কোভিডিয়ট কোভিডিভোর্স কোভিডেভিল

আপডেট : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১১:০৭ পিএম

১১ মার্চ ২০২০ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাসকে প্যান্ডেমিক ঘোষণা করল। এপিডেমিক অবশ্য মহামারী, প্যান্ডেমিককে তো মহামারী বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে না, কারণ এটা বিশ^ব্যাধি। কেউ কেউ অতিমারীও লিখছেন। ‘মহা’ বড় না ‘অতি’ বড় এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। অতিচালাকের গলায় দড়ি পড়তেই পারে, মহাচালাক কখনো বিপদে পড়েছে শুনিনি। সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে যাদের কারবার, শব্দগুলো তাদের অতিপরিচিত। করোনাভাইরাস সংক্রমণ বা কভিড-১৯ ব্যাধি পৃথিবীকে তছনছ করে দিয়েছে। বাংলা ভাষী অঞ্চলকে এতটুকু ছাড় দেয়নি। এই ব্যাধি এতটাই গভীরে প্রোথিত হয়েছে যে, প্যান্ডেমিক, কোয়ারেন্টাইন এবং লকডাউনের মতো কঠিন শব্দও বাংলা ভাষায় আত্তীকৃত হওয়ার পথে। রক্ষণশীল অভিধানপ্রণেতারা তা ঠেকাতে আপ্রাণ চেষ্টা করবেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

টোয়েন্টি টোয়েন্টি নিয়ে আমাদের আহ্লাদের সীমা ছিল না। কিন্তু বছরের শুরুতেই মৃত্যুর ভাইরাস ঘণ্টা বাজিয়ে দিল; ছুঁলেই মৃত্যু এই আতঙ্কে প্রিয়জনের লাশ দেখতেও কেউ এগোয়নি। পৃথিবীকে থামিয়ে দিতে শাটডাউনও করা হলো কিন্তু ভাইরাসটি নিজের আকার ও চরিত্র বদলে ঘাতকব্যাধি হিসেবে রয়েই গেল। এপিডেমিক ছিল মহামারী। ‘মহা’যোগে মহাকাব্য হয়েছে, মহাকবি হয়েছে, মহাকাল হয়েছে। মহাগুরু, মহাজন, মহাসড়ক, মহানগর, মহানন্দ, মহাপাপ, মহাঘাতক, মহাপুরুষ, মহাপ্রয়াণ, মহাপ্রস্থান মহাবীর, মহামহিম, মহাবিদ্যা, মহাবৈদ্য, মহাভারত, মহাযজ্ঞ, মহারথ, মহারাজ, মহারানী মহাসমুদ্র, মহাশঙ্খ, মহাশে^তা এবং অবশ্যই মহাশয় মহাপ্রলিপ্ত শব্দগুলোর ‘মহা’ উচ্ছেদ করে ‘অতি’ সংযুক্ত করলে গুণপনা সামান্যও বাড়ে না বরং শ্রুতিবিরক্তি উৎপাদনকারী কিছু শব্দ তৈরি হয়। মহামানব ও অতিমানবের কথা আলাদা, দুটোই ভালো শোনায়। একইভাবে অতিপ্রাকৃত কাহিনী আর যাই হোক মহাপ্রাকৃত হতে পারে না। অতিভক্তিতে চোরের প্রমাণ মিলে, মহাভক্তি কি আদৌ আছে? অনাবৃষ্টি আছে, অতিবৃষ্টি আছে, মহাবৃষ্টি বলে কিছু নেই নাকি আছে? অতিরিক্ত আছে, অতিরঞ্জিত আছে। অতিশয়োক্তি আছে, মহাশয়োক্তি কি নেই? এপিডেমিকের চেয়ে প্যান্ডেমিক যে অনেক বড় কিছু এ নিয়ে ইংরেজি ভাষীর যেমন কোনো সন্দেহ নেই, বাংলা ভাষীও জানেন এপিডেমিক হচ্ছে আঞ্চলিক প্রকোপ আর প্যান্ডেমিক হচ্ছে বৈশি^ক প্রকোপ। অতি অতিষ্ঠ করতে জানবে, কিন্তু অতিমারী যে বৈশি^ক তা কি জানে? বিশ^ব্যাধি কভিড-১৯ ইংরেজি ভাষাকে আগের চেয়ে অন্তত শত শব্দ ধনী করেছে। শতশব্দের কিছু অভিধানে ঢুকে পড়েছে আর কিছু ঢুকি ঢুকি করছে।  অতিমারী এসেছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে কিন্তু তা কেমন করে প্যান্ডেমিকের বাংলা হলো! কিন্তু অতিমারীতে প্যান্ডেমিকের ভয়াবহতা ও বিশালত্ব কল্পনায় ধরা দেয় কি না আমি সন্দিহান। যারা শব্দ প্রজনন করে থাকেন বিশ্বব্যাধিটির একটি অধিকর গ্রহণযোগ্য বাংলা শব্দ উপহার দিতে পারেন।

* * *

কোভিডিভোর্স এবং কোভিড বিয়ার্ড শব্দ দুটোর সঙ্গে ইংরেজির পাঠক এর মধ্যেই পরিচিত হয়েছেন বাংলায় কী হবে? কোভিতালাক কিংবা কভিদাড়ি! স্বামী-স্ত্রী নিজেদের মধ্যে বিরোধ এড়াতে কিংবা পরস্পরকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে ঝগড়ায় না গিয়ে সমঝোতার মাধ্যমে কিছু সময়ের জন্য বিচ্ছেদে সম্মত হন, অবশ্য বাংলাদেশে এই চর্চা এখনো শুরু হয়নি এর নাম নেগোশিয়েটিভ সেপারেশন। সমঝোতার শর্ত মেনে স্বামী রয়ে গেলেন সান ফ্রান্সিসকো, স্ত্রী চলে গেলেন লুক্সেমবার্গ। কিন্তু করোনাকালের শাটডাউন তো আকাশের করিডর বন্ধ করে দিয়েছে। এমনকি নিজের শহরেও ভিন্ন জায়গায় যাওয়ার সুযোগ কম। কোথায় যাবেন? আপনাকে করোনাভাইরাস পজিটিভ সন্দেহ করে কেউ স্বাগত জানাবে না। সুতরাং স্বামী-স্ত্রী একত্রেই থাকছেন এবং সম্পর্কটা তিক্ত হতে হতে ডিভোর্স তালাকে গিয়ে ঠেকেছে। কভিড-১৯-এর কারণে বাধ্যতামূলক সহবাস (সব সহবাসই উত্তেজনা নয়, এর মানে একসঙ্গে থাকা) তালাকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্যই এর নাম কোভিডিভোর্স।

গৃহবন্দি জীবনে নিত্যকার শেভ কী দরকার? খোঁচা খোঁচা কিছু দাড়ি থাকলইবা। মাস্ক তো ঢেকেই রাখছে, সমস্যা নেই। দাড়ি বাড়ছে, বাড়ছে। এক দিন হঠাৎ আয়নায় দেখলেন বাহ বেশ তো। শেভ করার ঝামেলায় গিয়ে কাজ কী, দাড়িটা থেকেই যাক।

কভিডের কারণে এই যে দাড়ি তার নামই কোভিবিয়ার্ড। দাড়ি অবশ্যই মাস্কের বিকল্প নয়, নাক ও মুখ ডেকে রাখতে হবে, দাড়িও। সেজন্যই বাজারে এসেছে বিয়ার্ড মাস্ক। আরও একটি শব্দ কোভিডিয়ট এ পর্যন্ত বাংলা লিখনে কোথাও পাইনি। কোভিডিয়ট যে ইডিয়ট বা আহাম্মক তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কোভিডিয়টরা নভেল করোনাভাইরাসকে মোটেও পাত্তা দেয় না, মাস্ক পরতে চয় না, স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে চায় না, কভিড প্রটোকল মানে না, নিজেকে ভাইরাসের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী মনে করে, এই প্যান্ডেমিককে সামান্য সর্দি-কাশি বলে উড়িয়ে দেয়, রুমের ভেন্টিলেটরকে আইসিইউর ভেন্টিলেটর মনে করে, ‘নো ব্রা’ আন্দোলন আর ‘নো মাস্ক’ আন্দোলন একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। বাংলা বাক্যে হামেশাই ইডিয়ট শব্দটি ব্যবহার করলেও বাংলা অভিধান শব্দটিকে আত্তীকৃত করেনি, কাজেই কোভিডিয়টকে গ্রহণ করবে মনে করার কারণ নেই। তবু একটা উদাহরণ দেওয়া যাক! তুমি যাচ্ছো মন্ত্রীর ভাষণ শুনতে, তুমিও দেখছি তারই মতো কোভিডিয়ট। কিংবা কোভিডিয়টটা শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউজ ছেড়েছে। বাংলাদেশে রিপাবলিকান কম বলেই ট্রাম্পকে স্বাচ্ছন্দ্যে গালটা দিতে পারলাম। শালা কোভিডিয়ট।

কোভিটিয়ট (বিশেষ্য) যিনি জনস্বাস্থ্য রক্ষার পরামর্শ উপেক্ষা করেন। তার মানে করোনামুক্ত পৃথিবীতেও কোভিডিয়ট শব্দটি অসুখ-বিসুখ অগ্রাহ্যকারী আহাম্মকদের বেলায় ব্যবহার করা যাবে। কোভিডিয়ট বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে, সে ক্ষেত্রে বিশেষ্য কোভিডিয়সি। আপনি দেখছি একটা কোভিডিয়ট, গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়েছেন কেন? সোশ্যাল ডিসট্যান্স না মানা লোককে কোভিডিয়ট বলে গাল দিতে সমস্যা নেই।

কোভিডিয়টের আরও কিছু উদাহরণ মিলেছে। সুপার মার্কেট থেকে যারা টয়লেট পেপার ‘আতঙ্ক-ক্রয়’ করে বাড়িতে মজুদ করেছে, তারা কোভিডিয়ট। বাংলাদেশে হঠাৎ ডক্সিসাইক্লিনের হাহাকার পড়ে গেল। কভিড চিকিৎসায় যারা বেশি বেশি কিনেছেন নিঃসন্দেহে তারা কোভিডিয়ট। কিন্তু শাহেদ-সাবরিনা-আরিফ-শারমিন তাদের কী বলবেন? নির্দ্বিধায় বলা যায় কোভিডেভিল। মানুষে শরীরের ভোগান্তিকে পুঁজি করে যারা বাণিজ্য করছে, তারা অবশ্যই কোভিডেভিল। কোভিডিয়ট, কোভিডেভিল, কোভিডিভোর্স শব্দগুলোর লৈঙ্গিক পক্ষপাত বা ‘জেন্ডার বায়াস’ শব্দগুলো ধর্মনিরপেক্ষও বটে, এমনকি ক্ষমতাসীন কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি ইঙ্গিতপূর্ণও নয়।

কোয়ারেন্টাইনে থাকা যত ঝুঁকিরই হোক, কোয়ারেন্টাইন শব্দটি গীতিময়। এই সুন্দর শব্দটিকে সরাসরি অভিধানে নিয়ে নেওয়া যায়। সংকট অভিধানকে শব্দদান করে। ১৯৭১-এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় বাংলাদেশের জীবনে আসেনি, আসার সম্ভাবনাও নেই। যদি জিজ্ঞেস করা হয় ১৯৭১-এর এই মহাকাব্যিক সময়ে বাংলা ভাষায় কোন কোন শব্দের জোগান দিয়েছে, যা ১৯৭২ বা ১৯৭৩ বা ১৯৭৪ সালে বাংলা অভিধানে সংযুক্ত হয়েছে উত্তর দেওয়া মুশকিল হয়ে যাবে। প্রথম মহাযুদ্ধকালে ১৯১৮ প্রকাশিত অক্সফোর্ড এবং মেরিয়াম-ওয়েবস্টার ডিকশনারি ৫২৪টি নতুন শব্দ বা শব্দপুঞ্জ অভিধানে অন্তর্ভুক্ত করেছে। প্রথম মহাযুদ্ধে উদ্ভূত কয়েকটি শব্দ হচ্ছে : ডিভ্যালু, মাস গ্রেইভ, ব্রেকথ্রু, স্টর্মট্রুপার, ডগ-ট্যাগ, লাইফস্ক্যান, ট্রাবলশুটার, এক্সট্রোভার্ট এবং ইন্ট্রোভার্ট (এই দুটো শব্দ যুদ্ধের নয়, ১৯১৮ সালের মনস্তাত্ত্বিক শব্দ)।

ডগ-ট্যাগ মানেটা আমাদের জানা নাও থাকতে পারে। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় আমেরিকান সৈন্যদের গলায় একটি ধাতব ট্যাগে সৈনিকের নাম ও আইডেন্টিফিকেশন নম্বর লেখা থাকত। রণাঙ্গনে মৃত্যু ঘটলে যাতে ডগ-ট্যাগ থেকে সৈনিককে শনাক্ত করা সহজ হয়, সেজন্যই এটা লাগানো। কখনো যদি দেশরক্ষায় আমাদের সৈনিকের গলায় এই ট্যাগ পরাতে হয়, আমরা কি এটাকে বাংলায় অনুবাদ করতে যাব চেয়ারকে কেদারা বলে আরও দুর্বোধ্য করে তুলব? অভিধান ঘেঁটে দেখুন ট্যাগ শব্দটির বাংলা ব্যাখ্যা আছে, এক শব্দের ভালো কোনো বাংলা নেই। সুতরাং আপৎকালের শব্দ, যা বহুজন ব্যবহৃত স্বচ্ছন্দে অভিধানে ঢুকে যেতে পারে; অবশ্য অভিধানপ্রণেতাদের গোঁড়ামি ব্যাপারটাও তো মাথায় রাখতে হবে। অপেক্ষায় থাকলাম আমার ব্যবহৃত শব্দ বিশ^ব্যাধি না ওপার থেকে আসা অতিমারী অভিধানভুক্ত হয়। প্যান্ডেমিক এখন বাংলা একাডেমির ইংরেজি অভিধানভুক্ত, মানে ‘সমগ্র দেশ বা মহাদেশ ব্যাপ্ত (ব্যাধি)’; এত দীর্ঘ নয়, এক শব্দে এর ব্যাপকতা ও বিস্তৃতি বোঝানার মতো শব্দ চাই। বিশ^ব্যাধির এ কাল কবে ফুরোবে জানা নেই ইংরেজি অভিধান শব্দ খুঁজে বেড়ায়, শব্দ ভাষাকে সমৃদ্ধ করে। দেখা যাক বাংলা অভিধান কটা শব্দ গ্রহণ করে!

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত