পাট ও পাটশিল্প রক্ষা করুন

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১০:৫২ পিএম

বাংলাদেশের যে কয়টি গর্ব করার বিষয়, তার মধ্যে অন্যতম পাট ও পাটশিল্প।  বহুকাল বিশ্বের বুকে এ ভূখণ্ডের মর্যাদার অন্যতম প্রতীক ছিল সোনালি আঁশ নামে পরিচিত এ কৃষিপণ্য। আমাদের একদিকে যেমন আদমজী জুটমিলের মতো বিশ্বের এক নম্বর প্রতিষ্ঠান ছিল, তেমনি বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলমের পাটের জিন রহস্য আবিষ্কারের উদাহরণও রয়েছে। একসময় বলা হতো, পাট বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে নতুন সম্ভাবনা। কিন্তু দিনে দিনে পাট নিয়ে যাতনার পাল্লা বৃদ্ধি পেয়েই চলছে। দীর্ঘদিন ধরে পাটচাষিরা তাদের শ্রমে-ঘামে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছিলেন না, আবার ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ হওয়ায় শ্রমিকদের পাশাপাশি পাটচাষিরা নতুন করে বিপাকে পড়েছেন। পরিস্থিতির এতই অবনতি ঘটেছে যে পাটকল মালিকরা পাটশিল্প বাঁচাতে পাট আমদানি অনুমোদনের আহ্বান জানিয়েছে সরকারকে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়া এবং মজুদদারির কারণে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার কাঁচাপাটের দাম বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। অতিরিক্ত দাম ও সরবরাহ সংকটে ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে ৩০টির বেশি কারখানা এবং বন্ধের হুমকিতে রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি কারখানা।  এমতাবস্থায় গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিনাশুল্কে পাট আমদানির জন্য ‘নজিরবিহীন’ অনুমোদন চেয়ে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে পাটকল মালিকদের দুই সংগঠন বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমএ) এবং বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএসএ)। একই সঙ্গে তারা পাট মজুদদারের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছে।

গণমাধ্যমের তথ্য বলছে, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ লাখ বেল পাট প্রয়োজন। এছাড়া গড়ে প্রায় ৮ লাখ বেল কাঁচাপাট রপ্তানি হয়ে থাকে। পাট অধিদপ্তর প্রথমে ৮৪ লাখ ১৪ হাজার বেল পাট উৎপাদন হবে বলে ঘোষণা দেয়। পরে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে, এ বছর ৭৪ লাখ ১৪ হাজার বেল পাট উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু বিজেএমএ ও বিজেএসএ ধারণা করছে, সাকল্যে এবার ৫৫ লাখ বেল পাট উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে গত জুলাই-ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪ লাখ বেল পাট রপ্তানি হয়েছে। স্থানীয় শিল্পে ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ বেল। কাঁচাপাটের মৌসুম শুরুর ৬ মাসের মাথায় অতি মুনাফালোভী ফড়িয়া ও মজুদদাররা মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করে চলছে। এখন মণপ্রতি কাঁচাপাট বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ২০০ টাকা দরে। এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা। অথচ

কৃষক মণপ্রতি দাম পেয়েছে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা। এ দামও দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী দু-এক মাসের মধ্যে কাঁচাপাটের অভাবে ৯৫ শতাংশ পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পাদনের মাধ্যমে মূল্য সংযোজন করে কাঁচাপাট রপ্তানি করা হতো। এখনো পর্যন্ত তৈরি পোশাকের পরে রপ্তানি আয়ের তালিকায় দ্বিতীয় স্থান ধরে রেখেছে পাট ও পাটশিল্প। উল্লেখ্য, কাঁচাপাট যাচাই এবং প্যাকিং করার কাজে দৌলতপুর, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, উত্তরবঙ্গসহ সারা দেশে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার শ্রমিকও নিয়োজিত রয়েছে। কৃষি তথ্যসেবা সূত্রে জানা গেছে, দেশে পাটচাষি ৪০ লাখ। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চার কোটি মানুষের জীবিকার সঙ্গে পাটশিল্প জড়িয়ে আছে। যেখানে এখনো বিপুল পরিমাণ পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে, সেখানে এমন কোনো পরিস্থিতি কাম্য নয়, যাতে বিদেশ থেকে পাট আমদানি করতে হয়। এর ফলে পাটচাষিরা যেমন বিপন্ন অবস্থার মধ্যে পতিত হবে, তেমনি দেশের সম্ভাবনাময় শিল্পকেও চরম হুমকিতে পড়তে হবে। এক্ষেত্রে বন্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর ব্যাপারে যেমন ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে হবে, তেমনি কাঁচাপাটকে কেন্দ্র করে ফড়িয়া-মজুদদারদের দুর্বৃত্তায়নের অশুভ বৃত্ত সমূলে বিনাশের দিকে ধাবিত হতে হবে। ধান-চাল, পাটসহ নানা ধরনের

কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে ফড়িয়া-মজুদদারদের দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের কায়েমি স্বার্থের তৎপরতা বন্ধ না হলে কৃষকদের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও বিপর্যস্ত হবে, তা বলাই বাহুল্য। 

একুশ শতকে এসে সারা বিশ্বে সিনথেটিক ফাইবারের বদলে পাট এবং পাটের মতো অর্গানিক ফাইবারের কদর এবং চাহিদা দুটোই উত্তরোত্তর বাড়ছে। অথচ এই যুগে এসেই একদা সোনালি আঁশের দেশ খ্যাত বাংলাদেশে সব সম্ভাবনা ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পাটশিল্পের ধারাবাহিক ক্রমাবনতি কোনো যুক্তিতেই ধোপে টেকে না।  প্রতিবেশী দেশ ভারতে এবং দেশের বেসরকারি পাটকলগুলোও লাভজনক। আর প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে লোকসানের অজুহাতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাট খাত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, যে দেশের বিজ্ঞানীরা পাটের জীবনরহস্য আবিষ্কার করতে পারেন, যে দেশকে বহির্বিশ্ব সোনালি আঁশের দেশ হিসেবে চেনে, সেই দেশে ফের পাটের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনা কঠিন নয়। পাটের পুনরুজ্জীবন ঘটাতে চাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন। পাটের উৎপাদক, পাটকল মালিক, শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থ সমুন্নত রেখে পাট খাতকে এগিয়ে নিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত