফলমূলের সরবরাহ খুব বেড়ে যায়। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। মে-জুন মাসে দেশের হাটবাজারগুলোতে এত বিপুল পরিমাণ টমেটোর আমদানি হয় যে, কৃষক টমেটো বিক্রি করে জমি থেকে টমেটো তোলা ও হাটে নিয়ে আসার খরচ পর্যন্ত তুলতে পারে না। ওই সময় প্রতি কেজি টমেটো উত্তরাঞ্চলের হাটবাজারে ২ থেকে ৩ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। অনেক সময় কৃষক টমেটো বিক্রি করতে না পেরে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে জৈব সার তৈরি করে। মুলা ও বাঁধাকপির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা দেখা যায়। শীতের শেষে ফুলকপি ও বাঁধাকপি কখনো কখনো গো-খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে। শুধু ফুলকপি আর বাঁধাকপি কেন আলুর দাম কমে গেলে আলু সেদ্ধ করে গরু-মহিষকে খাওয়াতেও আমি নিজ চোখে দেখেছি দিনাজপুরের অনেক উপজেলায়।
কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পনগরী করতে যাচ্ছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া প্রতিশ্রুতি মোতাবেক উত্তরাঞ্চলের ঠাকুরগাঁও সদরে ৫০ একর জায়গার ওপর ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এ শিল্পনগরী স্থাপন করবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। আগামী দুই বছরের মধ্যে শিল্পনগরী স্থাপনের কাজটি সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। দেশের খাদ্য চাহিদার ৫০ শতাংশ এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের কাঁচামালের প্রায় ৭০ ভাগের জোগান আসে এ অঞ্চল থেকে। উত্তরাঞ্চলে কয়েকটি চিনিকল ছাড়া আর কোনো ভারী কৃষিভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান নেই। সম্প্রতি সরকার ক্রমাগত লোকসানের অজুহাতে উত্তরাঞ্চলের ৬টি চিনিকলও বন্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ফলে আখচাষি ও চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে আখ ছাড়াও প্রচুর পরিমাণে আলু, টমেটো, পেঁয়াজ, রসুন, আম, কলা, লিচু, কাঁঠাল, শাকসবজি, ফলমূল, ধান, গম ও ভুট্টা উৎপন্ন হলেও প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের অভাবে কৃষক ন্যায্যমূল্য পায় না।
কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের মাধ্যমে পচনশীল কৃষিপণ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়। এতে গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। প্রক্রিয়াজাতকৃত কৃষিপণ্য বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়। দেশের উত্তরাঞ্চলে প্রচুর আলু উৎপন্ন হয়। ঠাকুরগাঁওয়ে প্রক্রিয়াকরণ শিল্পনগরী হলে সেখানে আলু দিয়ে চিপস্সহ নানা ধরনের খাবার তৈরির কারখানা করা যাবে। একইভাবে টমেটো প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে সস্সহ নানা ধরনের খাবার তৈরির কারখানা গড়ে উঠবে। আম, লিচু প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে জ্যুস, ম্যাঙ্গোবার তৈরি করার সম্ভাবনা রয়েছে প্রচুর। এছাড়া সবজি ফুলকপি, শিমসহ অন্যান্য পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থাও থাকবে। এসব কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে স্থানীয় কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করবে বিসিক। উত্তরাঞ্চলে মোট পাঁচটি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পনগরী স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বর্তমান সরকারের। এর মধ্যে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বেজা) করবে তিনটি অঞ্চল। বাকি দুটি করবে বিসিক। নীলফামারী, পঞ্চগড় ও কুড়িগ্রামে তিনটি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল করার ব্যাপারে দুই বছর আগে সমীক্ষার কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া বগুড়ায় ৩০০ একর জায়গার ওপর খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পনগরী করতে চায় বিসিক। শুধু উত্তরাঞ্চলই বা কেন তিন পার্বত্য জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প নগরী গড়ে তোলার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি প্রভৃতি জেলায় প্রচুর পরিমাণে আম, কলা, কাঁঠাল, পেয়ারা, লেবু, তরমুজ উৎপাদিত হয়। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে পার্বত্য এলাকায় উৎপাদিত কৃষিপণ্যের একটি বিরাট অংশ নষ্ট হয়ে যায় অথবা পানির দামে কৃষক বিক্রি করতে বাধ্য হন। তাই পার্বত্য এলাকায় কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পনগরী স্থাপন করা উচিত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, রাজশাহী, দিনাজপুর ও পাবনা জেলায় প্রচুর আম, লিচু ও টমেটো উৎপাদিত হয়। টাঙ্গাইলের মধুপুর ও নরসিংদীতে প্রচুর সুস্বাদু আনারস উৎপাদিত হয়। পেঁপে, কাঁঠালও উৎপাদিত হয় অনেক। বরিশালে প্রচুর পেয়ারা উৎপাদিত হয়। এসব এলাকায়ও রয়েছে নির্দিষ্ট ফসলভিত্তিক কৃষিপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠার দারুণ সম্ভাবনা।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ছে সারা দেশে। বর্তমানে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য যেমন ফলের জ্যুস, ড্রিংক, তরল দুধের তৈরি বিভিন্ন পণ্য এখন মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানিতে সরকার ২০ শতাংশ ভর্তুকি প্রদান করে থাকে। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে কৃষকরাই সরাসরি উপকৃত হন। এটি কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি বিকাশে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। তৈরি পোশাক খাতের পরেই কৃষি প্রক্রিয়াকরণ পণ্য রপ্তানির সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এটি হতে পারে দেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি খাত। আমাদের দেশে যেসব ঐতিহ্যবাহী
কৃষিপণ্য আছে, সেগুলো ব্যবহার করেই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার কোটি টাকার কৃষিপণ্য বিশ্বের ১৪২টি দেশে রপ্তানি করে। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে এমন পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠান আছে বাংলাদেশে। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে থাইল্যান্ড কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বেশি অগ্রগামী। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প দেশটির তৃতীয় বৃহৎ শিল্প খাত। দেশটির মোট জিডিপির শতকরা ২৩ শতাংশ আসে এ খাত থেকে। থাইল্যান্ডের প্রধান প্রধান কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণকৃত পণ্যগুলো হলোচাল, টিনজাত টুনা মাছ, চিনি, মাংস, কাসাভাজাত পণ্য ও টিনজাত আনারস ইত্যাদি। দেশটি প্রতি বছর কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি করে ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করে। বাংলাদেশে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের মাত্র শতকরা ১ ভাগ প্রক্রিয়াজাতকরণ হয়। অন্যদিকে ভারতে এর পরিমাণ প্রায় ২ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৫ শতাংশ, চীনে ৩৮, ফিলিপাইনে ৩১, আমেরিকায় ৭০, থাইল্যান্ডে ৮১ ও মালয়েশিয়ায় ৮৪ শতাংশ। জিডিপিতে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের অবদান শতকরা ২ ভাগ, যা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় খুবই কম। যেমন থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কায় এই খাতের অবদান ৭.৪ শতাংশ এবং ফিলিপাইনে ১০.৪ শতাংশ।
প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন হয়। মূল্য সংযোজনের ফলে একদিকে যেমন অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়, অপরদিকে কৃষকও তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাজারে এক কেজি শুকনা হলুদের দাম ১২০ টাকা। সে হিসেবে ২০০ গ্রামের দাম ২৪ টাকা। ওই শুকনা হলুদ যখন প্রক্রিয়াকরণ করে কোনো ব্র্যান্ড নামে প্যাকেটজাত করা হয় তখন তার দাম দাঁড়ায় ৯০ টাকা, অর্থাৎ হলুদে মূল্য সংযোজন হয় পণ্যটির দামের ৩.৭৫ গুণ। এ রকম গুঁড়ামরিচ ও গুঁড়া ধনের ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন হয় যথাক্রমে ২.০ ও ৩.০ গুণ। এ মূল্য সংযোজনের কারণে স্কয়ার গ্রুপ চুক্তিবদ্ধ কৃষকের কাছ থেকে বাজার দরের চেয়ে অনেক বেশি দামে হলুদ, মরিচ ও ধনে ক্রয় করে। সারা বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের চাহিদা। মানুষের কর্মব্যস্ততা ও সময় সাশ্রয়ী মনোভাব এসব পণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে আরও বেগবান করছে। বিশ্বের ১০টি প্রধান কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় এশিয়ার যে চারটি দেশের নাম রয়েছে সেগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে চীন, যার রপ্তানি প্রায় ৭৩ বিলিয়ন ডলার। পরের অবস্থানে আছে যথাক্রমে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভারত। তাদের রপ্তানি আয় যথাক্রমে ৩৯, ৩৬ ও ১৫ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, বর্তমানে দেশে উৎপাদিত ৬৮২ লাখ টন প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মধ্যে রপ্তানি হচ্ছে মাত্র ১৭০ লাখ টন। মোট উৎপাদনের মাত্র ৪ ভাগের একভাগ। বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের মতে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পকারখানাগুলো ২০১০-১১ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৬০ মিলিয়ন ডলারের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানি করে, যা ২০১৪-১৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২২৪ মিলিয়ন ডলারে।
বাংলাদেশে উৎপাদিত টমেটোর মাত্র ৫ শতাংশ প্রক্রিয়াজাতকরণ করা হয় এবং এর পুরোটাই সস্। কারণ বিশ্ববাজারে টমেটো সস্-এর প্রচুর চাহিদা আছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২৩ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়। উৎপাদিত আমের মাত্র ৬ শতাংশ প্রক্রিয়াজাতকরণের আওতাভুক্ত, যার বেশির ভাগই ম্যাঙ্গোজ্যুস, ম্যাঙ্গোবার ও আচার তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে বর্তমান ডালের চাহিদা ২৫ লাখ টন। উৎপাদন ৯ লাখ টন। বছরে আমদানি করা হয় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন। তারপরও ডালের কিছু পণ্য যেমন ডালভাজা ও চানাচুর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রায় ১৫ মিলিয়ন ইউএস ডলার রপ্তানি হয়েছে। এসব পণ্যে আমাদের বাজার হলো সৌদি আরব ও মালয়েশিয়া। সরিষা থেকে কাসুন্দি বানিয়ে খুব অল্প পরিমাণে রপ্তানি হচ্ছে ইউএস, কাতার ও ওমানে। চীন, ভারত ও থাইল্যান্ডের মতো বাংলাদেশেও কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের সম্ভাবনা প্রচুর। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শুধু উত্তরাঞ্চলে নয়, পার্বত্য অঞ্চলসহ সারা দেশে ফসলভিত্তিক বিশেষ করে দেশের ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলে গড়ে তুলতে হবে অঞ্চল ও উৎপাদনভিত্তিক খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ শিল্প, যা ২০৪১ সালে একটি উন্নত দেশের অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করবে।
লেখক সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্ লি.
