স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীবর্ষে এসে বাংলাদেশ অর্থনীতির শনাক্তযোগ্য বৈশিষ্ট্য যা পাই- কৃষিনির্ভরতা থেকে শিল্প স্বপ্ন দর্শন, পল্লীপরায়ণতা থেকে নগরযাত্রা, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যাকে বেকারত্বের বেড়াজাল থেকে বের করে আনার অনায়াসলব্ধ প্রয়াস, অসম্ভব কেন্দ্রমুখী এবং নিয়ন্ত্রিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, ব্যষ্টিবিহীন সামষ্টিকতা, পুষ্টি ধৈর্য ও লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষমতা অক্ষমতার দোলাচলে দোদুল্যমান। স্বকল্প স্ববিরোধিতা বিদ্যমান গণতান্ত্রিক বোধ ও বিশ্বাসে এবং আচার ও আচরণে, নগর ও গ্রামীলণ আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের, কৃষিভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে শিল্প উৎপাদনের, ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধানে আর কথা ও কাজের গরমিলে। যে দেশের সিংহভাগ মানুষ এখনো দরিদ্র, যে দেশের সব আর্থসামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড এখনো বহিরাগত নানান নীতিনির্দেশ নিয়ন্ত্রণের নিগড়ে, পরশ্রীকাতরতায় পুষ্ট আর আত্মসমালোচনায় রুষ্ট সে অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসা-বাণিজ্য বা শিল্প উদ্যোগকে অর্থনীতির মূল ধারায় আনতে এবং সার্বিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে উদ্যোগ বা প্রয়াসগুলোর সুরতহাল সুখকর হতে চেয়েও পারেনি, পারছে না। বাংলাদেশের জনমিতি বিভাজনে দেখা যায় শতকরা ৪৫ ভাগ জনগোষ্ঠী দরিদ্র বা নিম্নবিত্তের বলয়ে, প্রায় সমসংখ্যক শতকরা ৪৫ ভাগ ক্ষুদ্র ও মাঝারি (মধ্যবিত্ত) পর্যায়ের অর্থনৈতিক অবস্থানে, আর উচ্চ ও অতিউচ্চবিত্তে বাকি ১০ ভাগ। দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের মধ্যকার সমীকরণ সতত পরিবর্তনশীল। দরিদ্র বা নিম্নবিত্তকে মধ্যবিত্তে উন্নীতকরণের ধারা আপেক্ষিকতায় আকীর্ণ যদিও অত্যন্ত মন্থর গতিতে ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু মধ্যবিত্ত যতটা না উচ্চবিত্তে ঊর্ধ্বগামী তার চেয়ে নিম্নবিত্তে নিম্নগামিতার শঙ্কা ও প্রবণতা বেশি। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর ও জনবহুলতার ভারে ন্যুব্জমান অর্থনীতিতে গ্রামীণ জনস্রোতের দ্রুত নগরাভিমুখিতা গ্রামীণ অর্থনীতিকে তো বটেই, সার্বিক সামাজিক সংহতিকে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ঠিক এ সময় মহামারী করোনা বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়েছে। নিম্নবিত্তকে মধ্যবিত্তের বলয়ে আনতেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পবিকাশ ভাবনা। এসএমই সেক্টরের প্রধান কাজই হচ্ছে দরিদ্রদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে আনার প্রয়াস। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আর্থিকভাবে কর্ম-উদ্যোগী ও সৃজনশীল তৎপরতায় শামিল করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-উদ্যোগে তাদের অন্তর্ভুক্তিকরণের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল সব দেশেই সনাতন ব্যাংকিং পদ্ধতি এখনো ‘যার টাকা আছে তাকেই টাকা দেওয়া’র নীতিতে পরিচালিত হয়। করোনা মোকাবিলায় সরকার যে বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-উদ্যোক্তাদের মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ বিতরণ বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে দেখা যাচ্ছে সেই শর্তসাবুদের বেড়াজালে তা আটকে গেছে। অথচ বড়দের জন্য বরাদ্দ ৩০ হাজার কোটি বিলিবণ্টন হলেও ব্যাংকগুলো থেকে মেজ ও ছোটদের টাকা মেলেনি। কারণ বেশ স্বাভাবিক। বাণিজ্যিক ব্যাংকের ধ্রুপদী লক্ষ্যমাত্রাই হচ্ছে যেন যার দরকার নেই তাকে টাকা কর্জ দাও। সিংহভাগ দরিদ্রের টাকার বা পুুঁজির প্রয়োজন অথচ তাকে সহজশর্তে টাকা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা এখনো হয়নি। করোনাকাল প্রলম্বিত হচ্ছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারিরা দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাচ্ছে আর বড়রা সহজ শর্তে টাকা পাওয়ার সুযোগও নিতে পেরেছে আবার সেই টাকা শোধ না করবার অজুহাত ও মওকা পাচ্ছে বা পাবে। সম্প্রতি inclusive growth বা ‘অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে উন্নয়ন’ একটি নতুন ধারণা হিসেবে এলেও এটা যে অর্থায়ন বা ব্যাকিং পদ্ধতির মাধ্যমে করা হবে সেটা অত্যন্ত পুরাতন। পুঁজি ও ভোগবাদী আদর্শের দ্বারা লালিত বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা সুপরিকল্পিতভাবে নিম্ন ও মধ্যবিত্তকে নয় ‘উচ্চবিত্তকে অর্থায়নের ব্যাপারেই’ আগ্রহী। এমতাবস্থায় এ অর্থনীতির স্বতঃসিদ্ধ স্বভাব আর অশুভ সংঘবদ্ধতার (সিন্ডিকেট) বলয় থেকে নিম্নবিত্তকে মধ্যবিত্তে বিচরণ বিহারের সুযোগকে কীভাবে বাঙ্ময় করা যাবে তা ভাববার বিষয় বৈকি। করোনার ক্রান্তিকালে এ প্রশ্ন ও প্রসঙ্গটি আরও তীব্রভাবে উঠে আসছে। পক্ষান্তরে বড়দের উন্নয়নের চোখ ঝলসানো পরিবেশে প্রচার প্রগলভতায় মেজ-ছোটদের দীর্ঘশ্বাস দেখা ও শোনা স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে।
পুঁজিপ্রবাহ প্রকৃত বিনিয়োগে না গিয়ে বেহাত হলে একই পুঁজি বিপরীত বা বিরূপ ফলাফল উপস্থাপন করতে পারে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ব্যয় অর্থনীতিতে পাবলিক সেক্টরের বিনিয়োগ, কিন্তু এডিপির অর্থ ব্যয় যদি প্রকৃত অর্থে সমষ্টির উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় না হয়ে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা গোত্রের স্বার্থ উদ্ধারে বেহাত হয় তাহলে সেই বিনিয়োগ মুদ্রাস্ফীতিসহ দুর্বৃত্তায়নের, পাচারের পৃষ্ঠপোষকতায় নিবেদিত হয়। প্রকৃত কৃষক স্বল্প সুদের কৃষিঋণের সমুদয় টাকা নিজ হাতে না পেয়ে মধ্যস্বত্বভোগী, দালাল, ফড়িয়া এবং ব্যাংকের লোন ডিসবার্সকারীর দুর্নীতির দুর্বিপাকে পড়ে নানান বাধা-বিপত্তি মেটাতে গিয়ে যথাসময়ে টাকা না পেয়ে এ টাকা তার প্রকৃত উৎপাদনের কাজে লাগাতে পারেনি। উপরন্তু, নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বীজ ও সারের অপ্রতুলতার কারণে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় তার ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি। ফলে বকেয়া পড়ে গেছে। এমনও দেখা গেছে ৭৫০০ টাকা কৃষিঋণ নেওয়া হয়েছে ১৯৮৮ সালে। খাতক ১৯৯৯ সালে মারা গেছেন। ২০১১ সালে কৃষি ব্যাংক থেকে খাতকের ঠিকানায় প্রায় ৯৮ হাজার টাকা বকেয়া (সুদ আসলসহ) দাবি করে নোটিস জারি করা হয়েছে। খাতকের বিধবা স্ত্রী এবং বেকার সন্তানরা এ নোটিস পেয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। ব্যাংক থেকে জানানো হয়েছে এ ঋণ অবলোপন কিংবা মাফ করার পদ্ধতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক নীতিনির্দেশনার আলোকে সহজসাধ্য নয়। যতদূর জানা যায় ১৯৮৮ সালে খাতক এ টাকা নিয়েছিলেন ব্যক্তিগত এবং কৃষিতে বিশেষ কাজের জন্য। তাছাড়া সে টাকা পেতে খাতককে কিছু বাড়তি খরচও করতে হয়েছিল। এমনকি সে টাকা তার কৃষি উন্নয়নে বীজ ও সার সংগ্রহে ব্যবহার হয়েছিল কি না মরহুমের পরিবারের সদস্যরা তা জানতেও পারেননি।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে উদ্যোক্তা পুঁজি ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের মতো কর্মপরিকল্পনা ও ভাবনায় বিগত ৫ দশকে বেশ কিছু সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগ গৃহীত হলেও সেটি যথা সাফল্যের মুখ দেখতে পায়নি। এসব কর্মউদ্যোগের বাস্তবায়নের অগ্রগতিও অত্যন্ত মন্থর। এতদিন বা এ পর্যন্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-উদ্যোক্তার সংজ্ঞার আওতা নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-উদ্যোক্তাদের বস্তুগত উন্নয়ন সাধন সম্ভব হয়নি। ইতিমধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-উদ্যোক্তাদের স্বার্থ এবং এর বিকাশ ভাবনায় নিবেদিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসএমই ফাউন্ডেশন গঠিত হয়েছে। কিন্তু নীতিনির্ধারণ, পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের ক্ষেত্রে এ ফাউন্ডেশনের পক্ষে বশংবদ সীমাবদ্ধতার দেয়াল টপকানো পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। সনাতন ব্যাংকিং পদ্ধতি, অপর্যাপ্ত পুঁজির প্রবাহ এবং নীতিনির্ধারণগত যূথবদ্ধতার কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-উদ্যোক্তারা প্রাণ পেয়েও হালে পানি পায়নি। দেশের বহু বিলাসবহুল বিত্তশালী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এবং এখনো হচ্ছে। কিন্তু সেগুলো সবই শহরকেন্দ্রিক এবং বৃহৎ উদ্যোক্তার হাতে বন্দি। এক হিসেবে দেখা যায় এসব ব্যাংকে পল্লী এলাকার উৎস থেকে ১২৮৬.১৮ বিলিয়ন টাকা জমা হলেও সে টাকা থেকে অর্ধেকেরও কম অর্থাৎ মাত্র ৫৯০.৭৪ বিলিয়ন টাকা গ্রামাঞ্চলে বিনিয়োগ হয়েছে। বাকি সবই শহরকেন্দ্রিক ব্যাংকগুলোতে ব্যবহার হয়েছে। নগরবন্দি ব্যাংকগুলোর গ্রামীণ শাখা খোলার তেমন কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যায় না এবং বড় বড় অনেক আর্থিক কেলেংকারি ঘটেছে শহরের বড় ব্যাংকে, ফলে প্রকারান্তরে গ্রামীণ পুঁজিতে টান পড়েছে। এক হিসেবে দেখা গেছে প্রায় শতকরা ৬৭.২২ ভাগ এসএমই লোন গেছে টুকটাক ব্যবসায়। উৎপাদন খাতে গেছে ২৭.৫৭ ভাগ এবং সেবা খাতে মাত্র ৫.২৫%। এ থেকে বুঝা যায় এখনো এসএমই ঋণ উদ্দেশ্য অভিমুখী হতে পারেনি। বরং হলমার্ক, বিস্মিল্লা, বেসিক ও ফারমারস ব্যাংক, ডেসটিনি, পিকেএইচ-এর মতো বড় ধরনের লুটপাট , অনিয়ম কেলেংকারির শিকার হয়েছে গ্রামীণ অর্থ খাত। ঘাটে ঘাটে চাঁদা ও মাসোহারা প্রদানে মাঝে মধ্যে তাদের মূল পুঁজিতেই টান পড়ে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য প্রারম্ভিক পুঁজি ও কাঁচামাল থেকে শুরু করে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্যপ্রাপ্তি তথা বিপণন পর্যায়ে একটি সক্ষমতা সৃষ্টিকারী পরিবেশ (বহধনষরহম বহারৎড়হসবহঃ) প্রয়োজন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অবস্থান সার্বিক শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের মতো শিল্পোন্নত দেশের প্রাণবায়ু হচ্ছে সেদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। টয়োটা ও সনির মতো বড় কংগ্লোমারেট আসলে হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সমাহারের সমবায়ী ব্যবস্থা।
করোনার কারণে অধিক বেকারত্বের ভারে ন্যুব্জ নগরাভিমুখী দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের বাঞ্ছিত পুনর্বাসনের জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উন্নয়নই একটি কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে সরকারি প্যাকেজ উদ্ধারকারী পদক্ষেপ হিসেবে পরিগণিত হতে পারত কিন্তু এখানেও পদ্ধতির কারসাজিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের সর্বনাশই সাধিত হচ্ছে। ফলে দ্রুত সমাজ ভাঙছে। অস্থিরতা বাড়ছে, নীতি ও নৈতিকতার সমস্যা প্রকট হয়ে উঠছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-উদ্যোক্তাকে প্রকৃত পুঁজি প্রণোদনা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান ছাড়া এই অধোগামিতাকে থামানো অসম্ভব ব্যাপার বলে প্রতীয়মান হয়।
লেখক সরকারের সাবেক সচিব এবং এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান
