পাট আমদানির অনুমতি চেয়ে ‘নজিরবিহীন’ আবেদন

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০২:৩৫ এএম

এতদিন ‘সোনালি আঁশ’খ্যাত পাট বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এটিই ছিল প্রধান রপ্তানি পণ্য। তৈরি পোশাকের ভিড়েও পাট রপ্তানি আয়ের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে। অথচ বাংলাদেশই এখন পাট সংকটে ভুগছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়া এবং মজুদদারির কারণে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার কাঁচাপাটের দাম বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। অতিরিক্ত দাম ও সরবরাহ সংকটে ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ৩০টির বেশি কারখানা। আরও কিছু কারখানা নিভু নিভু। এমতাবস্থায় গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিনাশুল্কে পাট আমদানির জন্য ‘নজিরবিহীন’ অনুমোদন চেয়ে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে পাটকল মালিকদের দুই সংগঠন বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমএ) এবং বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ)। একই সঙ্গে তারা পাট মজুদদারের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ লাখ বেল পাট প্রয়োজন। এছাড়া গড়ে প্রায় ৮ লাখ বেল কাঁচাপাট রপ্তানি হয়ে থাকে। পাট অধিদপ্তর প্রথমে ৮৪ লাখ ১৪ হাজার বেল পাট উৎপাদন হবে বলে ঘোষণা দেয়। পরে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে, এ বছর ৭৪ লাখ ১৪ হাজার বেল পাট উৎপাদন হয়েছে। তবে বিজেএমএ ও বিজেএসএর ধারণা, সাকল্যে এবার ৫৫ লাখ বেল পাট উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে গত জুলাই-ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪ লাখ বেল পাট রপ্তানি হয়েছে। স্থানীয় শিল্পে ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ বেল। কাঁচাপাটের মৌসুম শুরুর ৬ মাসের মাথায় অতি মুনাফালোভী ফড়িয়া ও মজুদদার মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করে চলছে। এখন মণপ্রতি কাঁচাপাট বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ২০০ টাকা দরে। এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা। অথচ কৃষক মণপ্রতি দাম পেয়েছে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা। এ দামও দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী দু-এক মাসের মধ্যে কাঁচাপাটের অভাবে ৯৫ শতাংশ পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চিঠিতে সংগঠন দুটি সরকারের কাছে বেশকিছু দাবি পেশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, মজুদদারদের বিরুদ্ধে দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, বাড়তি দামের কারণে ক্রেতারা যাতে অন্য দেশে চলে না যায়, সে বিষয়ে পদক্ষেপ, কাঁচাপাট লাইসেন্সধারীরা যেন এক মাসের অধিক ৫০০ মণের বেশি মজুদ করতে না পারে সে ব্যবস্থা, পাট সংকটে বন্ধ কারখানার শ্রমিক ধরে রাখার জন্য আগামী মৌসুম পর্যন্ত করোনাকালে যেভাবে শ্রমিকের বেতন বাবদ ঋণ দেওয়া হয়েছে, তার ব্যবস্থা করা, ব্যাংকের সকল ঋণের কিস্তি ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত রাখা ও শ্রেণিকরণ না করা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করা এবং কৃষকরা যাতে কাঁচাপাটের ন্যায্যমূল্য পায় সেজন্য মৌসুম শুরুর আগেই ক্ষতিগ্রস্ত পাটকলগুলোকে সহজ শর্তে কাঁচাপাট কেনা এবং চলতি মূলধনের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে চিঠিতে।

বিজেএইর চেয়ারম্যান মোহাম্মেদ মাহবুবুর রহমান পাটোয়ারি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাট অধিদপ্তর যে পরিমাণ পাট উৎপাদনের তথ্য দিয়েছিল, তা হয়নি। এজন্য বাজারে পাটের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে আবার প্রায় ৪ লাখ বেল (১ বেল সমান ২১৭ দশমিক ৭২ কেজি) পাট রপ্তানি হয়েছে। সবমিলিয়ে অবস্থা ভয়াবহ। আর এ সুযোগে মজুদ করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, কখনো যিনি এক কেজি পাট কেনেননি, তার গুদামেও মণকে মণ পাট মজুদ রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন প্রায় ২৫ লাখ বেল পাটের সংকট রয়েছে। ভারতসহ অন্যান্য দেশে খোঁজ করছি। যদিও ওখানকার পাটের মান খারাপ। তবুও কারখানা চালিয়ে রাখতে হলে আমদানি করতে হবে। সরকার অনুমতি দিলে আমরা ঋণপত্র (এলসি) খুলব। যদিও বিষয়টি নজিরবিহীন। কারণ অতীতে কখনো পাট আমদানির প্রয়োজন পড়েনি। কিন্তু এবার করতে হবে। তাহলে বাজারে পাটের সরবরাহ বাড়বে এবং দামও কমবে। ইতিমধ্যে পাট সংকটে প্রায় ৩০টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন সংকটের সমাধান না হলে বাকি কারখানা বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।’

পাট ব্যবসা সংশ্লিষ্টরা জানান, বাজারে পাটের সংকট কেবল ফড়িয়ারা করেননি, তাদের সঙ্গে কতিপয় প্রভাবশালী পাটকল মালিক জড়িত। তারা দাদন (অগ্রিম টাকা) দিয়ে আগেই ফড়িয়া থেকে অতিরিক্ত পাট কিনে রেখেছেন। বর্তমান আইন অনুযায়ী একজন লাইসেন্সধারী এক মাসের জন্য সর্বোচ্চ এক হাজার টন পাট মজুদ রাখতে পারবেন। এরই সুযোগ নিয়ে এসব পাট বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে রেখে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মিল মালিকরা পাট থেকে সুতা উৎপাদন করে ওয়ারহাউজ (গুদামঘর) ভর্তি করে রেখেছেন। এ কারণেও বাজারে সংকট দেখা দিয়েছে। আবার মৌসুমের শুরুতে অনেক পাট পাচার হয়ে গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজেএমএর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কথা বলতে গেলে দায় আমাদের ঘাড়েও পড়ে। তাই বলতেও পারছি না। কিন্তু এই সিন্ডিকেটে সবাই জড়িত। সমস্যা হলো, চালে কারসাজি হলে সবাই সরব হন। কারণ এটি নিত্যপণ্য। কিন্তু পাটের কারসাজি নিয়ে কেউ কথা বলে না।’

পাটজাত পণ্য রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠান ‘তুলিকা’র স্বত্বাধিকারী ইসরাত জাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সবাই দেখছে পাট রপ্তানিতে বিপ্লব ঘটে গেছে। মূলত তিন গুণ বেশি দামে ফেব্রিক্স কেনায় বেশি দামে রপ্তানি করতে হচ্ছে। কিন্তু ভলিউম হিসাব করলে রপ্তানি অনেক কমেছে। আর রপ্তানি আয় যে বেড়েছে, তাতে আমাদের লাভ হচ্ছে না। বরং বাড়তি দাম হওয়ায় ক্রেতারা ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিয়েছেন। গত এক মাসে আমার কারখানায় কোনো রপ্তানি পণ্য প্রস্তুত হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এমনিতেই করোনার ধাক্কা রেগেছে। এখন সিন্ডিকেটের চক্করে পড়লে কারখানা চালাব কী করে? সরকারকে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত