টানটান উত্তেজনার মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) নির্বাচন আজ। এতে মেয়র পদে ৭ এবং ৪১ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে ২২৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ৪১ ওয়ার্ডের ৩৫টিতে আওয়ামী লীগের (বিদ্রোহী) প্রার্থী রয়েছেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা অনেক অনুরোধ ও বহিষ্কারের হুমকি দিয়েও তাদের নির্বাচন থেকে সরাতে ব্যর্থ হন।
নির্বাচনী প্রচারণার শুরুর দিকেই মোগলটুলীতে একটি খুন এবং অনেকের আহত হওয়ার ঘটনা এবং বিএনপির মেয়র প্রার্থীর গাড়ির বহরে একাধিকবার হামলা, বিএনপির কিছু কর্মীকে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার, একপক্ষ আরেকপক্ষের নির্বাচনী ক্যাম্পে ভাঙচুরের ঘটনা ও আওয়ামী লীগের (বিদ্রোহী) প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ, গোলাগুলি ইত্যাদি জনমনে সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠান নিয়ে উদ্বেগ, আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। সর্বশেষ চসিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফেনী, নোয়াখালীসহ পার্শ্ববর্তী অন্যান্য জেলা থেকে সন্ত্রাসী গ্রুপকে চট্টগ্রাম মহানগরে জড়ো করার অভিযোগ নির্বাচনী পরিবেশকে আরও উত্তপ্ত করেছে। বহিরাগত সন্ত্রাসীদের জড়ো করার এ অভিযোগ আওয়ামী লীগ, বিএনপি দু’দলেরই। তবে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা এ বিষয়ে সজাগ আছে এবং এরই মধ্যে কিছু বহিরাগতকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘নির্বাচনে কারও থ্রেট বা হুমকি সহ্য করা হবে না। পুলিশ এ ক্ষেত্রে ডানে-বামে তাকাবে না। যেই হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে, তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসানুজ্জামানও ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। দেখা যাচ্ছে, বহিরাগত সন্ত্রাসী ঠেকাতে সিএমপি মহানগরের চার প্রবেশ পথে চেকপোস্ট স্থাপন করেছে এবং নগরীর মোড়ে মোড়ে সন্দেহভাজন যানবাহন ও যাত্রীদের তল্লাশি করছে। এসব কড়াকড়ি ও আশ^াস সত্ত্বেও ভোটারদের মনে শঙ্কা কাটেনি। ব্যক্তিগত আলোচনায় অনেককেই বলতে শোনা যায়, ভোটের দিন সাধারণ ছুটি কেন দেওয়া হলো না। আদৌ কি সুষ্ঠু ভোট হবে? এসব প্রশ্ন নিকট অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
চসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী ও বিএনপির প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন। এ দুজনই যোগ্য ও সজ্জন ব্যক্তি। নগরবাসীর কাছে দুজনেরই আলাদা আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি ও কর্মী বাহিনী বিশাল। সেদিক থেকে নগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রেজাউল করিম চৌধুরী অনেকটা এগিয়ে আছেন। সাধারণ জনগোষ্ঠীর কাছে তার পরিচিতি কম। তবে তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং চট্টগ্রামের একটি বনেদি পরিবারের সন্তান ও নৌকা মার্কা তাকে নির্বাচনী বৈতরণী পাড়ি দেওয়ার জন্য অনেক বেশি সহায়ক হয়ে উঠেছে। পক্ষান্তরে, চূড়ায় নেতৃত্বশূন্যতা ও পুলিশি ধর-পাকড়সহ নানা কারণে বিরোধী দলের মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন কিছুটা ব্যাকফুটে আছেন বলা চলে। তবে নগরীতে বৃহত্তর বাকলিয়া অঞ্চল এবং দক্ষিণ পতেঙ্গা-হালিশহর ও অন্যান্য এলাকায় বিএনপির প্রভাব ব্যাপক। সেই সঙ্গে নগর বিএনপির আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেনের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরিচিতি ও বিনয়ী আচরণ যোগ হয়ে তাকে একজন শক্তিশালী মেয়র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। এছাড়া নগর আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে রেকর্ড ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ডা. শাহাদাতের জন্য পরোক্ষ একটা সুযোগ এনে দিয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
গত রবিবার রাতে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীর পক্ষে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং আওয়ামী লীগের কর্মী, সমর্থক ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালাতে বিএনপি বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নগরীতে জড়ো করেছে। অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন একইদিন অনুরূপ অভিযোগ করে বলেন, অতীতের নির্বাচনগুলোর মতো ভোটকেন্দ্র দখল ও ভোটচুরির জন্য সরকারি দল নগরীর হোটেল, মোটেল ও গেস্ট হাউজগুলোতে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের জড়ো করেছে।
এসব সহিংস ঘটনাবলি এবং অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের কারণে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এতে ভোটকেন্দ্রগুলোতে আজ ভোটার উপস্থিতি অনেক কম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভোটার উপস্থিতি আরও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেতে পারে নির্বাচনের দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা না করায়। বিএনপি সাধারণ ছুটি ঘোষণা না করার এ বিষয়টিকে ভোটার উপস্থিতি কমানোর ‘ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যায়িত করেছে।
অবশ্য চসিক নির্বাচনে সাধারণ ছুটি ঘোষণা না দেওয়ার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা। গত রবিবার রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে চসিক নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রক্ষাকারী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তরে এ সম্পর্কে বলেন, ছুটি পেলে সবাই বাড়ি চলে যায়। ভোট দেয় না। তাছাড়া কেবিনেট থেকে একটা নির্দেশনা জারি আছে। যারা সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োজিত থাকবেন তাদের যেন ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এ কারণে সাধারণ ছুটি থাকবে না।
তবে সাধারণ ছুটি না রাখার এ বিষয়টি সর্বত্র ব্যাপক সমালোচিত হচ্ছে। সাধারণ ছুটি ঘোষণা না করায় হাজার হাজার গার্মেন্ট শ্রমিক কর্মচারী ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিস করতে বাধ্য এবং সেটা সকাল থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। এরপর তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের আর সুযোগ থাকবে না। এ বিষয়টিকে বিএনপি সরকারের পরিকল্পিত ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছে। বিএনপির মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘সাধারণ ছুটি ঘোষণা না করে সরকার ভোটারদের কেন্দ্রবিমুখ এবং ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত করেছে।’
এ দেশে সব নির্বাচনেই এমন অভাব-অভিযোগ থাকে এবং তা বাস্তবও বটে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা কোণঠাসা থাকতে দেখা গেছে। তাদের ধর-পাকড় করতে পুলিশের কোনো বাছ-বিচার ছিল না। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, তাই বিএনপিরও সেই একই অবস্থা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এটা গণতন্ত্রকামী সচেতন নাগরিকদের কাম্য নয় বটে; তথাপি এমনটাই ঘটছে। এখানেই গণতন্ত্রের দুর্ভাগ্য। এমন পরিবেশ পরিস্থিতিতে সাধারণ নাগরিক বা ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আস্থা হারিয়ে ফেলেন। অনেকেই আজকাল মনে করেন, এখন ভোট না দিলেও চলে। কারণ ভোট লুট হয়ে যায়। নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার প্রতি জনমনের এ অনাস্থা আশঙ্কাজনক। এমন চলতে থাকলে আখেরে তার চরম মূল্য দিতে হবে জাতির জন্য এবং গণতন্ত্রের জন্য তা অশুভ ও অনাকাক্সিক্ষত ফল বয়ে আনতে পারে।
এত কিছুর পরও চসিক নির্বাচন ঘিরে চট্টগ্রামে নির্বাচনী আমেজটি শেষতক বেশ বহাল ছিল। গত সোমবার রাত ১২টা অবধি মিছিলে, সেøাগানে, গানে, মাইকিংয়ে মেয়র ও কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের গণসংযোগ এবং প্রচারণায় দিনরাত মুখরিত ছিল এ বৃহত্তম নগর। সোমবার রাত ১২টার পর থেকে সব শান্ত। তখন মনে হলো একটা ঝড় থেমে গিয়ে সব শান্ত। আসলেই কি তাই? আজকের ভোট শেষে কিংবা ভোট চলার মধ্যখানে প্রমাণিত হবে, ঝড় থামল নাকি সাময়িক বিরতির পর নতুন রূপ পরিগ্রহ করল।
এখন হার-জিতের চিন্তা ছাপিয়ে সবার ভাবনায় চসিক নির্বাচনের সুষ্ঠতা নিয়ে। মানুষ অভয়চিত্তে ভোট দিতে পারবে কি না! এতসব চিন্তার একটাই কারণ ২০১৫ সালের ২৯ এপ্রিল সর্বশেষ চসিক নির্বাচনে দুপুর না গড়াতেই অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র দখল হয়ে গিয়েছিল। যে কারণে ভোটগ্রহণ শেষের আগেই ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন তৎকালীন বিএনপির মেয়র প্রার্থী এম মনজুর আলম।
