আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না চোরাকারবারিদের তৎপরতা। বরং দিনে দিনে অনেকটা বেপরোয়া হয়ে উঠছে তারা। চোরাকারবারিদের দমনের কৌশল নির্ধারণে বৈঠকের পর বৈঠকের পাশাপাশি তালিকা ধরে চালানো হচ্ছে অভিযানও। কিন্তু এতকিছুর পরও প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে ধরা পড়ছে সোনা ও মাদকের চালান। আবার মাঝে মাঝে দুয়েকজন চোরাকারবারি গ্রেপ্তার হলেও তারা জামিনে বের হয়ে ফের দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে একই কারবার। এ পরিস্থিতিতে ঢাকাসহ সারা দেশের শীর্ষ ১৬৯ চোরাকারবারির একটি তালিকা চূড়ান্ত করে তাদের ধরতে অভিযানের প্রস্তুতি চলছে বলে পুলিশ ও শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। আর চূড়ান্ত তালিকায় থাকা ওই চোরাকারবারিদের মধ্যে ২২ জনই ভারতীয় নাগরিক বলে জানা গেছে।
এদিকে চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও দেশের সীমান্তগুলোতে ঢিলেঢালা নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর প্রেক্ষিতে সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি তালিকাভুক্ত চোরাকারবারিদের ধরতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে। গত বৃহস্পতিবার চোরাচালান নিরোধ কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্সের সভা থেকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। ওই বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব এবং পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ সরকারের ৪৭টি সংস্থা ও দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সীমান্ত এলাকার পাশাপাশি দেশের সবকটি বিমানবন্দরে চোরাকারবারিরা সক্রিয় আছে দীর্ঘদিন ধরেই। শাহজালাল, শাহআমানত ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নানা রকমের অপরাধ কর্মকান্ড চলে আসছে। সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ বিভিন্ন কৌশল নিয়েও কারও বিরুদ্ধে কার্যকর তেমন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। ওইসব বিমানবন্দরে অপরাধ কর্মকান্ডের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সোনা পাচার। মাঝেমধ্যে মাদকও পাচার হচ্ছে। সম্প্রতি শাহজালালে আগের চেয়ে সোনা পাচার বেড়ে গেছে। সেখানে প্রায় প্রতিদিনই ধরা পড়ছে সোনার চালান। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এ নিয়ে বিশেষ তদন্ত চালাচ্ছে। তারা জানতে পেরেছে, বিদেশি এজেন্টদের পাশাপাশি দেশি এজেন্টরাও বেশি লাভের আশায় বেপরোয়াভাবে সোনা চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মাফিয়ারা বাংলাদেশিদের সঙ্গে আঁতাত করে পাচার করছে সোনা। কোন কোন দেশের মাফিয়ারা বাংলাদেশে সক্রিয় আছে তার একটি তালিকা করেছে গোয়েন্দারা। আবার কক্সবাজারের টেকনাফসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্তেও চোরাকারবারিদের সক্রিয় থাকার তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশ থেকে চোরাচালান নির্মূল করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কাজ করছে। পাশাপাশি শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত অধিদপ্তরসহ কাস্টম হাউজও সক্রিয় আছে। তালিকাভুক্ত চোরাকারবারিদের ধরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সোনা পাচারের পাশাপাশি মাদক পাচারেও জিরো টলারেন্স দেখানো হচ্ছে।’
সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান যাতে না আসতে পারে সেজন্য পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি কাজ করছে। মিয়ানমারের ইয়াবা কারখানাগুলো বন্ধ করার জন্য ওই দেশের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। তারা কারখানাগুলো বন্ধ করার আশ্বাস দিয়েছে। সবমিলিয়ে আমাদের তৎপরতা অব্যাহত আছে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার এনবিআর ভবনে চোরাচালান নিরোধ ট্রাস্কফোর্সের সভা হয়েছে। ওই সভায় ৪৭টি সংস্থা ও দপ্তরের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। কঠোরভাবে চোরাচালান প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। চোরাকারবারিদের যারা আশ্রয়-প্রশয় দেবে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি তালিকাভুক্তদের গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা করতে হবে। চোরাচালান শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
পুলিশ এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, দীর্ঘদিন ধরেই দেশের তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সোনার চালান পাচার হচ্ছে। এসব বিমানবন্দরে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে চোরাকারবারিদের। তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে জুয়েলারি ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্তদের। এছাড়া প্রভাবশালী রাজনীতিকদের সঙ্গেও সখ্য রয়েছে চোরাকারবারিদের। বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কেউ কেউ সহায়তা করছেন তাদের। এর বাইরে সীমান্ত এলাকা দিয়ে পাশর্^বর্তী দেশ থেকে ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকের চালান আসছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তালিকাভুক্ত চোরাকারবারিরা বেশ প্রভাবশালী। তাদের সঙ্গে অপরাধজগতের মাফিয়াদের যোগাযোগ থাকার তথ্য মিলেছে। আছে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাও। তাদের ছবিসহ জীবনবৃত্তান্ত সবকটি বিমানবন্দরে থাকলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। কৌশলে তারা বাহকের মাধ্যমে সোনা ও মাদকের চালান পার করে নিচ্ছে। ইতিমধ্যে পুলিশ ও শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত অধিদপ্তর একটি তালিকা তৈরি করেছে। তালিকায় চোরাকারবারিদের নাম থাকলেও পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নেই। তারমধ্যে ২২ জন ভারতীয় নাগরিক। তারা প্রায়ই বাংলাদেশে আসা যাওয়া করেন। শীর্ষ চোরাকারবারিদের মধ্যে বনানীর ফিরোজ আলম, সায়েদাবাদের মোহাম্মদ ওয়াহেদুজ্জামান, আবদুল আউয়াল, মুন্সীগঞ্জের ফারুক আহম্মেদ, দিনাজপুরের সোহেল রানা, নরসিংদীর মনির আহম্মেদ, নারায়ণগঞ্জের ওয়াহেদউল্লাহ, মিরপুরের সাইফুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জের মঞ্জুর হোসেন, পল্লবীর সামসুল হুদা, মুন্সীগঞ্জের ইসলাম শেখ, রাজবাড়ীর মোহাম্মদ হানিফ, মুন্সীগঞ্জের মোহাম্মদ রুবেল, বিমানবন্দরের নজরুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, এনামুল, রমিজ উদ্দিন, মোতালেব খান, বাহার, লিটন দাস, ভারতীয় নাগরিক রূপসাহা, গোপাল বিজন, বিজন হালদার, লক্ষণ সেন, গোবিন্দ বাবু, লালু জয়দেব, গওহর প্রসাদ, সঞ্জিব, রামপ্রসাদ, মিন্টু, সুমন চ্যাটার্জী, রিয়াজ, তপন সাহা, ডালিম, মোনায়েম, ফারুক, বসাক চ্যাটার্জী, স্বপন সাহা, মোহাম্মদ আলী, রাজিব শুভ্র, পাপ্পু সাজ্জেল, কলকাতা বড়বাজারের অজিত, রাম শর্মা, জামিল আহমেদ, মো. সেলিম, খুলনার দৌলতপুরের হোসেন আসকর লাবু, কামরুল হাসান, কে এম কামরুল হাসান বিপু, আবু জাফর, মিরপুরের মাহবুব, চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের জুলহাস, ঢাকার সুজন, শাহরিয়ার হোসেন প্রিন্স, রফিকুল ইসলাম, মতিয়ার রহমান খলিল, শামসুল হুদা, মিঠুন আকন, পারুল, অখিল, মতিয়ার রহমান খলিল, পুরান ঢাকার অলিউর রহমান, নোয়াখালীর আবদুল বাতেন, ঢাকার সুরুজ মিয়া, তারেকুজ্জামান, মানিক মিয়া, টিটু সুলতান, ইদ্রিস আলী, শাহজাহান মিয়া, কবির আহমেদ, মনির হোসেন, রাসেল আকন, রুহুল আমিন, জমির হোসেন, নিজাম, লাকি আকন, কক্সবাজারের নুরুল আমিন, জয়নাল আবেদীন, সুলতান আহমেদ, উখিয়ার ফজল কাদের, কুমিল্লার রুহুল আমিন, আবদুর রহিম প্রমুখকে তালিকাভুক্ত করা হলেও তারা আছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, শাহপরীর দ্বীপ মিস্ত্রিপাড়া, জেটিঘাট, জালিয়াপাড়া, নোয়াপাড়া, সাবরাং, টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, জালিয়াপাড়া, কায়ুকখালী পাড়াঘাট, নাইট্যং পাড়া ঘাট, বরইতলী, কেরুনতলী, হ্নীলার লেদা, জাদিমুড়া, আলীখালী, দমদমিয়া, চৌধুরীপাড়া, হ্নীলা এবং মৌলভীবাজার, কুমিল্লার বিবিরবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া, যশোর ও চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে মাদকের পাশাপাশি সোনার চালানও আসছে।
শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত অধিদপ্তরের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিমানবন্দরে কর্মরত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসাজশে সোনার বড় চালান নির্বিঘ্নে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যায়। এই কাজে সহায়তা করেন শুল্ক অধিদপ্তর, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও বিমানের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী। ১০ তোলা ওজনের একেকটি সোনার বার বিমানবন্দর থেকে বাইরে এনে দিলে চোরাকারবারিদের কাছ থেকে এক হাজার থেকে ১২শ টাকা পান তারা। দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসার সময় বিমানের কোনো কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী সোনা পাচারে সহায়তা করেন। ওইসব চক্র আবার মাদকও পাচার করে।
