কলারোয়ায় শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলা

বিএনপির সাবেক এমপি হাবিবসহ সব আসামির সাজা

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০২:২৭ এএম

দেড় যুগ আগে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলার মামলায় বিএনপির সাবেক এক সংসদ সদস্যসহ ৫০ আসামির সবাইকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সাতক্ষীরার মুখ্য বিচারিক হাকিম হুমায়ুন কবীর জনাকীর্ণ এজলাসে আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। দণ্ডিতদের মধ্যে সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের তৎকালীন বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য হাবিবুল ইসলাম হাবিব এবং বিএনপিকর্মী আরিফুর রহমান ও রিপনকে সর্বোচ্চ ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কলারোয়া উপজেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদের বাচ্চুকে ৯ বছরের এবং বাকি ৪৬ আসামিকে ২ থেকে ৭ বছরের সাজা দিয়েছে আদালত। আসামিদের মধ্যে কারাগারে থাকা ৩৪ জন রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বাকি ১৬ জনকে পলাতক দেখিয়ে এ মামলার বিচারকাজ চলে। দণ্ডিতরা সবাই বিএনপির নেতাকর্মী।

ধর্ষণের শিকার চিকিৎসাধীন এক মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীকে দেখতে ২০০২ সালের ৩০ আগস্ট সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে যান তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সড়ক পথে ঢাকায় ফেরার সময় কলারোয়া উপজেলা বিএনপির অফিসের সামনে একটি বাস দিয়ে রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করে তার গাড়িবহরে হামলা হয়। বোমা বিস্ফোরণ ও গাড়ি ভাঙচুরের পাশাপাশি শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলিও ছোড়া হয়। এতে শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতাসহ দলের স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাংবাদিকরা আহত হন। ওই ঘটনায় কলারোয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মোসলেম উদ্দিন থানায় মামলা করতে গেলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এ পরিস্থিতিতে সাতক্ষীরার আদালতে নালিশি অভিযোগ করেন কলারোয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের কমান্ডার মোসলেম উদ্দিন। আদালত অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গণ্য করতে কলারোয়া থানাকে নির্দেশ দেয়। ওই মামলা খারিজ হয়ে যাওয়ার পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০১৪ সালের ১৫ অক্টোবর মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হয়। তদন্ত শেষে পুলিশের পরিদর্শক শফিকুর রহমান বিএনপির সাবেক সাংসদ হাবিবুল ইসলাম হাবিবসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। হত্যাচেষ্টা, বিস্ফোরকদ্রব্য ও অস্ত্র আইনের আলাদা ধারায় দেওয়া তিনটি অভিযোগপত্রের মধ্যে হত্যাচেষ্টা মামলার রায় হলো গতকাল। যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে গত ২৭ জানুয়ারি রায়ের জন্য ৪ ফেব্রুয়ারি দিন রাখেন বিচারক। সেদিনই জামিনে থাকা ৩৪ আসামির জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানো হয়। বাকি দুটি মামলা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন বলে জানিয়েছেন সাতক্ষীরা আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুল লতিফ।

গতকাল রায় ঘোষণার পর অসন্তোষ প্রকাশ করেন আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী এবং আসামি বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুল ইসলাম হাবিবের স্ত্রী শাহনাজ পারভিন বকুল। রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘এটা সাজানো। আমরা হাইকোর্টে যাব। আমরা সেখানে নিশ্চয়ই ন্যায্য বিচার পাব।’

রাষ্ট্রপক্ষে এ মামলা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এসএম মুনীর রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমরা সন্তুষ্টও না, অসন্তুষ্টও না। রায় পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’

এদিকে রায় ঘিরে গতকাল সকাল থেকেই সাতক্ষীরার আদালত এলাকায় পুলিশের বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়। গণমাধ্যমকর্মীরাও রায়ের সংবাদ সংগ্রহের জন্য আদালতে উপস্থিত হন। এছাড়া মামলার আসামিরা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী হওয়ায় বিষয়টি জেলাজুড়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করে। অন্যদিকে মামলার ভিকটিম সাবেক বিরোধীদলীয় নেতা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ দলটির নেতাকর্মীরা। ফলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যেও মামলার রায়কে ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ ছিল। দুই দলই রায়ের প্রতিক্রিয়ায় পাল্টাপাল্টি মিছিল করে। রায়ের পর আদালতের বাইরে বিক্ষোভ মিছিল করেন কলারোয়া বিএনপির নেতাকর্মীরা। আর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা সেখানে আনন্দ মিছিল করেন। তবে সহিংস কোনো ঘটনা ঘটেনি।

সাজা হলো যাদের : দণ্ডিতদের মধ্যে কারাগারে থাকা আসামিরা হলেন সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা হাবিবুল ইসলাম হাবিব, আশরাফ হোসেন, নজরুল ইসলাম, মো. আবদুর রাজ্জাক, শেখ তামিম আজাদ মেরিন, মো. আবদুর রকিব মোল্যা, মো. আক্তারুল ইসলাম, মো. আবদুল মজিদ, মো. হাসান আলী, ময়না, মো. আবদুস সাত্তার, তোফাজ্জেল হোসেন সেন্টু, মো. জহুরুল ইসলাম, গোলাম রসুল, অ্যাডভোকেট মো. আবদুস সাত্তার, আবদুস সামাদ, মো. আলতাফ হোসেন, শাহাবুদ্দিন, মো. সাহেব আলী, সিরাজুল ইসলাম, রকিব, ট্রলি শহীদুল, মো. মনিরুল ইসলাম, শেখ কামরুল ইসলাম, ইয়াছিন আলী, শেলী, শাহিনুর রহমান, দিদার মোড়ল, সোহাগ হোসেন, মাহাফুজুর মোল্লা, আবদুল গফফার গাজী, রিঙ্কু, অ্যাডভোকেট মো. আবদুস সামাদ এবং টাইগার খোকন ওরফে বেড়ে খোকন।

আর পলাতক আসামিরা হলেন আবদুল কাদের বাচ্চু, মফিজুল ইসলাম, মো. আলাউদ্দিন, খালেদ মঞ্জুর রোমেল, আরিফুর রহমান, রিপন, ইয়াছিন আলী, রবিউল ইসলাম, মাজাহারুল ইসলাম, আবদুল খালেক, আবদুর রব, সঞ্জু, নাজমুল হোসেন, জাবিদ রায়হান লাকী, কনক ও মো. মাহাফুজুর রহমান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত