স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে দেশের মানুষের অভিযোগের বেশিরভাগই হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত। বিশেষত সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিপুলসংখ্যক রোগীর তুলনায় চিকিৎসক, নার্স ও চিকিৎসা-সহায়ক স্বাস্থ্যকর্মীর অপ্রতুলতা সব সময়ই চোখে পড়ে। এর সঙ্গে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে কতটা গভীর সংকটে নিমজ্জিত করেছে তা করোনা মহামারীর মতো দুর্যোগে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া গেছে। এমনকি যখন এসব অনিয়ম এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তখন অভিযুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীরা তার বিরুদ্ধে নিজেদের স্বার্থরক্ষা করতে হাসপাতালের রোগীদের চিকিৎসা সেবাকে জিম্মি করে ফেলে। এমনই এক দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে।
দেশ রূপান্তরে গত শনিবার ‘পঙ্গু হাসপাতালেই থাকতে মরিয়া নার্স সিন্ডিকেট’ শীর্ষক প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের একাধিক বদলির আদেশ অমান্য, নোটিস বোর্ড ভেঙে নোটিস ছিঁড়ে ফেলা, নার্স সুপারিনটেনডেন্টের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া, পোস্টার সাঁটিয়ে কুৎসা রটনাসহ একটার পর একটা গুরুতর অনিয়ম করে চলেছে পঙ্গু হাসপাতালে কর্মরত নার্সদের একটি অংশ। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের সামনে গত এক মাস ধরে এই বিশৃঙ্খলা চললেও হাসপাতাল প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো হাসপাতাল পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ওই সিন্ডিকেটের পক্ষ নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি গুরুতর অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে বদলির আদেশ পাওয়া সাতজন নার্সকে পুনর্বহাল করতে নার্সিং অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে অনুরোধও করা হয়েছে। এই সব নার্সের কেউ কেউ ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে বিভিন্ন ওয়ার্ডের ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ নিয়ম অনুযায়ী দুই বছরের বেশি কেউ একই ওয়ার্ডে ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। জানা যায়, দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করায় ওইসব ওয়ার্ড ইনচার্জরা হাসপাতালে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। সরকারি ওষুধ বিক্রি করে দেওয়া, রোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায়সহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এমনকি কয়েকবার ধরা পড়লে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লঘু শাস্তিও দিয়েছিল। পঙ্গু হাসপাতালে প্রায় ৪০০ নার্স কর্মরত। তাদের দায়িত্বে রয়েছেন দুজন সুপারিনটেনডেন্ট (সেবা তত্ত্বাবধায়ক)। এছাড়া ১৮ জন নার্সিং সুপারভাইজার রয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী নার্সরা নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে। তাদের নিয়োগ, পদায়ন, বদলি সবকিছুই এই অধিদপ্তর থেকে পরিচালিত হয়। অপরদিকে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন।
দেশের শীর্ষ পর্যায়ের পঙ্গু হাসপাতালটিতে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি জাঁকিয়ে বসেছে। হাসপাতালটিকে ঘিরে দালাল চক্রের অপতৎপরতা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নানা রকম দুর্নীতির সংবাদ গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। আর এই দুর্নীতির চিত্রটি শুধু পঙ্গু হাসপাতালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর তথ্যানুযায়ী জানা যায়, সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৫% দুর্নীতি হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে, ২৪.৯% জেনারেল হাসপাতালে ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০.৭%।
করোনা মহামারীতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া এবং করোনা প্রতিরোধে জনগণের স্বাস্থ্য সচেতনতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দেশের চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের ভয়াবহ অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনাও পরিলক্ষিত হয়েছে। এখন এই খাতটিতে ভয়াবহ জনবল সংকট রয়েছে। আইসিডিডিআর’বি ও ব্র্যাকের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০,০০০ মানুষের জন্য বাংলাদেশে মাত্র ৫.৪ জন ডাক্তার ও ২.১ জন নার্স রয়েছেন। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি ১০০০ মানুষের জন্য মাত্র ০.৫৮ জন চিকিৎসক-নার্স ও ধাত্রী রয়েছেন। এই অনুপাত প্রতি হাজারে অন্তত ২.৫ জন হলেও স্বাস্থ্যসেবা চলনসই বলে মেনে নেওয়া যেত। এই বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের ৫৮টি সংকটাপন্ন দেশের মধ্যে একটি বলে চিহ্নিত। স্বাস্থ্য জনবলের এই ঘাটতি অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতির পরিচায়ক। এই অপ্রতুল জনবলের সঙ্গে যদি অনিয়ম ও দুর্নীতি সংযুক্ত হয়, তাহলে দেশের জনস্বাস্থ্য আরও বড় ধরনের সংকটের সম্মুখীন হবে, সেটা বলাই বাহুল্য। এক্ষেত্রে শুধু জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা বাড়ালেই দুর্নীতি প্রতিরোধ করা যাবে না। পাশাপাশি পরিকল্পিত পর্যালোচনা ও নজরদারির ব্যবস্থার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে কভিড-১৯ মোকাবিলাসহ অন্য যেকোনো ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষ যাতে যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে যেকোনো মূল্যে। অর্থনীতি ও সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ গত এক দশকে যে উন্নতি করেছে, করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে তা ইতিমধ্যে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সময় থাকতেই যদি স্বাস্থ্য খাত সংস্কার করা না যায়, তবে ক্ষতি হবে আরও গভীর ও সুদূরপ্রসারী।
