চলমান শৈত্যপ্রবাহে রাজধানীর ছিন্নমূল মানুষের রাত কাটে খড়কুটোর আগুন জ্বালিয়ে এবং দিন যায় সূর্যের তাপে। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, জেঁকে বসা শীতে জবুথবু ছিন্নমূল এসব মানুষ। তাদের দেখার কেউ নেই। শীতের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে জেগে থাকেন তারা।
একটু উষ্ণতা পেতে গরম কাপড়ের অপেক্ষায় পথ চেয়ে নির্ঘুম রাত কাটান তারা। কেউ কেউ গরম কাপড় নিয়ে এলেও সবার ভাগ্যে জোটে না। ভোরে ঢাকো ঢাকো সূর্যের দেখা মিলতেও অপেক্ষা করেন তারা।
রাতে দেখা যায়, কেউ পেতেছেন বিছানা, কেউবা বিছানা ছাড়াই শুয়ে পড়েন সড়কে, ফুটপাতে, গাছের তলায় ও ব্রিজের নিচে। তাদের কেউ কেউ শ্রমজীবী, কেউবা নিতান্তই অসহায়। এভাবেই শীতের প্রতিটি রাত কাটছে দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের।
সদরঘাট, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, শ্যামলী, কমলাপুর রেলস্টেশন, আজিমপুর করবস্থান, গুলিস্তান এলাকা এবং বস্তিগুলো ঘুরে আরও দেখা যায়, রাতের হিমশীতল ঢাকার আকাশের নিচে শুয়ে আছেন অসংখ্য ছিন্নমূল মানুষ। যার কাছে যতটুকু কাপড় আছে তা দিয়ে শীত নিবারণের বৃথা চেষ্টা করছেন। তারা বলছেন, করোনাভাইরাসে তাদের মধ্যে বেকাত্বের সংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুণ। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে তাদের। অসুস্থতায় ভুগছেন অনেকে। অতিরিক্ত ঠাণ্ডা, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশিসহ হৃদরোগে এ সময় অনেকে মারাও যান। যাদের মধ্যে বেশির ভাগ প্রবীণ ও শিশু। শীতের দুর্ভোগের ফলে তাদের এখন বেঁচে থাকাই দায়।
রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানের ফুটপাতে শরীরে একটা চাদর জড়িয়ে শুয়ে আছেন একজন। পাশে আট বছরের একটি মেয়ে। কাছে গিয়ে জানা গেল তার নাম রোকেয়া। শুয়ে থাকা নারী তার মা। কিছুদিন ধরে অসুস্থ। রোকেয়া জানায়, ছন্নছাড়া জীবন তাদের। করোনার আগে মা যখন যে কাজ পেতেন, তা দিয়েই চলত। আমি ফুল বিক্রি করতাম। একটু সামনে যেতেই মসজিদের কোলে মশারি দিয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যায় অনেককে। তাদের মধ্যে একজন আজাদ (৪৭)। তিনি জানান, কাজ করতেই আইছিলাম শহরে। রাত-দিন শহরের গলি গলি ঘুরেও কাজ পান না। শীত বাড়ছে। আর এখন শরীর খারাপ। শীতের জন্য একটা জ্যাকেট ছাড়া কিছুই নেই। ঠাণ্ডা সহ্য করতে না পেরে রাতে না ঘুমিয়ে বসে থাকেন। অপেক্ষা করেন কেউ যদি একটা কম্বল নিয়ে আসে!
রাজধানীর পান্থপথ মোড় হয়ে গ্রিন রোডে দেখা যায় আজাদ ও রোকেয়াদের মতো আরও অনেকেই শুয়ে আছেন। যারা রাত জেগে শীত নিবারণের চেষ্টা করছিলেন। হাইকোর্ট মাজার গেটে এবং বিজয় সরণি গিয়ে দেখা যায়, সেখানে অবস্থানরতদের প্রায় সবাই নির্ঘুম। তাদের কয়েকজন জানান, রাত বাড়ার সঙ্গে শীত বাড়তে থাকে। রাস্তায় কাপড় বিছিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করেও সম্ভব হচ্ছে না। কারণ নিচে থেকে যে ঠাণ্ডা ওঠে তাতে শরীরে বরফের ঠাণ্ডা অনুভূত হয়। যার কারণে নিরুপায় হয়ে বসে আছেন তারা।
রাজধানীর ছিন্নমূল মানুষের খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যায়, অনেকে নিজ উদ্যোগে এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষে শীত পোশাক বিতরণ করছে। মিরপুর রোডের ঢাকা কলেজের আশপাশে কম্বল বিতরণ করতে দেখা যায় ঢাকা কলেজ ছাত্রকল্যাণ ফাউন্ডেশনের সদস্যদের। এ সময় সংগঠনটির চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, অপ্রিয় হলেও সত্য শুধু বক্তব্য এবং সংবাদপত্রের মাধ্যমে গরিব-দুঃখী মানুষের কথা বলা হয় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সহযোগিতার জন্য কেউ এগিয়ে আসে না। যদি এগিয়ে আসত তাহলে এত শীতের মধ্যে কাউকে শীতের পোশাক না থাকার কারণে রাতে ফুটপাতে কষ্ট করে রাত যাপন করতে হতো না। সমাজের এলিট শ্রেণি অথবা ধনী লোক তারা যদি এই শীতার্ত মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায় এবং জাকাত দেয় তাহলে বাংলাদেশে গরিব থাকার কথা না।
ভবঘুরে ও নিরাশ্রয় ব্যক্তি (পুনর্বাসন) আইন-২০১১তে বলা হয়েছে, ভবঘুরে, ভিক্ষুকদের আশ্রয়, পুনর্বাসন, চিকিৎসাসহ অন্যান্য দায়দায়িত্ব বহন করবে সরকার। কিন্তু এই আইনের বাস্তবায়ন নেই বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নেহাল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মতে দেশে একেবারে ছিন্নমূল মানুষ রয়েছে ৫০ হাজার। আর প্রতি বছর এই সংখ্যা বাড়ছে দুই হাজার করে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই ছাঁটাই হচ্ছে। সব মানুষ তো আর চুরি করতে পাওে না। বাড়ি ভাড়াসহ নানা খরচ। দিনে আনে দিন খায় তাদের অবস্থা তো আরও নাজুক। তারাই মূলত ভিক্ষাবৃত্তিতে নেমেছে। ভিক্ষুক-হিজড়াদের জন্য আইন থাকলেও আইনের শাসন নেই কিংবা আইন থাকলেও এর প্রয়োগ নেই। সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সীমাবদ্ধতাও আছে।
অন্যদিকে সরকারি তথ্য অনুযায়ী ঢাকার ৩ হাজার ৩৯৪টি বস্তিতে সাড়ে ছয় লাখ মানুষ বাস করে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) করা রিপোর্টের ভিত্তিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে বস্তির সংখ্যা ১ হাজার ৬৩৯টি। মোট খানা ১ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪০টি। এসব বস্তিতে ৪ লাখ ৯৯ হাজার ১৯ জন মানুষ থাকে। অপর দিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১ হাজার ৭৫৫টি বস্তিতে মোট খানা ৪০ হাজার ৫৯১টি। সেখানে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৬ জন বসবাস করে।
