নাতিবিলম্ব বিচারের চাবিকাঠি : উদ্ধার পর্ব-২

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২১, ০৯:৩৭ পিএম

‘চিচিং বন্ধ’ মন্ত্রে আটকানো ‘চল্লিশ চোর’-এর গোপন-গুহার পাষাণকপাট খোলে কি শত ঠেলাঠেলিতে কিংবা ‘আলু ফাঁক’, ‘পটোল ফাঁক’, ‘বেগুন ফাঁক’ ডাকে! খোলে শুধু উল্টো একটা ‘চিচিং ফাঁক’ হাঁকেই। ন্যায়-বিচার নিয়ে বেরিয়ে আসার পথ আটকানো পাষাণকপাট সরাতে সংশোধনীর ঠেলাঠেলি আর সংস্কারের হাঁকাহাঁকি তো কম হয়নি এ দেশে। সরেনি একচুলও, সেই ‘চিচিং ফাঁক’ হাঁকটা না দেওয়ায় যেই প্যাঁচে তালা আটকায় ঠিক তার উল্টো প্যাঁচেই খোলে।

মামলা যত কম আসে, বিচার শেষের আগে আপিল-রিভিশন-রিট যত কম হয়, ততই কম জট বাঁধে। সেগুলো আদৌ চলে কি না তার বাছ-বিচার শুরুতেই করে নেওয়ার, অচলগুলো বাদ দেওয়ার বিধান আছে কার্যবিধিগুলোয়। সেগুলো বোধবুদ্ধি দিয়ে বিচারক-আইনজীবী মেনে চললে নর্দমায় আবর্জনা ফেলার মনানন্দে আদালতে ফেলা হাবিজাবি মামলা-আপিল রিভিশন-রিটে বিচারস্রোত আবদ্ধ হতো না।

মামলায় ঢুকিয়ে মক্কেলকে আদালত, আর আদালতকে মক্কেল দেখানো শেষে আপস-নিষ্পত্তির বিকল্প পথের প্যাঁচে ঘোরানোর বদলে দরকার এমন ব্যবস্থা;

“বিরোধ নিয়ে মক্কেল এলে তাকে শুনে, কাগজপত্র দেখে আইনজীবী ‘মেরিট’ দেখলে দাবি মেনে নিতে নোটিস দেবেন অপর পক্ষকে। অপর পক্ষ আরেক আইনজীবীর কাছে গেলে তিনিও শুনে, কাগজপত্র দেখে প্রথম পক্ষের আইনজীবীর সঙ্গে মিটমাটে বসবেন নিজ নিজ মক্কেল নিয়ে। আপসরফার উদ্যোগটা গোড়াতেই নেবেন দুই পক্ষের আইনজীবী। সময়সীমা থাকবে নির্দিষ্ট, ফিশের হারটাও। মিটে গেলে সোলেনামায় বিরোধ নিষ্পত্তি। না মিটলে তার কারণ বিস্তারে একটি স্মারক তৈরি করবে দুই পক্ষ। সেই স্মারক নিয়ে আদালতে যাবে সংক্ষুব্ধ পক্ষ। বিচারে যে পক্ষ হারবে, তার হবে মামলার দাবির সমান জরিমানা গোঁয়ার্তুমি করে অপর পক্ষকে হয়রানির মামলায় ফেলার দায়ে।”

আইনজীবী ছাড়া মামলা ঢোকেও না, চলেও না আদালতে। নিজের মামলা নিজে করার সুযোগ থাকলেও আইনজীবী না ধরে কেউ আদালতের পথ মাড়ায় না। অনেক আইনজীবীও নিজের মামলা করতে ধরেন আরেক আইনজীবীকে। দাম্পত্যকলহে স্ত্রী তার বাবার বাড়ি গিয়ে ফিরে না এলে কার কোন ফৌজদারি অপরাধ হয়? বিরহকাতর স্বামীকে আপসের পথ না দেখিয়ে, আদালতে কোন যুক্তিবাণে ‘সিআরপিসি’র ১০০ ধারায় সার্চ-ওয়ারেন্টের মামলা বাধালেন? অচল বলে মামলা খারিজে চিরবিচ্ছেদযন্ত্রনায় স্বামী হলেন আত্মঘাতী (সংবাদ ভাষ্যমতে)। আপিল-আদালতের দণ্ডিতকে উচ্চ-আদালতে যেতেও বিচার-আদালতের জামিন দিতে নেই বলে তলব পড়ে শুধু জামিনদাতা বিচারকেরই। যুক্তিজালে জামিন ধরা আইনজীবীর যুক্তিটা জানারও নয়! আইনজীবী নির্দায় জীবিকাধিকারে! বিচারের এই ডানায়ও একটু তো ভর দেওয়ার আছে।

মক্কেল এলেই মামলা বানানো কিংবা লড়তে নামা, দেওয়ানি বিরোধে ফৌজদারি লাগানো কি আইনজীবীর পেশা! মক্কেলের গল্প সত্য কি না, কাগজপত্রের আসল-জাল পরখ করার পয়লা দায় তো আইনজীবীরই। আদালতে সেসব প্রমাণ করতে পারবেন কি না, বিপক্ষের জেরায় সাক্ষী টিকবে কি না, কাগজপত্রের জালিয়াতি ধরা পড়বে কি না, সব তো তিনিই দেখেন আগে। কোন বিরোধে কী মামলা সে তো মক্কেলের খায়েশমতো হবে না, ঠিক করেন তো আইনজীবীই। চিকিৎসকে চিকিৎসা দেন রোগ ধরে শাস্ত্রমতে, রোগীর রুচিমতে দিলে কুচিকিৎসায় জীবননাশ।

ফাঁকা বুলি নয় এসব। সত্যিই লেখা আছে ‘Canons of Professional Conduct and Etiquette of Advocates’-এ। নিজের কারণে আদালতে সময় নিতে নয়, বলা আছে নিজে না পারলে বিকল্পব্যবস্থা করে রাখতে। হয়রানির মামলা বানাতে নিষেধ আছে। বলা আছে, আইন আর ‘ফ্যাক্টস’ বুঝে নিশ্চিত হয়েই আইনজীবী নিজ দায়িত্বে ঠিক করবেন মামলা করবেন কি না, লড়বেন কি না। ‘দায় ছাড়া আয়’, এমন পেশা নয় আইনজীবীর। ‘আইনজীবী’ নামে বাংলাকরণ সম্মানের হয়নি মোটে ‘অ্যাডভোকেট’ সাহেবের। জীবিকার্জনই মুখ্য দেখায় বলে অনেকেই তাদের কৌশলী ভাবেন! আইনি আচরণের খেলাপ করলে পেশাগত অসদাচরণে আইনজীবীর দায়ী হওয়ার কথা বার কাউন্সিলে। কেউ অভিযোগ না করলেও গন্ধ পেলে, ধোঁয়া দেখলেই নিজ গরজে খোঁজখবর করার কথা বার কাউন্সিলের। সেই চাবিকাঠি ঘোরে না দুর্বল হাতে।

ইচ্ছেমতো আপিলের অধিকার খাটানো বিচারকারী আদালত ও ন্যায়বিচারের ওপর চড়াও হওয়ার শামিল, অতিবিলম্বের বিচারবঞ্চনার মূল বলেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি (১৮ ডিসেম্বর ১৮৮৯ থেকে ২৮ মার্চ ১৯১০) ডেভিড জসিয়াহ ব্রিউয়ার। সে-কথা তো মিথ্যে নয় এখনো আমাদের দেশে। আপিল-রিভিশন, মামলা-রিটের দায় পুরোটাই নিতে হবে আইনজীবীকে যিনি ‘মেরিট’ ছাড়া হয়রানির কায়দা করে দাখিল করেন, লড়তে নামেন। আদালতে জরিমানা লাগাতে হবে তার, পেশাগত অসদাচরণের ব্যবস্থা নিতে হবে বার কাউন্সিলে। এইটুকু ব্যবস্থা এখনই করতে পারে সুপ্রিম কোর্ট ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৫৪(২)(সি) ধারা ও দেওয়ানি কার্যবিধির ১২২, ১২৬ ধারার ক্ষমতায় আর হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের ‘রুলস’-এ বিধি জুড়ে। ‘মূল্য সংযোজন’ করে দোকানদার, ‘মূল্য সংযোজন কর’ (VAT) দেয় খরিদ্দার! এই অনাচার বাজরে চলে, চালানো যায় না অন্তত বিচারে। হয়রানির না-হক আপিল-রিভিশন-রিটের, অচল মামলা, ভুল মামলার খেসারত মক্কেল নয়, গুনতে হবে তার আইনজীবীকেই। ঢালাও দোষের ভাগী হতে বাঁচেন নীতিনিষ্ঠ ‘অ্যাডভোকেট’।

বিশ্বাসের পাল্লায় ওজনদার হলে এক সাক্ষীতেই প্রমাণ হতে পারে, কাজ হয় না ওজনবিহীন শতেক সাক্ষীতেও। এক মামলায় একপক্ষে যোগ্য আইনজীবী দু-একজনই যথেষ্ট। অত্যধিকের হট্টগোলে আইনের যুক্তি নাকি মক্কেলের শক্তি দেখানো হয় বুঝতে গোল বাধে! সেসব মিটিয়ে সুস্থির হয়ে বসতেই দিন কাবার। একপক্ষেরই বিজ্ঞ সবার লম্বা শুনানিতে বিচার লবেজান। বিত্তশালীর পাল্লায় পড়লে বিপক্ষের আইনজীবী মেলা ভার। এক মামলায় এক মক্কেল কতজন আইনজীবী দিতে পারে, তার পক্ষে এক তারিখে কতজনে শোনাতে পারে তারও একটা সীমা থাকা দরকার।

এসব কোন দেশে আছে! পাওয়া যাবে সেই দেশে যেখানে আদালতে কারাফটকে ধর্ষক-ধর্ষিতার বিয়ে দিয়ে ধর্ষণ মামলা মিটে; যেখানে একজনের মান গেছে বলে মামলা করে অন্যরা সব জনে জনে যত থানা যত আদালতে।

বিচারে আসার আগেই বিলম্ব শুরু ফৌজদারিতে। ‘সিআরপিসি’-তে তদন্তের সময়সীমা বাঁধা নেই বলে কি চলবে তদন্তকারীর মর্জিতে। ১৬৭ ধারার (১) উপধারায় চব্বিশ ঘণ্টায়, আর (৫) উপধারায় ১২০ দিনে শেষ করার ইশারাটা ‘কাফি’ হবে না ‘আকেলমন্দ’ দু-একজনেরও! দুদক আইনে (২০ক ধারা) ১২০ দিনে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে (১৮ ধারা) অপরাধী হাতেনাতে ধরা পড়লে ১৫ দিনে, না পড়লে ৬০ দিনে তদন্তের সময়সীমার স্পষ্ট বিধান আছে। সীমালঙ্ঘনকারীর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব আছে কর্র্তৃপক্ষের। এখনকার অনেক আইনেও তাই আছে। সীমালঙ্ঘনই অলঙ্ঘনীয় হয়ে গেছে। ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না কর্র্তৃপক্ষকে। দীর্ঘতর তদন্ত শেষ হলে শুরু হয় অধিকতর তদন্ত ফাঁকফোকর রেখে দায়সারা, দোষীর বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা বানিয়ে নির্দোষীকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার প্যাঁচ লাগানো কাজে। বখে যাওয়া কর্মীকে অতিশয় অপত্যস্নেহে কর্তার আগলে রাখার কি আছে! লোকে দুষবে কাকে! সময়মতো শেষ করিয়ে নেওয়া, একবারেই নিখুঁত তদন্ত করিয়ে নেওয়ার কর্র্তৃত্বটা করতে হবে কর্র্তৃপক্ষকে নজরদারি, তদারকি দিয়ে। নষ্ট ‘পার্টস’ দুষ্ট গরু সরাতে হবে, সারাতে হবে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়ে।

আসে না বলে সাক্ষীর বদনামে মামলা ঝুলে ফৌজদারিতে। এলেও তো দাবড়ায় আসামি আর দুই পক্ষের আইনজীবী এবং আরও যে পারে। সাক্ষী, তাই খাড়া সর্বদা! বসবার জায়গা নেই তার আদালতের কোনোখানে। গাঁটের পয়সা খরচ করে এসে ফিরতে হয় খালি হাতে। এসব দুঃখ ঘুচিয়ে স্বস্তি একটু না দিলে সাক্ষী স্বতঃপ্রবৃত্ত হবে? আদালতে তার বসার জায়গা দিতে হবে। দিনের লোকসান, যাওয়া-আসার, থাকা-খাওয়ার হিসাব করে খরচা দিতে হবে নগদে। খাত রাখতে হবে সাক্ষী নেওয়া আদালতের হাতে। সমনটা সত্যিই পৌঁছাতে হবে সাক্ষীর কাছে। সে তদারকিটা করতে হবে থানা ও আদালতের কর্তাদের। সাক্ষীর ফিরে গিয়ে নিরাপদে থাকার আস্থাটুকুও জাগানোর আছে। 

১৮০ দিনে বিচার শেষ না হলে বিচারক, পাবলিক প্রসিকিউটর, পুলিশ কর্মকর্তাকে সুপ্রিম কোর্ট ও সরকারের কাছে কারণ জানাতে বলা আছে; আর খতিয়ে দেখে দায়ী ধরে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে যার যার কর্র্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দেওয়া আছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে [ধারা ৩১ক]। জানানোই হয় কি না জানা যায় না ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না বলে। শুধু এই মামলায় নয়, অতিবিলম্বের কারণ জানাতে হবে, বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে ফৌজদারির সব মামলাতেই। তদন্তকারী-আইনজীবী-বিচারক, ধরে দেখাতে হবে দায় কার কতখানি। তদন্ত আর বিচারে তথ্যপ্রযুক্তি, আধুনিক যত প্রযুক্তি সব লাগাতে হবে। এতটুকু যদি সত্যি করা যায় ভাবা যাবে আরও কী করার আছে। বিচারব্যবস্থার ‘সুপ্রিম অথোরিটি’ হিসেবে কাজটা করতে হবে সুপ্রিম কোর্টকে। বিচারের অতিবিলম্বের সব পাষাণকপাটে তদারকি-তত্ত্বাবধানের চাবিকাঠি ঘোরাতে হবে সবল হাতে।

নইলে, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে (১৮৩৪-৩৮ খ্রিস্টাব্দে) মেকলে সাহেবের দেখা ‘large promises (প্রতিশ্রুতির পাহাড়), smooth excuses  (অনায়াস অজুহাত), elaborate tissues of circumstantial falsehood (দরকারমতো মিথ্যাচারের বিস্তীর্ণ জাল)’ চরিত্রের কতিপয় বাঙালির স্বভাবে অভাব যাবে না কিছুতে। পুথিতেই থাকবে শুধু, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে (১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে) রবিঠাকুরের লিখে যাওয়া গানের সব কটি কথাই চিরসত্য ধরে চিরকাল আমাদের কোরাস গাইতে হবে

‘ভালো মানুষ নই রে মোরা ভালো মানুষ নই

গুণের মধ্যে ওই আমাদের, গুণের মধ্যে ওই॥

দেশে দেশে নিন্দে রটে, পদে পদে বিপদ ঘটে

পুথির কথা কই নে মোরা, উল্টো কথা কই॥

জন্ম মোদের ত্র্যহস্পর্শে, সকল-অনাসৃষ্টি।

ছুটি নিলেন বৃহস্পতি, রইল শনির দৃষ্টি।

অযাত্রাতে নৌকো ভাসা, রাখি নে ভাই, ফলের আশা

আমাদের আর নাই যে গতি ভেসেই চলা বই॥’

(‘নাতিবিলম্ব বিচারের চাবিকাঠি : উদ্ধার পর্ব’ সমাপ্ত হলো)

লেখক প্রবন্ধকার ও আইনগ্রন্থকার; অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত