দুই বছর মেয়াদে হাতে নেওয়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) চাঁনখারপুল মার্কেট নির্মাণ প্রকল্পটি এখনো মাটির নিচে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ারও পরও শুধুমাত্র বেইসমেন্ট নির্মাণ করে বসে আছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। এরইমধ্যে আরও আড়াই বছর আগেই দোকান বরাদ্দ দিয়ে ২৮১ জন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় ১৪ কোটি টাকা সালামি নিয়েছে ডিএসসিসি। কিন্তু নির্ধারিত সময় তো দূরের কথা, অতিরিক্ত দুই বছর পরও কাজের অবস্থা দেখে হতাশ দোকান বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তিরা। প্রকল্পটির কাজ শেষ করতে ডিএসসিসির পক্ষ থেকেও কোনো জোরালো ভূমিকা চোখে পড়ছে না দাবি করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এসব ভুক্তভোগী।
ডিএসসিসি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাঁনখারপুল মার্কেটের কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের ২ অক্টোবর। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে ২ বছর মেয়াদ বেঁধে দিয়ে তা শেষ করতে বলা হয় ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর। ১২ তলা ভিত্তির ওপর ৬ তলা ভবনে হবে ২৮১টি দোকান। ভবনটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। প্রতিটি দোকানের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে আয়তনভেদে ১১ থেকে ১২ লাখ টাকা। এরইমধ্যে দুই দফা কিস্তির মাধ্যমে ডিএসসিসির রাজস্ব বিভাগ ৫ লাখ টাকা করে আদায়ও করেছে বরাদ্দগ্রহীতাদের কাছ থেকে। সে হিসেবে বরাদ্দ গ্রহীতাদের কাছ থেকে করপোরেশনের সালামি আদায়ের পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি টাকার মতো। আর ভবনটি নির্মাণের দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েট লিমিটেড’ ইতিমধ্যে করপোরেশন থেকে ১৩ কোটি টাকা বিলও তুলে নিয়েছে। কিন্তু তারা তুলে নেওয়া বিলের সমপরিমাণ কাজ করেনি বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্মাণাধীন মার্কেটটিতে দোকান বরাদ্দ পাওয়া একজন ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে প্রায় ১২ হাজার টাকা বর্গফুট হিসেবে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নিচতলা আর দ্বিতীয় তলা ছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও বাজারদর এতটা হয় না। আমরা যারা ৫/৬ তলায় দোকান পেয়েছি, তাদের ১০০ বর্গফুটের দোকানের জন্য প্রায় ১২ লাখ টাকা দিতে হচ্ছে।’
ইতিমধ্যে দোকান বরাদ্দের সালামি হিসেবে ডিএসসিসিকে ৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন জানিয়ে ওই ব্যবসায়ী আরও বলেন, ‘কিন্তু দোকানের কোনো অস্তিত্ব নেই। চাঁনখারপুল মার্কেট নির্মাণের জায়গায় গিয়ে দেখলাম বেইসমেন্ট করা হয়েছে। পিলারের ওপর থাকা রডগুলোয় জং ধরেছে। বর্তমানে কাজও বন্ধ রয়েছে। কিন্তু বাকি কাজ কবে শেষ হবে এমন প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।’
এদিকে ভবনটি নির্মাণের দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েট লিমিটেড’ ইতিমধ্যে করপোরেশন থেকে ১৩ কোটি টাকা বিল তুলে নিলেও এর সমপরিমাণ কাজ করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। ডিএসসিসির একজন প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাজের বিল দেওয়া হয় স্তরগুলো হিসাব করে। সেখানে যে পরিমাণ কাজ হয়েছে তাতে ২৫-২৮ ভাগের বেশি বিল দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ঠিকাদার প্রায় অর্ধেক বিল তুলে নিয়েছে। এখন কাজ না করে নানা অজুহাত দিচ্ছে। বিধিবিধান অনুযায়ী করপোরেশন ঠিকাদারের সঙ্গে থাকা চুক্তি বাতিল করে অন্য কাউকে দিয়েও কাজ শেষ করতে পারে। এক্ষেত্রে প্রকল্পের ব্যয় বাড়লে তা বর্তমানে যারা কাজ করছে তাদের কাছ থেকে আদায় করারও আইনগত সুযোগ রয়েছে।’
দুই বছর মেয়াদের চাঁনখারপুল মার্কেট নির্মাণ প্রকল্প চার বছরেও শেষ না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা দোকান পেয়েছেন তাদের এখনো বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকাও নেওয়া হয়েছে। তারা (ব্যবসায়ী) দোকান পেতে দৌড়ঝাঁপ করছেন। বিষয়টি নিয়ে কর্র্তৃপক্ষও ভাবছে কীভাবে সুরাহা করা যায়।’
আর প্রকল্পের কাজ শেষ না করার বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েট লিমিটেডের মালিক স্বপন চৌধুরীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। পরে ম্যাসেজ পাঠানো হলে তিনি হাসপাতালে অবস্থান করছেন জানিয়ে একটি বার্তা পাঠান। এছাড়া একই বিষয়ে জানতে ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট অঞ্চল-৩ এর নির্বাহী প্রকৌশলী তৌহিদ সিরাজের মোবাইল ফোনেও একাধিকবার কল করা হলে তিনিও ধরেননি।
