আবারও সামরিক শাসনামলে জারি করা ফরমান বা অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করার সময় বাড়িয়েছে মন্ত্রিসভা। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সামরিক শাসনামলে জারি করা অধ্যাদেশের মধ্যে যেগুলোর প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলো আইনে পরিণত এবং অন্যগুলো বাতিল করতে উচ্চ আদালতের যে রায় রয়েছে তা আগামী জুন মাসের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী ও সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে মন্ত্রীরা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠকে যোগ দেন। বৈঠক শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। এর আগে গত ২৭ জুলাই সামরিক শাসনামলে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে যেগুলো এখনো আইনে পরিণত হয়নি, সেগুলোকে আইনে রূপান্তরে তিন মাস সময় বেঁধে দিয়েছিল মন্ত্রিসভা। এর আগেও এ ধরনের নির্দেশনা এসেছিল মন্ত্রিসভা থেকে।
সংবিধানের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল করে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া রায় অনুযায়ী দুটি সামরিক সরকারের শাসনামল অবৈধ হয়ে যায়। তাই ১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত এবং ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর সময়ের মধ্যে জারি করা সব অধ্যাদেশও অবৈধ। ওই দুই সামরিক শাসনামলে ১৭২টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। এই অধ্যাদেশগুলোকে আইনি ভিত্তি দিতে ২০১৩ সালে ১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত জারিকৃত অধ্যাদেশ ‘কার্যকরণ (বিশেষ বিধান) আইন ২০১৩’ এবং ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর সময়ের মধ্যে জারিকৃত কতিপয় অধ্যাদেশ ‘কার্যকরণ (বিশেষ বিধান) আইন-২০১৩’-এর খসড়া অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। সেই অনুযায়ী যেসব অধ্যাদেশের প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলো যুগোপযোগী করে বাংলায় অনুবাদসহ আইনের খসড়া হিসেবে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সংসদে বিল আকারে পাস করে আইনে পরিণত করা হচ্ছে।
গতকাল মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, এ ধরনের কয়েক শ আইন ছিল সেগুলো সব হয়ে গেছে, এখন ৫৯টি আইন বাকি আছে। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক তালিকা করে দিয়ে কেবিনেট থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে আগামী জুন মাসের মধ্যে অবশ্যই এগুলো আইনে পরিণত করতে হবে।
শকুন রক্ষায় বন্ধ হচ্ছে কিটোপ্রোফেন
বিপন্ন শকুন রক্ষায় গবাদিপশুর ব্যথানাশক কিটোপ্রোফেনজাতীয় ওষুধের উৎপাদন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফার্মাসিউটিক্যালস, ড্রাগ কোম্পানি ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় আনে। মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনায় বলা হয়, কিটোপ্রোফেন বন্ধ না হলে এ দেশে শকুন বাঁচবে না।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, দেশে খুবই বিপজ্জনকভাবে শকুনের সংখ্যা কমে গেছে। সত্তরের দিকে দেশে ৫০ হাজারের মতো শকুন ছিল। এখন আছে মাত্র ২৬০টি। এগুলো মুমূর্ষু অবস্থায় আছে। এর কারণ হলো কিটোপ্রোফেনজাতীয় ব্যথানাশকের ব্যবহার। এই ওষুধ শকুনের মধ্যে গেলে মারা যায়। শকুন না থাকলে মৃত পশুপাখি থেকে রোগজীবাণু ছড়ায়, সেগুলো পরিবেশকে নষ্ট করে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় শকুন একটা অন্যতম উপজীব্য হিসেবে কাজ করে।
কিটোপ্রোফেনজাতীয় ওষুধ বন্ধ করে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় মেলোক্সিক্যাম (গবষড়ীরপধস) নামে একটি ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তিনি আরও জানান, এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুব কম, এটা ব্যবহার করলে শকুন বা অন্যান্য পাখির ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হবে না। দেশের ল্যাবরেটরিতে মেলোক্সিক্যাম পরীক্ষা করা হয়েছে।
আইনি কাঠামো পাচ্ছে ডিজিটাল লেনদেনের রেকর্ড
ডিজিটাল লেনদেনের নথি ও দলিল অন্তর্ভুক্ত করতে ‘ব্যাংকার সাক্ষ্য বহি আইন, ২০২১’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ১৯৯১ সালের এসংক্রান্ত একটি আইন ছিল। পরে নতুন করে আইন করতে খসড়া নিয়ে আসা হয়। ব্যাংকের যেসব বই যেমন লেজার বুক, ক্যাশ বুক এগুলোকে সাক্ষ্য বই বলা হয়। নতুন আইনে ডিজিটাল পদ্ধতিতে যেসব রেকর্ড হবে, সেগুলো ‘সাক্ষ্য বহি’ হিসেবে আইনে বিবেচিত হবে।
বাংলাদেশ ও মরক্কোর মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বৈত করারোপণ পরিহার ও রাজস্ব ফাঁকি রোধসংক্রান্ত চুক্তির খসড়া অনুসমর্থনের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। আগে দুই জায়গায় ট্যাক্স দিতে হতো। চুক্তির ফলে দুই জায়গায় বা দুই দেশে ট্যাক্স দিতে হবে না।
দিবাযত্ন কেন্দ্র থেকে শিশু হারালে ১০ বছর জেল
শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র থেকে কোনো শিশু হারিয়ে গেলে সর্বোচ্চ ১০ বছর জেলের পাশাপাশি পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রেখে এসংক্রান্ত আইনের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। নতুন আইন পাস হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে চলমান শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলোকে নিবন্ধন নিতে হবে। সব শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলে আসবে। বর্তমানে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১১৯টি ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, এই আইন প্রবর্তনের পর সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন সনদ গ্রহণ করে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিচালনা করতে পারবে। এই আইন পাস হওয়ার পর অনুমোদন ছাড়া কেউ শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিচালনা করতে পারবে না। শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র থেকে কোনো শিশু হারিয়ে গেলে ১০ বছর জেলের পাশাপাশি পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হবে।
৪০ বছর বয়সীরাও করোনা টিকা নিতে পারবেন
চল্লিশ বছর বয়সী সাধারণ মানুষও করোনা টিকার জন্য নিবন্ধন করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অগ্রাধিকার তালিকাভুক্ত ব্যতীত ৫৫ বছরের নিচের কোনো সাধারণ নাগরিক টিকা নিতে নিবন্ধন করতে পারতেন না। কেউ আগে নিবন্ধন করতে না পারলে জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে তিনি টিকা দিতে পারবেন বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, প্রধানমন্ত্রী টিকা কার্যক্রমকে আরেকটু রিলাক্স করার নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ৪০ বছর বয়সীদের রেজিস্ট্রেশন করার সুযোগ দিতে হবে। যারা ফ্রন্টলাইন ফাইটার, প্রয়োজন হলে তাদের ফ্যামিলিকেও ধীরে ধীরে রেজিস্ট্রেশন করে টিকা দিয়ে দিতে হবে। টিকা নিলেও অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। মাস্ক না পরলে কোনো কাজ হবে না। কোনো অবস্থায়ই মাস্কের সঙ্গে কোনো কম্প্রোমাইজ করা যাবে না।
প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা আজ (গতকাল) থেকেই কার্যকর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, কেউ যদি রেজিস্ট্রেশন করতে ব্যর্থ হন, তিনি জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে টিকাদান কেন্দ্রে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করে টিকা নিতে পারবেন, সেই ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। টিকা নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি আরেকটু সহজ একধাপবিশিষ্ট করার জন্য আইসিটি বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আগামী ৭ মার্চ পর্যন্ত টিকাদান কার্যক্রম চলবে জানিয়ে তিনি বলেন, এই টিকার কার্যকারিতা ৭০ শতাংশ। ১০০ জনের মধ্যে যদি ৭০ জন ইমিউন হয়ে যায় তাহলে রোগটি হ্যান্ডেল বা এটি ছড়ানোর ক্ষেত্রে অনেক কমফোর্টেবল একটা জোনে আমরা চলে যাব।’
গত রবিবার ভ্যাকসিন নেওয়ার পর শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলে খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো অসুবিধা নেই।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘এটা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বলে দেওয়া হয়েছে, তারা এ বিষয়ে কুইকলি একটা অ্যাকশনে যাবে। ওনারা হেলথের সঙ্গে কথা বলে কী করবেন, সেটা ঠিক করবেন।’
