পৌরসভাতেও ব্যবসায়ীরা নির্বাচনে

আপডেট : ৩০ জানুয়ারি ২০২১, ০২:৩১ এএম

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতা ও অনিয়মের ভোটের দুদিন পর আজ দেশের ৬৪ পৌরসভায় নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হতে যাচ্ছে। পৌরসভা নির্বাচনের এই তৃতীয় ধাপে ৬৪ পৌরসভার তফসিল ঘোষণা করলেও মেয়র পদের এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ত্রিশাল পৌরসভার মেয়র পদে নির্বাচন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। এছাড়া গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, কুমিল্লার লাকসাম এবং বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে মেয়র পদে একক প্রার্থী থাকায় তিনজনই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। তৃতীয় ধাপের এ নির্বাচনে সব পৌরসভাতেই ব্যালট পেপারে হবে ভোটগ্রহণ। ভোটগ্রহণ যাতে সহিংসতামুক্ত ও অবাধ হয় সেটা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সক্রিয়তা জরুরি। অন্যদিকে এবারের পৌর নির্বাচনের একটি বিষয় খেয়াল করার মতো। সেটি হলো ভোটের মধ্য দিয়ে যে দলের যে প্রার্থীরাই নির্বাচিত হোক না কেন, পৌরসভাগুলোর মেয়র পদে নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা প্রার্থীদের হলফনামা থেকেই এ চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এখন আর তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে উঠে আসা নেতৃত্ব দেখা যাবে না।

পৌরসভায় মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবং বিরোধী দল বিএনপির মেয়র প্রার্থীদের সংখ্যাগরিষ্ঠই পেশায় ব্যবসায়ী। এ ক্ষেত্রে বিএনপি কিছুটা এগিয়ে। তৃতীয় ধাপের এ নির্বাচনে দলটির ৯০ শতাংশ মেয়র প্রার্থীই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আর আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে তা ৮২ শতাংশ। অন্যদিকে এক যুগের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রার্থীদের মাথায় রয়েছে মামলার বোঝা। অবশ্য হলফনামায় প্রার্থীরা সম্পদ ও অন্যান্য তথ্যের যে বিবরণ দেন তার সত্যতা নিয়ে অনেকেরই সংশয় রয়েছে। কেননা হলফনামার তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি দীর্ঘদিনের দাবি থাকলেও নির্বাচন কমিশন কখনই তা যাচাই করে না। কমিশনের অবশ্যই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

একদিকে যেমন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের মেয়র প্রার্থীদের মধ্যেই ব্যবসায়ীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ তেমনি উভয় দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধেই ফৌজদারি বিভিন্ন অপরাধে মামলা রয়েছে বা মামলা ছিল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাত প্রার্থীর বিরুদ্ধে ১০টি মামলা চলমান রয়েছে। এছাড়া দলটির ৫৪ মেয়র প্রার্থীর বিরুদ্ধে চলমান কোনো মামলা না থাকলেও অনেকেই রয়েছেন যারা আগে ফৌজদারি মামলায় খালাস পেয়েছেন। অন্যদিকে বিরোধী দল বিএনপির ১৯ মেয়র প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো মামলা না থাকলেও ৩৯ মেয়র প্রার্থীর মাথায় ঝুলছে ১৬৫ মামলা। এদের মধ্যে যশোরের মনিরামপুর পৌরসভার মেয়র প্রার্থী শহীদ মো. ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৯টি। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভার প্রার্থী ফারুক আহম্মেদের বিরুদ্ধে ১৪টি, নেত্রকোনার দুর্গাপুরের প্রার্থী জামালউদ্দিনের বিরুদ্ধে ১২টি, নড়াইল পৌরসভার প্রার্থী জুলফিকার আলীর বিরুদ্ধে ১০টি মামলা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিএনপি প্রার্থীদের বিরুদ্ধে থাকা বেশিরভাগই রাজনৈতিক মামলা। এটাও লক্ষ করার মতো বিষয় বটে।

সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠতে পারে পৌরসভায় জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হতে চাওয়া ব্যক্তিরা স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে কতটা অভিজ্ঞ এবং দায়বদ্ধ। তৃণমূলের রাজনীতিতে আগে এলাকায় দীর্ঘদিন রাজনীতি করা নেতা আর শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসকদের মতো পেশাজীবীদের প্রাধান্য ছিল। সেখানে ইতিমধ্যেই আধিপত্য বিস্তার করেছেন ব্যবসায়ীরা। আরও লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতাও তুলনামূলকভাবে কম। আওয়ামী লীগের চারজন মেয়র প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা স্বশিক্ষিত, একজন অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন, দুজন অষ্টম শ্রেণি পাস, একজন নবম শ্রেণি পাস, ছয়জন এসএসসি এবং ১৪ জন এইচএসসি পাস। বাকি ৩০ প্রার্থী উচ্চশিক্ষিত। আওয়ামী লীগের ৪৯ শতাংশ প্রার্থীই উচ্চশিক্ষিত। অন্যদিকে বিএনপির স্বশিক্ষিত প্রার্থী পাঁচজন। পঞ্চম শ্রেণি পাস একজন, অষ্টম শ্রেণি পাস দুজন, দশম শ্রেণি পাস একজন এবং এসএসসিতে অকৃতকার্য একজন। এছাড়া নয়জন এসএসসি এবং ১৭ জন এইচএসসি পাস।

জাতীয় রাজনীতির ধারা যে স্থানীয় রাজনীতিতে ছায়া ফেলবে এটাই স্বাভাবিক। তৃতীয় ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ব্যবসায়ীদের আধিপত্য সম্ভবত তারই দৃষ্টান্ত। স্মরণ করা যেতে পারে কিছুদিন আগে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছিল যে, একাদশ জাতীয় সংসদে ৬১ শতাংশ সাংসদ ব্যবসায়ী। রাজনীতিবিদ রয়েছেন মাত্র ৫ ভাগ। বাকি ৩৪ শতাংশের মধ্যে আইনজীবী ১৩ ভাগ ও অন্যান্য পেশার রয়েছেন ২১ ভাগ। অথচ দেশের প্রথম সংসদে মাত্র ১৮ শতাংশ সদস্যের পেশা ছিল ব্যবসা। জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে পৌরসভা পর্যন্ত বেশিরভাগ জনপ্রতিনিধিই যদি ব্যবসায়ী হন সেটা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য খুব আশাব্যঞ্জক নয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত