বহুল প্রতীক্ষিত কভিড ভ্যাকসিন এখন অনেক দেশেই পৌঁছে গেছে। একটি-দুটি নয়, বেশ কয়েকটি কোম্পানির ভ্যাকসিনই এখন মানবদেহে প্রয়োগ করা হচ্ছে। গত বছর এ সময়ে যে দারুণ আতঙ্ক ছড়িয়ে করোনাভাইরাসের বিস্তার শুরু হয়েছিল, এক বছরেরও কম সময়ে ভ্যাকসিনের ব্যবহার শুরু হওয়া অবশ্যই যুগান্তকারী ঘটনা!
ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কত দিন থাকবে সেটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমাদের আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে, ভ্যাকসিন যারা নিয়েছেন তাদের কারোর ক্ষেত্রেই উদ্বেগ তৈরি হওয়ার মতো কোনো বিরূপ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য বাজারজাত করার আগে ল্যাবরেটরিতে এবং ট্রায়াল হিসেবে বারবার এর কার্যকারিতার পরীক্ষা হয়েছে। সরাসরি ভ্যাকসিনের কারণে কারও মৃত্যু হয়েছে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কানাডায় প্রায় এক মিলিয়ন মানুষ ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছে। হেলথ কানাডার প্রধান মেডিকেল অ্যাডভাইজার ডা. সুপ্রিয়া শরমা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে সিবিসি টেলিভিশনকে বলেছেন, ভ্যাকসিনের ব্যাপারে আমরা খুবই সতর্ক ছিলাম। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যে ধরনের ফিডব্যাক পেয়েছি, সাধারণ মানুষের ভেতরও একই ফল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু করার পর রিভিউয়ে আমরা এমনকি মৃদু বা মধ্যমমানেরও কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পাইনি। রিভিউয়ের সময় ডেটা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছি; এক. নতুন কিছু ঘটছে কি না, যা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ছিল না এবং দুই. পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো সংখ্যায় অথবা মারাত্মক বিবেচনায় বেড়েছে কি না। দুটোর বেলায়ই নেতিবাচক উত্তর পেয়েছি।
শুধু কভিড-ভ্যাকসিনই নয়, যেকোনো ভাইরাল ভ্যাকসিনের বেলায় শরীরে কিছু সাধারণ ইমিউন-প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তা হচ্ছে, ইনজেকশনের স্থানটিতে লাল, একটু ফোলা, সামান্য ব্যথা ইত্যাদি হতে পারে। শরীরের ভেতরেও ইমিউন প্রতিক্রিয়া হিসেবে কারও কারও সামান্য জ্বর, ক্লান্তি, মাথাব্যথা, হাত টনটন ইত্যাদি হতে পারে। কভিড ভ্যাকসিনের বেলায় সবচেয়ে কমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে সামান্য জ্বর, মাথাব্যথা, ক্লান্তি এবং ইনজেকশনের স্থানে একটু ব্যথা! এই সবগুলো উপসর্গই এক দিনের বেশি থাকে না এবং এগুলো সরাসরি কারও জন্য মৃত্যুর কারণ নয়। উল্লেখ্য, কানাডা এ পর্যন্ত ফাইজার এবং মডার্নার ভ্যাকসিনের অনুমোদন দিয়েছে। তাতে দেখা গেছে, অতি অল্প কিছু মানুষের বিরল অ্যালার্জিক রি-অ্যাকশন ছাড়া বড় ধরনের কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই। অন্য আর ১০টা ভাইরাল ভ্যাকসিনের মতোই, দুর্বল ইমিউনিটির লোকজনের ভেতরে ভ্যাকসিনটি মৃদুমাত্রায় জ্বর, বমিভাব বা ডায়রিয়া ইত্যাদি আনতে পারে। কানাডিয়ান ডাক্তাররা একজোট হয়ে জোর দিয়েই বলছেন যে, ভ্যাকসিন নিরাপদ এবং আমাদের উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে থাকা বয়স্কদের এটি পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে সক্ষম। হাজার হাজার বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক কভিড আক্রান্ত হয়ে এবং মারা গিয়ে আমাদের ওপর যে নানামুখী চাপ তৈরি করেছে, এই ভ্যাকসিন তা থেকে আমাদের মুক্তি দিতে সক্ষম! ভ্যাকসিনের কারণে কোনো অপ্রত্যাশিত মৃত্যু ঘটছে না বা অপ্রত্যাশিত কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে না।
নতুন এই ভাইরাসটি অজানা কোনপথে পৃথিবীকে নিয়ে যায়, বছর জুড়ে তার জল্পনা-কল্পনার অন্ত ছিল না! বড় কোম্পানিগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এর পেছনে। বছরের শেষে নানা কোম্পানির আবিষ্কৃত কভিড-ভ্যাকসিন মানুষের মনে আশার আলো এনে দিলেও এ নিয়ে গুজবেরও অন্ত নেই!
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোয় তো বটেই, কানাডার মতো দেশেও মানুষজন ভ্যাকসিন নেওয়ার বেলায় না বলছে এমন লোক নিতান্ত কম নেই। ভ্যাকসিনের কোনো নিকট বা দূরবর্তী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী কী হতে পারে তা নিয়ে অনেক মানুষ উদ্বিগ্ন! পাশাপাশি ভ্যাকসিন নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ও মিডিয়ায় নেতিবাচক ও অসত্য সংবাদ প্রচারও মানুষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছে। নেতিবাচক প্রচারের ফলে মানুষের ভ্যাকসিন গ্রহণে অনীহা তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ খবরগুলো আসল সত্য প্রকাশ করছে না, বরং মানুষের বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে। ভ্যাকসিন গুজবের সবচেয়ে শীর্ষে ছিল নরওয়ের একটি সংবাদ, যেখানে বলা হয়েছে, ২৩ জন অতি বৃদ্ধকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছিল এবং তারা সবাই মারা গেছেন। এ খবর বিশ্বে হেডলাইন হয়েছে, মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। অথচ এই সংবাদের ভেতরের কথা হচ্ছে ফাইজারের ভ্যাকসিনটি সেখানে ২০ হাজার জনকে দেওয়া হয়েছিল, কয়েক সপ্তাহ ধরে। এই ২০ হাজার জনের ভেতরে মোট মারা গেছেন ৩০ জন। ভ্যাকসিনের আগে এই জনগোষ্ঠীর ভেতরে প্রতিদিন মারা যাচ্ছিলেন গড়ে ৪০০ জন করে এবং এদের কেউই ভ্যাকসিনের কারণে মারা যাননি, তারা মারা গেছেন অন্য শারীরিক উপসর্গের কারণে।
কভিড ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নেওয়ার পরপরই এ পর্যন্ত যারা মারা গেছেন, তারা প্রকৃতপক্ষে ভ্যাকসিনের কারণে মারা যাননি। তাদের মৃত্যুর কারণ অন্য। তারা এমনিতেই নানা প্রাণঘাতী রোগে বা জরাগ্রস্ত হয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিলেন অথবা এমনিতেই মারা যেতেন। কভিড-ভ্যাকসিন কোনো মিরাকল নয় যে তা কভিড ছাড়া অন্য সব রোগের চিকিৎসা করতে সক্ষম বা স্বাভাবিক মৃত্যু ঠেকাতে সক্ষম। উল্লেখ্য, কানাডায় ভ্যাকসিনের কোর্স হচ্ছে দুটি ডোজ, প্রথমটি মাইল্ড এবং পরেরটি বুস্টার। দুটি ডোজের মাঝখানে দুই সপ্তাহ বিরতি। মৃদু ডোজটি দেওয়ার পরপরই কারও শরীরে কভিডের সম্পূর্ণ সুরক্ষা তৈরি হয় না। দ্বিতীয় ডোজটি নেওয়ার পরও শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার জন্য সময় দিতে হয়। কিন্তু তার আগেই যদি কভিডের আক্রমণ ঘটে তবে মৃত্যুরোধ করা কঠিন হতে পারে। টরন্টোর মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের জেরিয়াট্রিকসের ডিরেক্টর ডা. সমীর সিনহা এ প্রসঙ্গে স্থানীয় মিডিয়াকে বলেছেন, বৃদ্ধরা ভ্যাকসিন নেওয়ার পরপরই অসুস্থ হচ্ছেন এবং মারা যাচ্ছেন, এই জাতীয় খবরের কোনো ভিত্তি নেই, তা ভুয়া এবং ক্ষতিকর গুজব! অন্য নানা কারণে এই বৃদ্ধদের অনেকেই মৃত্যুর দুয়ারে ছিলেন। ভ্যাকসিন নিজে সরাসরি কারও মৃত্যুর কারণ হয়নি এখনো। বৃদ্ধনিবাসগুলোয় করোনার আক্রমণ সবচেয়ে তীব্র এবং ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ তাদের যথেষ্ট ইমিউনিটি দেয় না। অত্যন্ত জরাজীর্ণ এবং ডিহাইড্রেশনে ভোগা যে কারও জন্যই তখন সামান্য ডায়রিয়াও মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
গত এক বছরে পৃথিবী কোটি কোটি প্রিয়জন হারিয়েছে এই রোগে। কানাডার বেলায় সবচেয়ে বেশি কভিডাক্রান্ত মানুষ মারা গেছে বৃদ্ধনিবাসগুলোয়। সেজন্য গুরুত্ব বিবেচনায় তারাই সবার আগে প্রথম ধাপে ভ্যাকসিন পাবে বলে স্থির করা হয়। কভিড রোগটি শুধু এ কারণে ভয়ংকর নয় যে, এতে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। বরং এটি বেশি জটিল এ কারণে যে, পৃথিবীব্যাপী স্বাস্থ্যব্যবস্থাসহ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর বিরাট চাপ পড়েছে এর ফলে! হাসপাতাল আর ক্লিনিকগুলো কভিডসহ অন্য রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে! আইসিইউগুলো দখল হয়ে গেছে, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন স্থবির আর বিভীষিকাময় হয়ে পড়েছে!
আমাদের সামনে দুটো মাত্র পথই খোলা আছে ভ্যাকসিন নেব কি নেব না! ভ্যাকসিনের নেতিবাচক প্রচারণায় ভ্যাকসিন না নিয়ে কভিড আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ও তার কনসিকোয়েন্সকে বরণ করে নেব, না কি ভ্যাকসিন নিয়ে নিজেকে সুস্থ ও জীবিত রাখার মিছিলে শামিল হব? উত্তর যার যার তার তার!
লেখক : কানাডায় কর্মরত নার্স ও প্রবাসী সাংবাদিক
