শাহজালাল বিমানবন্দর

অপরাধ রোধে বসছে ২১৫ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০৩:২৪ এএম

কঠোর নজরদারির আওতায় আসছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এরই অংশ হিসেবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তৎপরতা জোরদারের পাশাপাশি বিমানবন্দরে প্রায় ২১৫ কোটি টাকার উন্নতমানের সরঞ্জাম বসানো হচ্ছে। এর মধ্যে বিস্ফোরক শনাক্তে দুটি ভেহিক্যাল ও হিউম্যান স্ক্যানার এবং ৩৮১টি অত্যাধুনিক ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে এসব সরঞ্জামের অনুকূলে অর্থ ছাড় পেতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও কাস্টম হাউজ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়েছে। চলতি মাসের মধ্যেই সরঞ্জামাদি কিনে স্থাপন করার আশা করছে বেবিচক।

এ বিষয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস  মার্শাল এম মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শাহজালালসহ দেশের সবকটি বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাড়ানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে শাহজালালে সিসি ক্যামেরাসহ উন্নতমানের যন্ত্রপাতি স্থাপনে আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার চেষ্টাও করা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিমানবন্দর ব্যবহার করে চোরাচালান হতে দেওয়া হবে না। বেবিচক বা অন্য কোনো সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চোরাচালানে জড়িত থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরঞ্জাম স্থাপনের পর দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ও নজরদারি বাড়ানো হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাদক ও সোনা কারবারিরা শাহজালাল, শাহআমানত ও ওসমানী বিমানবন্দর ব্যবহার করছে। তারা ইয়াবা, হেরোইনের পাশাপাশি নতুন মাদক অ্যামফিটামিন মধ্যপ্রাচ্য, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করছে। গার্মেন্টস পণ্য ও কাঁচামাল রপ্তানির আড়ালে দেদার মাদক এবং সোনা পাচার করা হচ্ছে। কার্গো ভিলেজ এলাকায় মালামাল তল্লাশি না করেই খালাস করা হচ্ছে। শাহজালালে উচ্ছৃঙ্খল ও বহিরাগতদের সঙ্গে আঁতাত করে দীর্ঘদিন এসব অপকর্ম চালাচ্ছেন বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের কতিপয় সদস্য। ফলে আইন প্রয়োগকারী ৩০টি সংস্থা নানা কৌশল অবলম্বন করেও তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। অভিযোগ রয়েছে, শাহজালালে যে কেউ প্রবেশ করতে পারে। যাত্রী ও দর্শনার্থীদের শরীর-লাগেজ সঠিকভাবে তল্লাশি এমনকি স্ক্যানারগুলো তদারকি করা হয় না।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, সম্প্রতি শাহজালালসহ দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরে চোরাচালানের ঘটনা বেড়ে গেছে। প্রায় প্রত্যেক ফ্লাইটেই মাদক ও সোনার বার আসছে। চোরাচালানের অভিযোগে বেশ কয়েকটি উড়োজাহাজ জব্দ করা হয়েছে। গার্মেন্টস মালামালের সঙ্গে মাদক আনা হচ্ছে। অপরাধীদের চিহ্নিত করাসহ বিমানবন্দরের নিরাপত্তা জোরদারে এপিবিএন কাজ করছে। নিরাপত্তা বাড়াতে আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

বর্তমানে দেশি-বিদেশি প্রায় ৩০টি সংস্থা বাংলাদেশে তাদের ফ্লাইট পরিচালনা করছে এবং ৪৭টি দেশের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে। প্রতিদিন ২৫-৩০ হাজার যাত্রী যাওয়া-আসা করছেন শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে। তবে এ বিমানবন্দরের দুর্বল নিরাপত্তা নিয়ে সম্প্রতি কয়েকটি সংস্থা প্রতিবেদন দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, লোডাররা বিমান থেকে মালামাল নামানোর সময় পাচারের ঘটনা ঘটাচ্ছে। লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড শাখাতেও অপরাধচক্র গড়ে উঠেছে। যাত্রী পরিবহনকে কেন্দ্র করে ট্যাক্সিচালক ও দালালদের হাতে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা। পর্যটকদের সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে।

বেবিচক, পুলিশ ও কাস্টমসের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিমানবন্দরের সোনা, মাদক, মোবাইল চোরাচালান, রাজস্ব ফাঁকি রোধে গোয়েন্দা নজরদারি, অর্থ পাচার রোধ, মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি পণ্য জব্দ এবং পরিবেশ সুরক্ষায় এনবিআর ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে প্রায় ২১৫ কোটি টাকার সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। এসব সরঞ্জামের মধ্যে শাহজালালে ১১টি ব্যাগেজ স্ক্যানার, দুটি ভেহিক্যাল স্ক্যানার, ৯টি হিউম্যান স্ক্যানার, ৬টি প্যালেট স্ক্যানার, ৮০টি আইপি ক্যামেরা ও ৬টি আর্চওয়ে মেটাল ডিটেক্টর কেনা হবে।

শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে বছরে প্রায় ৪০ লাখ আন্তর্জাতিক ও ১০ লাখ অভ্যন্তরীণ যাত্রী এবং ৩ লাখ টন ডাক ও মালামাল আমদানি-রপ্তানি হয়। ফ্লাইট সংখ্যা বিবেচনায় কাস্টমস হলে ৪টি অত্যাধুনিক ব্যাগেজ স্ক্যানিং মেশিন, ৩টি হিউম্যান স্ক্যানার, আগমনী হলে টিভি মনিটরিংয়ের জন্য ৫০টি অত্যাধুনিক আইপি ক্যামেরা, বিমানবন্দরে কর্মরত এবং বিভিন্ন এয়ারলাইনস সংস্থায় কর্মরত স্টাফরা ৪ নম্বর স্টাফ গেট দিয়ে প্রবেশ এবং বের হওয়ার সময় ২টি ব্যাগেজ স্ক্যানিং মেশিন ও হিউম্যান স্ক্যানার এবং ৬টি আইপি ক্যামেরা, হ্যাঙ্গার গেটে ১টি ভেহিক্যাল স্ক্যানার, ১টি আর্চওয়ে মেটাল ডিটেক্টর, এয়ার ফ্রেইট ইউনিটিতে ৩টি প্যালেট স্ক্যানার এবং ১টি ব্যাগেজ স্ক্যানার, কুরিয়ার ইউনিটে ১টি প্যালেট স্ক্যানার, ১টি হিউম্যান স্ক্যানার, ১টি ব্যাগেজ স্ক্যানার এবং ১টি আর্চওয়ে মেটাল ডিটেক্টর, পদ্মা গেটে ১টি ভেহিক্যাল স্ক্যানার ও ১টি হিউম্যান স্ক্যানার স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আর ইভিএস, ইউভিএসএস, হিউম্যান, ভেহিক্যাল, অ্যান্টি এক্সপ্লোসিভ কনটেইনারের যন্ত্রাংশ বাড়ানো হচ্ছে। চোরাকারবারিদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত