সাক্ষাৎকার, টক-শো, ল্যারি কিং

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০১:৩২ এএম

মাইকেল জ্যাকসনকে অপরাহ উইনফ্রে সাক্ষাৎকার দিতে রাজি করালেন। মাইকেল জ্যাকসন আগের চৌদ্দ বছর কোনো সাক্ষাৎকার দেননি, কাউকেই নয়। তার মানে এই নয় যে তিনি প্রচারবিমুখ ছিলেন, তিনি বরাবরই মিডিয়ায় থাকতে চেয়েছেন। জ্যাকসনের নেভারল্যান্ড র‌্যাঞ্চ থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩ অপরাহর নেওয়া সাক্ষাৎকারটি তখনই টেলিভিশনে দেখেছেন ৯০ মিলিয়ন দর্শক। একটি চ্যানেলে দেখা সাক্ষাৎকারের দর্শকের সংখ্যার এটাই বিশ^রেকর্ড। এর কাছাকাছি দ্বিতীয় অবস্থানের সাক্ষাৎকারটির দর্শক ২০ মিলিয়ন কম। এটি বারবারা ওয়াল্টারের নেওয়া ক্লিনটনের ‘জিপারগেট’ কেলেঙ্কারির নায়িকা মনিকা লিউইনস্কির সাক্ষাৎকার। চতুর্থ স্থানে ডেভিড ফ্রস্টের নেওয়া রিচার্ড নিক্সনের সাক্ষাৎকার, ৪৫ মিলিয়ন দর্শক। ষষ্ঠ অবস্থানে বিবিসির মার্টিন বশিরের নেওয়া তখনকার প্রিন্সেস অব ওয়েলস ডায়ানার সাক্ষাৎকারটির তাৎক্ষণিক ২৩ মিলিয়ন দর্শকের আমিও একজন ছিলাম। মার্টিন বশির অত্যন্ত নিষ্পৃহভাবে ছোট ছোট বাক্যে প্রশ্ন করে যাচ্ছিলেন। ডায়ানা ভণিতা না করে জবাব দিয়েছেন। এমনকি যখন জিজ্ঞেস করলেন বিয়েবহির্ভূত কোনো সম্পর্কে জড়িয়েছেন কি না এবং অন্য কারও শয্যাসঙ্গী হয়েছেন কি না তিনি স্বীকার করলেন, ‘হ্যাঁ’। মার্টিন কোনো রকম পান্ডিত্যপূর্ণ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেননি, ডায়ানা সম্পর্কে কোনো কাগজে কি পড়েছেন এসবও বলেননি, কিন্তু তার অত্যন্ত সহজ সাধারণ প্রশ্নের ধারই অবলীলায় সত্যটি বের করে এনেছে। আমার প্রিয় আর একজন সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ছিলেন ডেভিড ফ্রস্ট। আমি দীর্ঘদিন ‘ব্রেকফাস্ট উইথ ডেভিড ফ্রস্ট’ দেখেছি এবং বিচিত্র পেশার বিভিন্ন মানুষের কথা শুনেছি। ডেভিড ফ্রস্টকেও সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন, আপনি যেসব ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেন তাদের সম্পর্কে নিশ্চয়ই অনেক হোমওয়ার্ক করেন। তিনি জবাব দিলেন, মোটেও না। তিনি যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাদের কারও কারও সম্পর্কে তার সামান্য ধারণাও ছিল না। তাহলে এত ভালো ভালো প্রশ্ন কেমন করে করেন? এর উত্তর : সাক্ষাৎকারদাতাই প্রশ্নের জোগান দেন। সাক্ষাৎকারদাতাকে তার নিজের সম্পর্কে এবং তিনি কী বলতে চান সে সম্পর্কে বলার সুযোগ দিন, তিনিই আপনার হাতে একটার পর একটা প্রশ্ন তুলে দেবেন।

২৩ জানুয়ারি ২০২১ প্রয়াত হলেন ৮৭ বছর বয়স্ক বিশ^খ্যাত সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ল্যারি কিং। তিনি কি সাক্ষাৎকারদাতা এবং তার বিষয় সম্পর্কে গবেষণা করে তৈরি হয়ে ক্যামেরার সামনে বসতেন? তার জবাবেও ডেভিড ফ্রস্টের প্রতিধ্বনি। একেবারেই না। প্রস্তুতি দরকার হলে সাক্ষাৎকারদাতা নিতে পারেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে নিতে হবে কেন? তার অন্য এক সহকর্মী বললেন, এক ঘণ্টার ‘ল্যারি কিং লাইভ’ চালিয়ে বাকি ২৩ ঘণ্টা তো তিনি খবরের কাগজ পড়া, টেলিভিশন দেখা, বইপত্র নাড়াচাড়া করাএসবের মধ্যেই থাকেন। সে কারণে তিনি সারাক্ষণই প্রস্তুত।

ফ্রস্ট ও ল্যারি কিং দেখতে দেখতে এবং পুরনো আমলের ওয়াল্টার ক্রংকাইট, মাইকেল পার্কিনসন প্রমুখের নেওয়া কিছু সাক্ষাৎকার দেখে আমাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীদের নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ পেশ করার তাগিদ অনুভব করি। আমাদের যেগুলো টক-শো, সেগুলোও সাক্ষাৎকারেরই অনুষ্ঠান। বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় কথা বলতে কখনো কখনো আমিও গিয়েছি। ল্যারি কিংয়ের মৃত্যুর পর তার নেওয়া কয়েকটি সাক্ষাৎকার এবং অন্য সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নেওয়া তার কয়েকটি সাক্ষাৎকার দেখে কয়েকটি বিষয়ও সামনে আনা আবশ্যক মনে করছি। ক. সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী তার অতিথি সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন কিংবা যে বিষয়ে আলাপ হবে তিনি সে বিষয়ে পন্ডিত এমন একটি ধারণা দর্শককে কেন দেবেন? তিনি যদি সবই জানেন তাহলে একজন বা একাধিক অতিথি আমন্ত্রণ করার কী দরকার? খ. উত্তরদাতা যা-ই বলুন না কেন তাকে জবাবদিহি করতে হবে দর্শকশ্রোতার কাছে, সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর কাছে নয়; কাজেই সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী তার পছন্দের কথা উত্তরদাতার মুখ দিয়ে বলাতে কেন চেষ্টা করবেন? গ. সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর আক্রমণাত্মক প্রশ্ন করার প্রয়োজন আছে কি না? কিংবা এ ধরনের প্রশ্ন সত্য উদ্ধারে সহায়তা করে কি না? (ওরিয়ানা ফ্যালাসি মাপের সাক্ষাৎকারীর বেলায় হয়তো এ প্রশ্নটি আসবে না কারণ তার ‘অ্যাগ্রেসিভ স্টাইল’ তাকে পরিচিত করে তুলেছিল।) ঘ. ‘ট্রিকি কোয়েশ্চেন’ কি অনিবার্য? ঙ. সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী সরকারের মুখপাত্র নন, এমনকি তার চাকরিদাতার মুখপাত্রও নন। তাহলে তাকে উদ্দেশ্যমূলক প্রশ্ন কেন করতে হবে?

ল্যারি কিং যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, যে কটা বিষয় উপস্থাপন করা হলো সম্ভবত তাদের কেউই ল্যারি কিংকে এ প্রশ্নগুলো করবেন না। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নিজের সম্মানীটুকু ছাড়া আর পাওয়ার কিছু নেই। সুতরাং তার অতিথিকে ঘায়েল করতে তাকে উঠেপড়ে কেন লাগতে হবে?

এক ইতালীয় সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী তার স্বদেশি বিখ্যাত ওরিয়ানা ফ্যালাসির সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তাকে প্রশ্ন করলেন : আপনার দ্বিতীয় গর্ভপাতে যে সন্তানটির মৃত্যু হলো তার বাবা কে? ওরিয়ানা প্রশ্ন শুনে যখন চটে গেলেন, সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী বললেন, আমি আপনার টেকনিকটাই আপনার ওপর প্রয়োগ করলাম। ‘কে, কী, কেন, কোথায়, কখন, কীভাবেএগুলো মৌল প্রশ্ন, কিন্তু মূল কাজটা যে ‘শোনা, শোনা এবং শোনা’ এটা উপেক্ষিত হলে কোনো প্রশ্নের সঠিক জবাব আসবে না। সাক্ষাৎকার প্রদানকারী কী, কোন মতাবলম্বী, কোন তরিকা, কোন মাজহাব তিনি যদি নিজে থেকে না বলেন তাকে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ইচ্ছামতো (এমনকি তা সত্যি হলেও) তার ওপর একটি ট্যাগ লাগিয়ে দিতে পারেন না অন্তত ল্যারি কিং দেখে আমার তা-ই মনে হয়েছে।

সাক্ষাৎকার নেওয়ার টেক্সট বইগুলোর একটি মৌলিক শিক্ষা : উত্তরদাতার জবাব আপনার পছন্দ হওয়া মোটেও জরুরি কিছু নয় অপছন্দ হলেও তার সঙ্গে গায়ে পড়ে বিতর্কে যাবেন না। বিতর্কের বলি হবেন সাক্ষাৎকার গ্রহীতা নিজেই, কারণ তিনি তখন তার ফোকাস থেকে সরে যাবেন, যেভাবে অনুষ্ঠানটিকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা ভেবেছিলেন, তা আর হয়ে উঠবে না। ল্যারি কিং জানতেন তার নেওয়া সাক্ষাৎকারটি কেবল উত্তরদাতা ও তার বিষয় নয়, টেলিভিশন পর্দার সামনে বসে আছেন কয়েক মিলিয়ন দর্শক। তারা কেউই আহাম্মক নন। অনেকেই তাদের দুজনের চেয়ে বেশি জ্ঞানী। এখানে যোগ্যতার চেয়ে বেশি পন্ডিত সাজা দুজনের জন্য ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে। সঠিক সময়ে সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক প্রশ্ন করতে পারাটাই সাফল্য।

ল্যারি কিং পরোক্ষভাবে হলেও এটা শেখাচ্ছেনতিনি যার সাক্ষাৎকার নিতে যাচ্ছেন তিনি প্রেসিডেন্ট হোন (ল্যারি প্রেসিডেন্ট ফোর্ড থেকে শুরু করে ট্রাম্প প্রত্যেকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন) কিংবা তন্দুরি রেস্তোরাঁর শেফ তিনি একই মর্যাদায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, একইভাবে কথা বলেছেন। কোনো কোনো অনুষ্ঠানে গদগদ হওয়া ভক্তি, অভিধানের সবচেয়ে ভারী বিশেষণ ব্যবহার, তোষামুদে কথা সাক্ষাৎকারটির গুরুত্ব কমিয়ে দেয়। ক্ষতি করে দুজনেরই। এসব কথা মানুষ বিশ্বাস করতে চায় না।

হালে আর একটি প্রবণতা দেখা গেছে, পরিচিতি পর্বে বলা হচ্ছে : তিনি অমুক বিশেষজ্ঞ, তমুক বিশেষজ্ঞ। তাতে জবাবদাতা কেউ কেউ সন্তুষ্ট হলেও বিব্রত হন অনেকেই। ল্যারি কিং যে ভাষায় তার এমনকি বিশ্বখ্যাত অতিথিকেও পরিচয় করিয়ে দিতেন তাতে ‘সুপারলেটিভ’ পারতপক্ষে ব্যবহার করেননি। ডেভিড ফ্রস্ট উত্তরদাতার সঙ্গে কথা বলার সময় সতর্ক থাকতেন যেন তা কোনো রাজনৈতিক দলকে বাড়তি সুবিধে প্রদান করে। ল্যারি কিং উত্তরদাতার মুখ থেকে কথা এমনভাবে বের করতেন যে উত্তরদাতা নিজে এক্সপোজড হতেন কিন্তু ল্যারি কিং নিজেকে প্রকাশ করতেন না। নিজেকে প্রকাশ করার মতো মূর্খতা লালন করতেন না বলেই তিনি একজন ল্যারি কিং, একজন ডেভিড ফ্রস্ট, একজন অপরাহ উইনফ্রে।

এ কালের আরও কজন সেরা সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ও টক-শো অ্যাঙ্করের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। হাওয়ার্ড স্টার্ন, ডেভিড লেটারম্যান, জনি কার্সন, জন স্টুয়ার্ট, মার্ক ম্যারন, ল্যারি স্যান্ডার্স, স্টিফেন কোলবার্ট, কোনান ও’ ব্রেইন, জেরেমি প্যাক্সম্যান, স্টিফেন ফ্রাই, জোনাথন রস, এমা থম্পসন, ডেভিড মিশেল, জিমি ফ্যালন, ক্রেইগ ফার্গুসন, টম স্নাইডার, এলেন ডিজেনারেস, বিল মাহের, জিম কিমেল, জ্যাক পার, মাইক ডগলাস, জোয়ান রিভার্স, মর্টন ডাউনি, ক্রেইগ কিলবর্ন, জে লেনো প্রমুখ।

ল্যারি কিং পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। নিজে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন মাত্র কয়েকটি। তার সাক্ষাৎকার থেকে তার জীবনের কিছু বিষয় তুলে ধরা হবে, খানিকটা তার জবানিতে, খানিকটা অন্যদের। খানিকটা বিভিন্ন শোতে বলা তার কথার মিশেলের অনুসৃতি : পাঁচ বছর বয়স থেকে আমি রেডিওতেই থাকতে চেয়েছি, আমি রেডিওর ঘোষক হতে চেয়েছিলাম। আর তা যদি হতে না পারি তাহলে স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান। মাইক্রোফোন হাতে যা কিছু করতে হয় আমি তাই করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কেন বলতে পারব না। আমার নিশ্চয়ই বয়ঃসন্ধিপূর্ব স্বরটি ভালোই ছিল। লোকজন আমাকে বলতে থাকেন তোমার রেডিওতে থাকা উচিত। তখন আমি রেডিওর শো অনুকরণ করে কথা বলতে শুরু করি ... শব্দ ও ধ্বনি আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে, এখনো তা-ই করে। আমি ব্রুকলিনের অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান। আমি এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়িয়েছি, কলেজে যাইনি। আমার বাবা যখন হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন আমি খুব ছোট, নয় বছর। আমাকে টিকে থাকার জন্য অনেক ধরনের কাজ করতে হয়েছে।

ঘটনাচক্রে সিবিএসের একজন ঘোষকের সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেলে তিনি পরামর্শ দিলেন, ফ্লোরিডা চলে যাও, ওখানে মিডিয়া মার্কেট গড়ে উঠছে, অভিজ্ঞতা না থাকলেও সেখানে সম্প্রচারের কাজ পাওয়া যাবে। তিনি মিয়ামি (ফ্লোরিডার প্রধান শহর) চলে গেলেন এবং দু-একটি প্রাথমিক ধাক্কা সয়ে নেওয়ার পরপরই একটি ছোট রেডিও স্টেশনে (তখনকার নাম ডব্লিউএএইচআর এখন ডব্লিউএমবিএইচ) দপ্তরির কাজ পেলেন। ঝাড়পোছ আর ফুটফরমাস খাটা দিয়ে নতুন জীবনের সূত্রপাত, কদিনের মধ্যেই একজন ঘোষক বিদায় নেওয়ার পর তাকেই মাইকের সামনে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো। তিনি তো এটাই চাইছিলেন। ১ মে ১৯৫৭ তার কণ্ঠের প্রথম সম্প্রচার। তিনি হলেন ডিজে ডিস্ক জকি সকাল ৯টা থেকে দুপুর পর্যন্ত; দুদিন বিকেলে সংবাদ পাঠ এবং ক্রীড়া সংবাদ পরিবেশন। বেতন সপ্তাহে ৫০ ডলার।

একেবারে শুরুতেই প্রথম দিনই হাতে সময় মাত্র পাঁচ মিনিট। রেডিও স্টেশনের একজন বস এসে বললেন, তোমার নাম দিয়ে চলবে না। তার নাম ল্যারি জিগার। লরেন্স হার্ভে জিগার; মা লিথুয়ানিয়ার ইহুদি নারী জেনি গিটলিজ, বাবাও ইহুদি ইউক্রেনের এডওয়ার্ড জিগার। জীবন-সংগ্রামে আরও অনেকের মতো তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের অভিবাসী। জিগার নামে জাতিসত্তার পরিচয় উঠে আসে। নিরপেক্ষ নাম চাই। কী নাম হবে এ নিয়ে ভাবার সুযোগ নেই, মাকেও জিজ্ঞেস করার সময় নেই। তার টেবিলের সামনে সেদিনের পত্রিকা মিয়ামি হেরাল্ডে একটি পূর্ণ পাতার বিজ্ঞাপন ‘কিংস গোলসেল লিকুয়ার’। বিজ্ঞাপনটির ওপর দুজনেরই চোখ পড়ল। বস বললেন, ‘কিং! ল্যারি কিং হলে কেমন হয়?’ ব্যস, তিনি হয়ে গেলেন ল্যারি কিং। ল্যারি কিং লাইভ-পরবর্তী সময়ে টানা ২৫ বছর চলেছে, জনপ্রিয়তা শেষ মুহূর্তেও পড়েনি।

তিনি বললেন, প্রথম দিন খুব বিচলিত ছিলেন। মাইক্রোফোনের সামনে যখন বললেন, ‘আমার নাম ল্যারি কিং’ তার বিচলিত দশা কাটতে শুরু করল ‘আমি আর কখনো নার্ভাস হইনি। ৮৬ বছর বয়সেও পূর্ণোদ্যমে কাজ চালিয়ে যাওয়া ল্যারি কিং বললেন, তিনি ভাগ্যবান কারণ তিনি জানেন তার বয়সী অনেকেই বেঁচে নেই, যারা বেঁচে আছেন তাদের অধিকাংশই হাত গুটিয়ে রেখেছেন। তিনি ৬৩ বছর রেডিও এবং টেলিভিশন নিয়ে কাটিয়েছেন। অজস্র সাংবাদিক সেলেব্রিটি ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বের ভিড়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ‘জায়ান্ট’। ‘ক্যাজুয়াল’ হয়েও যে প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা যায়, উত্তরের পিঠে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়াল্যারি কিং তা-ই দেখিয়েছেন। তার দীর্ঘ সময়ের নির্বাহী প্রযোজক ওয়েন্ডি ওয়াকার বলেছেন, ল্যারিকে কোনো অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত করাটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ, কোনোভাবে তাকে ক্যামেরার সামনে নিয়ে যেতে পারলেই কাজ শেষ। প্রস্তুত হয়ে যাওয়ার মানুষ তিনি নন, কারণ তিনি সব সময়ই প্রস্তুত অথবা অপ্রস্তুত অবস্থায় শুরু করাটাই তার স্টাইল। ইউএসএ টুডেতে তিনি টানা কুড়ি বছর কলাম লিখেছেন। তিনি সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকেও এন্টারটেইনার মনে করতেন। কিন্তু তিনি কেমন করে জায়ান্ট হয়ে উঠলেন? তার সহজ উত্তর, শুনে আর অনুকরণ করে। ‘আমি অনেক কথা বলি, আমি মানুষকে হাসাতে ভালোবাসি।’

ল্যারি কিং প্রশ্নকারীর মূর্খতার কথা বলেছেন, আমি কিছু সংবাদ সম্মেলন দেখেছি, সেখানে প্রশ্নগুলো উত্তরের চেয়ে বড়। সেগুলো আসলে লোকদেখানো ব্যাপার। একবার নিউ ইয়র্কার আমাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে আমার প্রশ্নকে বলল, ‘স্ট্রিট কোয়েশ্চেন’আমি রাস্তার মানুষ, তুমি কী করছ?

‘যখন গাল্ফ যুদ্ধ শুরু হলো, প্রতি রাতে জেনারেল, রাজনীতিবিদ, লেখক বহু বিচিত্র মানুষ স্টুডিওতে আসতে শুরু করলেন, আমি সবাইকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে শুরু করতামআজ কী ঘটল?... আমি উকিলের চেয়ে বেশি আইন জানি না, রাজনীতিবিদের চেয়ে বেশি রাজনীতি বুঝি না, আমি কখনো কোনো পদের জন্য দৌড়াইনি, আমি কখনো জুরির সামনে মামলা নিয়ে যুক্তি দিতে যাইনি, ডাক্তারের চেয়ে ভালো চিকিৎসা জানি না, আমি সাধারণ মানুষ, আমি ভীষণ কৌতূহলী মানুষ, আমি পড়াশোনা করিনি, বিজ্ঞান পড়িনি।’ কৌতূহল থেকে যে প্রশ্নের জন্ম হয়েছে, তিনি সে প্রশ্নই জিজ্ঞেস করেছেন। কৌতূহলই তার সাংবাদিকতা। পান্ডিত্যের ভান নয়, খুব সাদামাটা কিছু প্রশ্নই তাকে ল্যারি কিং বানিয়েছে। ল্যারি কিং একজনই। লেখক

সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত