নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে এক জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিমের সঙ্গে ‘অসৌজন্যমূলক’ আচরণের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এস এম তানভীর আরাফাত। গতকাল সোমবার হাইকোর্টের তলবে হাজির হয়ে তিনি আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতের কাছে এই ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এ সময় বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি খিজির হায়াতের হাইকোর্ট বেঞ্চ এসপিকে উদ্দেশ্য করে বলেছে, ‘পুলিশ যাতে ভীতিকর না হয়ে বন্ধু হয়। মানুষ যাতে মনে না করে যে এটি পুলিশি রাষ্ট্র হয়ে গেছে।’
পুলিশ সুপারকে শুধু কথায় পটু না হয়ে কাজে পটু হওয়ারও পরামর্শ দিয়েছে হাইকোর্ট। তাকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়ে এ বিষয়ে আদেশের জন্য আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করা হয়েছে।
গত ১৬ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা পৌরসভা নির্বাচন চলার সময় এসপি তানভীর দায়িত্বরত জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. মহসিন হাসানের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এসপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গত ১৭ জানুয়ারি বিচারক মহসিন হাসান নির্বাচন কমিশন, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল, আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক বরাবর অভিযোগ করেন। বিষয়টি নজরে এলে গত ২০ জানুয়ারি হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এক আদেশে এসপি তানভীর আরাফাতকে হাজির হয়ে ঘটনার বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশসহ এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে কেন আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হবে না মর্মে রুল জারি করে। আদেশের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলে, ‘দায়িত্বরত একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে পুলিশ সুপার যে আচরণ করেছেন, তা বিচার প্রশাসনে হস্তক্ষেপই শুধু নয়, আদালত অবমাননা এবং পুরো বিচার বিভাগের প্রতি প্রচণ্ড আঘাতের শামিল।’
এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল হাইকোর্টে হাজির হন এসপি তানভীর। তার পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. তাহিরুল ইসলাম। অপরপক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী অনিক আর হক, ইশরাত হাসান ও এ এম জামিউল হক ফয়সাল। লিখিত ব্যাখ্যায় এসপি তানভীর আরাফাত সেদিনের ঘটনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেন, তিনি (এসপি) বিচারককে চিনতে পারেননি। অনিচ্ছাকৃত ভুল হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে দায়িত্ব পালনে আরও সতর্ক হবেন। তিনি আরও বলেন, ‘বিচার বিভাগের প্রতি কোনো অবস্থাতেই বিন্দুমাত্র অসম্মান দেখানোর কথা দূরে থাক, বরং বিচার বিভাগের দেওয়া কাজে নিয়োজিত হতে পারলে নিজেকে সম্মানিত বোধ করি। এ ঘটনায় আমি মনের গভীর থেকে অনুতপ্ত।’
শুনানিতে হাইকোর্ট বলে, ‘কুষ্টিয়ায় যে পরিবেশ বিরাজ করছে, গণমাধ্যমে যেভাবে এসেছে তা যদি বাস্তব চিত্র হয়, তাহলে এটি হবে ভয়ংকর। কে কোন দল, মত, আদর্শের উত্তরাধিকার, এটা আপনার বিবেচ্য বিষয় নয়। কথায় পটু হলে চলবে না, কাজে পটু হতে হবে। জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আপনার নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আপনাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে সবকিছুর সমন্বয় সাধন করে কুষ্টিয়ায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করবেন, যাতে পুলিশ ভীতিকর না হয়ে বন্ধু হয়।’
আদালত আরও বলে, ‘আপনারা জনগণের বন্ধু। তাই জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। আপনাদের মূলমন্ত্র দুষ্টের দমন শিষ্টের লালন। সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এটি পুলিশি রাষ্ট্র হয়ে গেছে, মানুষ সেই ধারণা যেন করতে না পারে। দেশকে পুলিশি রাষ্ট্র বানাবেন না। জাতি উৎকণ্ঠিত। এ অবস্থা নিরসনের দায়িত্ব আপনাদেরই।’ বিচার বিভাগের মর্যাদা রক্ষার বিষয়টিও এসপিকে স্মরণ করিয়ে দেয় হাইকোর্ট।
শুনানি শেষে আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি আদেশের আগ পর্যন্ত নির্বাচনে ভেড়ামারা পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করা প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মো. শাহজাহান আলী এবং তার পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা দিতে নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।
