বিএনপি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ। অন্যদিকে ভোটের নামে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রে কেন্দ্রে সন্ত্রাসীদের মিলনমেলা করেছে অভিযোগ তুলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলীয় মেয়র প্রার্থীর প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এ নির্বাচনে ভোট ডাকাতির সঙ্গে চরম নির্যাতন-নিপীড়নও যুক্ত হয়েছে। গতকাল বুধবার চসিক নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলাদা আলাদা সংবাদ সম্মেলনে এমন পরস্পরবিরোধী মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির এ দুই নেতা।
গতকাল সন্ধ্যায় নগরীর দেওয়ানজী পুকুরপাড়ের বাসভবনে চসিক নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রেস ব্রিফিংয়ে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘বিএনপির কর্মীরা আজ (গতকাল) বিভিন্ন জায়গায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। নগরীর পাহাড়তলী, আমবাগান, লালখানবাজার, পাথরঘাটা, দেওয়ানবাজারসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও কর্মীদের ওপর আক্রমণ করেছে। তারা (বিএনপি) অতীতেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল। তাছাড়া ১৯৯৪ সালের পর থেকে চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে প্রকৃতপক্ষে একবারও বিএনপি জিততে পারেনি।’
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচন শেষ হওয়ার আগমুহূর্তে আমির খসরু মাহমুদ সাহেব নগরীতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন, ঢাকায় বসে রিজভী সাহেব সংবাদ সম্মেলন করেছেন। চসিক নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্নও তুলেছেন। আমরা আগে থেকেই জানতাম, এসব প্রশ্ন তোলার জন্যই বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। তারা সব নির্বাচনে গৎবাঁধা এ ধরনের প্রশ্ন তোলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশে এমন একটি বিধি করেছে, যারা এমপি তারা নির্বাচনে প্রচারণা চালাতে পারছেন না। যে কারণে দলের পক্ষে এ নির্বাচনে আমরা কোনো ভূমিকা রাখতে পারিনি। এটি সরকারি দলের জন্য বৈষম্যমূলক বিধান।’
করোনা মহামারীর মধ্যে নির্বাচন হয়েছে উল্লেখ করে হাছান মাহমুদ বলেন, ‘করোনায় এখনো প্রতিদিন অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতির মাঝে নির্বাচন হয়েছে। পাশাপাশি আজকে কোনো সরকারি ছুটি দেওয়া হয়নি। এ কারণে ভোটার টার্নআউট অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চেয়ে কম হয়েছে।’
ব্রিফিংকালে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন, কক্সবাজারের সদর আসনের সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বহিরাগত ও সন্ত্রাসীদের মিলনমেলা হয়েছে দাবি খসরুর : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কোনো ভোটই হয়নি উল্লেখ করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলীয় মেয়র প্রার্থীর প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘এ নির্বাচনে ভোট ডাকাতির সঙ্গে চরম নির্যাতন-নিপীড়ন যুক্ত হয়েছে। ভোটের নামে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রে কেন্দ্রে সন্ত্রাসীদের মিলনমেলা করেছে এবং অন্তত পাঁচ শতাধিক ভোটকেন্দ্র দখল করে ধানের শীষের এজেন্টদের বের করে দিয়েছে।’ গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টায় চসিক নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
নগরীর নুর আহমদ সড়কের নাসিমন ভবন প্রাঙ্গণে ওই সংবাদ সম্মেলনে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আওয়ামী পুলিশ শতভাগ কাজ করেছে, নির্বাচনী প্রজেক্টের আওতায় যে বিষয় পালন করার নির্দেশনা তারা পেয়েছে সেটা তারা করেছে এবং অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করেছে। চট্টগ্রাম মহানগরীর মানুষকে তারা আবারও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। নির্বাচন কমিশন হচ্ছে কতগুলো তাঁবেদার, সেখানে তাদের বসিয়ে দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগের ভোট চুরি-ডাকাতি সম্পন্ন করার জন্য। আমি তাদের বিষয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না।’
বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না উল্লেখ করে এ বিএনপি নেতা বলেন, ‘১৮ কোটি মানুষ এখন বিশ্বাস করে এ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। এখন ভোট ডাকাতি নয়, মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, এটা আরেকটা পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এ সরকারের অধীন কোনো নির্বাচন করার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে হয় না।’
নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু বলেন, ‘যেখানে ভোটই হয়নি সেটা প্রত্যাখ্যান করা না করার কিছু নেই।’
ধানের শীষ প্রতীকের মেয়র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমাদের নির্বাচন হয়নি, নির্বাচন হয়েছে পুরো প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে। আমরা মনে করেছিলাম উৎসবমুখর পরিবেশে একটি নির্বাচন করব। আমরা মানুষের সাংবিধানিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু নির্বাচনটা আমাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনকে আমরা তিনটি দাবি জানিয়েছিলাম। ইভিএম মেশিনকে সুরক্ষা, এনআইডি ছাড়া কেন্দ্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ও বহিরাগতদের ঠেকানো। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এর কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি। দিনভর বিভিন্ন সেন্টার ঘুরে দেখেছি আমার ভোটার, এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে মারধর করে বের করে দিয়েছে। নারী এজেন্টদের শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। পুরো নির্বাচনই এক ধরনের নির্যাতনে পরিণত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের ভোট ডাকাতির ইতিহাস আবারও উন্মোচিত হয়েছে।’
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, নাগরিক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক একরামুল করিম চৌধুরী, নগর বিএনপির সদস্য সচিব আবুল হাসেম বক্কর, দক্ষিণ জেলার আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান, কেন্দ্রীয় সদস্য মীর হেলাল উদ্দিন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
