রূপপুর প্রকল্পে চুরিচেষ্টার তদন্ত হোক

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১০:৫৯ পিএম

বহুল আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে ‘বালিশ কান্ড’ নামে পরিচিতি পাওয়া কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের ত্বরিত তদন্ত ও দ্রুত শাস্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। এ নিয়ে তখন একদিকে যেমন দেশজুড়ে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয় তেমনি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করায় সরকারও প্রশংসিত হয়। এখন আবার বৃহৎ এই উন্নয়ন প্রকল্পের সম্পদ চুরির চেষ্টার অভিযোগ সামনে এসেছে। বুধবার দেশ রূপান্তরে ‘রূপপুর প্রকল্পের রড চুরির চেষ্টা এমপিপুত্রের!’ শিরোনামের প্রতিবেদনে ওই অভিযোগ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প থেকে স্থানীয় এক এমপিপুত্রের নেতৃত্বে পাঁচ ট্রাক লোহা চুরি চেষ্টার খবর কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেওয়ায় এক ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে গুরুতর জখম করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পসংলগ্ন নতুন হাট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আহত ব্যবসায়ীর নাম সোহেল রানা (৪৫)। তিনি রূপপুর প্রকল্পের সাব-ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাংলা পাওয়ার সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ভুক্তভোগীরা ঈশ্বরদী থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। এমতাবস্থায় প্রকল্পটির সুনাম রক্ষা এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য এই চুরিচেষ্টার সুষ্ঠ তদন্ত জরুরি। 

প্রকল্পের নিরাপত্তাকর্মীরা চুরি যাওয়া লোহাসহ পাঁচটি ট্রাক আটক করেছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করলেও বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে, ভুক্তভোগী বাংলা পাওয়ার সার্ভিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল রানা অভিযোগ করেছেন, পাবনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুজ্জামান বিশ্বাসের ছেলে দোলন বিশ্বাস ও তার সহযোগীদের সিন্ডিকেট রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ রড অবৈধভাবে বিক্রির উদ্দেশ্যে পাঁচটি ট্রাকে করে প্রকল্প এলাকা থেকে বের করার চেষ্টা করছিল। বিষয়টি সোহেল ও তার সহকর্মী কামরুল হাসান রাসেলের নজরে এলে তারা প্রকল্পের প্রশাসনিক বিভাগকে জানান। দায়িত্বরত কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিক রডভর্তি ওই পাঁচটি ট্রাক আটক করেন। এ সময় ট্রাকগুলোর চালকদের কাছে বৈধ গেট পাস ও চালানপত্র না থাকায় তাদের প্রকল্প এলাকা থেকে বের হতে না দিয়ে আটকে দেওয়া হয়। এতে এমপিপুত্র দোলন বিশ্বাস ক্ষুব্ধ হন এবং ১৫-২০ জন সশস্ত্র সহযোগী নিয়ে নতুনহাট এলাকায় বাংলা পাওয়ার সার্ভিসের অফিসে হামলা চালান।

রূপপুর প্রকল্পে ক্লিনিং সার্ভিস পরিচালনাকারী বাংলা পাওয়ার সার্ভিসের নির্বাহী পরিচালক আরও অভিযোগ করেছেন যে, প্রকল্প এলাকা থেকে জাল কাগজ তৈরি করে দীর্ঘদিন ধরে দোলন বিশ্বাসের অনুসারী একটি চক্র মালামাল পাচার করে বিক্রি করে। এই চক্রের হয়ে প্রকল্প এলাকায় কাজ করেন সাব-ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিকিমথের দোভাষী নাজমুল ও অমিত। তারা দোলন বিশ্বাসের সঙ্গে পরিকল্পনা করে প্রকল্পের মালামাল লুট করে আসছে। এ ব্যাপারে প্রকল্পের সাইট ইনচার্জ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে, রূপপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বলেছেন, এমপিপুত্র দোলন বিশ্বাসের অনুসারী এক ব্যক্তির মাধ্যমে প্রকল্প এলাকা থেকে বিভিন্ন মালামাল মাঝেমধ্যে বের করা হয়, তবে তা বৈধ না অবৈধভাবে করা হয় তা আমার জানা নেই। এই পরিপ্রেক্ষিতে সাব-ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের এসব অভিযোগ সত্যি কি না সেটা তদন্ত হওয়া জরুরি। কেননা, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও দুর্নীতি হলে যেমন রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ঘটে তেমনি প্রকল্পের সম্পদ চুরি বা খোয়া গেলেও তা ঘটে। একই সঙ্গে এই প্রশ্ন ওঠাও জরুরি যে, এত বৃহৎ একটি প্রকল্পে বড় ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত ও শাস্তির পরও সেখানে চুরির মতো ঘটনা ঠেকানোর সামর্থ্য কেন কর্তৃৃপক্ষের থাকবে না।

স্মরণ করা যেতে পারে ২০১৯ সালের ১৬ মে ‘কেনা-তোলায় এত ঝাঁজ’ শিরোনামে দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়যা পরে রূপপুর প্রকল্পে দুর্নীতির ‘বালিশ কান্ড’ নামে পরিচিতি পায়। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর সারা দেশে যে তুমুল আলোড়ন শুরু হয়েছিল; উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং মন্ত্রণালয়ের তদন্তের মধ্য দিয়ে মাস দুয়েকের মধ্যেই তার একটি ইতিবাচক ফল পাওয়া গিয়েছিল। রূপপুর প্রকল্পে কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়া ১৬ কর্মকর্তাকে তখন সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় আরও ১০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সে সময়কার গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম এক সংবাদ সম্মেলনে সুনির্দিষ্টভাবে ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশের জন্য দেশ রূপান্তরকে অভিনন্দন জানান। একইসঙ্গে এ বিষয়ে জোরালো ভূমিকা রাখা অন্যান্য প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমকে ধন্যবাদ জানান তিনি। সংবাদ মাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনকে আমলে নিয়ে যথাযথ তদন্ত হলে যে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করে দেশকে আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় এই ঘটনা তারই দৃষ্টান্ত। এই অবস্থায় রূপপুর প্রকল্পের সম্পদ চুরির অভিযোগকে আমলে নিয়ে যথাযথ তদন্ত ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত