এক দিনেই টিকা নিলেন দেড় লাখের বেশি মানুষ

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০২:৩২ এএম

দেশে করোনার টিকা নিতে মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। গতকাল বুধবার চতুর্থ দিনে ঢাকার হাসপাতাল ও কেন্দ্রগুলোতে নানা শ্রেণির মানুষের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে টিকা দিতে এসেছেন। সাধারণ মানুষকে টিকা নিতে উৎসাহিত করতে টিকা নিয়েছেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। বিশেষ করে গতকালই প্রথম রাজধানীর একটি কেন্দ্রে একযোগে টিকা নিয়েছেন প্রায় ৩০ কূটনীতিক।

টিকা নিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও কূটনীতিকরা দেশের মানুষকে নির্ভয়ে করোনার টিকা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কূটনীতিকরা টিকাদান কর্মসূচির জন্য বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

গত ২৭ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে টিকা নিয়েছেন ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৭৬৯ জন। এর মধ্যে শুধু গতকাল এক দিনেই টিকা নিয়েছেন ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪৫১ জন। এখন পর্যন্ত সারা দেশে টিকাগ্রহীতাদের মধ্যে সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে ২৭৭ জনের মধ্যে।

গত রবিবার থেকে সারা দেশে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনার ‘কভিশিল্ড’ টিকা দেওয়া শুরু করেছে সরকার। এর আগে গত ২৭ ও ২৮ জানুয়ারি পরীক্ষামূলকভাবে ৫৬৭ জনকে এ টিকা দেওয়া হয়। প্রথমে ৫৫ বছর ও তদূর্ধ্ব নাগরিকদের জন্য টিকা নেওয়ার নিয়ম করা হলেও পরে গত সোমবার থেকে এ বয়সসীমা ৪০ বছর করা হয়। পাশাপাশি নিবন্ধনের শর্ত শিথিল করে সরকার। সেদিন থেকেই টিকার নিবন্ধন ও টিকাগ্রহীতার সংখ্যা বাড়তে থাকে।

গতকাল রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতাল ও কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে টিকা নিতে আসা মানুষের দীর্ঘ লাইন। দুপুরের মধ্যেই এসব কেন্দ্রে টিকা নেন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, ঢাকায় কর্মরত বিদেশি কূটনীতিক, রাজনীতিক, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। আর রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন জেলায় টিকা নেন জনপ্রতিনিধিরা। পাশাপাশি টিকা নেন সাধারণ মানুষও।

টিকা নিলেন কূটনীতিকরা : ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকরা গতকাল মহাখালীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট হাসপাতালে টিকা নেন। এর আগে হাসপাতালে কূটনীতিকদের টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। এ সময় কূটনীতিকদের সঙ্গে তিনি ও পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন টিকা নেন।

অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, বাংলাদেশে অবস্থানরত যত কূটনীতিক আছেন, সবার জন্য আমরা আলাদাভাবে টিকাদান কর্মসূচির আয়োজন করেছি। আজ (গতকাল) ৩০ জনেরও বেশি কূটনীতিক টিকা নিয়েছেন। পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশে আছেন এমন ১ হাজার ২০০-এর অধিক কূটনীতিক সবাই টিকা নেবেন।

কূটনীতিকদের টিকা দেওয়ার জন্য শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট হাসপাতালে সপ্তাহে দুই-তিন দিন নির্দিষ্ট করে দেওয়া হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। এছাড়া বিদেশি মিশনের বাইরে আন্তর্জাতিক সংস্থার দপ্তরে কর্মরত বিদেশিদের তালিকাও চেয়েছে সরকার। তারাও এ হাসপাতাল থেকে টিকা নেবেন।

গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ জানান, গতকাল সেখানে ঢাকায় ডিপ্লোম্যাটিক কোরের ডিন ভ্যাটিক্যান সিটির রাষ্ট্রদূতের পাশাপাশি ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জার্মানি, তুরস্ক, ফ্রান্স, ইতালি, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের মিশনপ্রধানসহ প্রায় ৩০ কূটনীতিক টিকা নিয়েছেন।

টিকা নিয়ে বাংলাদেশকে সাধুবাদ জানান কূটনীতিকরা। এ সময় তারা করোনাভাইরাস মোকাবিলায় বাংলাদেশের সাফল্যে ভূয়সী প্রশংসা করেন। টিকা নেওয়ার পর তারা আগের মতোই সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থা অনুভব করছেন ও কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়নি বলেও জানান।

 টিকাদান শুরুর জন্য বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ জানিয়ে ঢাকায় কূটনৈতিক কোরের ডিন আর্চবিশপ জর্জ কোশারি বলেন, দয়া করে সবাই টিকা নিন, যাতে করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবিলা করতে পারি।

ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রেনজি টিরিংক বলেন, এমন উদ্যোগের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ, কোনো ধরনের লাইন ছাড়া টিকা নেওয়া যাচ্ছে। এর মাধ্যমে আমরা টিকাদানের ক্ষেত্রে ভালো উদাহরণ তৈরি করতে পারি এবং এটা মানুষের মধ্যে আস্থা আনবে।

টিকাদান কর্মসূচি শুরু করায় অভিনন্দন জানিয়েছেন ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী। তিনি বলেন, বাংলাদেশি সব বন্ধুকে বলব আপনারা টিকা নিন। করোনা মোকাবিলায় ভারত, বাংলাদেশ ও আমাদের প্রতিবেশীরা একই সঙ্গে টিকা নিতে হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত সবসময় আছে।

টিকা নিলেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা : গতকালও রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ও কেন্দ্রে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের টিকা নিতে দেখা গেছে। সচিবালয় ক্লিনিকে টিকা নেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে টিকা নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী ও প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান।

টিকা নেওয়ার পর ড. গওহর রিজভী বলেন, সেই ছোটবেলায় ভ্যাকসিন নিয়েছিলাম। এখন ছেলেবেলায় ফিরে গেলাম। মডার্ন মেডিসিন এখন এত অ্যাডভান্স যে সাইড ইফেক্ট হওয়ার কোনো কারণ নেই। কাজেই সবাইকে বলব টিকা নিতে রেজিস্ট্রেশন করুন।

টিকা নিয়ে ভালো লাগছে বলে জানিয়ে সালমান এফ রহমান বলেন, এ টিকা অন্য সব টিকার মতোই নিরাপদ। সারা দেশে সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভ্যাকসিন নিচ্ছে। আসুন নিজেরা টিকা নিই, অন্যদেরও টিকা নিতে উৎসাহিত করি।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত মঙ্গলবার টিকা নিয়েছেন বলে গতকাল অর্থনৈতিক ও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ভার্চুয়াল বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান। এ সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, আমি গতকাল (মঙ্গলবার) শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল কেন্দ্র থেকে টিকা নিয়েছি। কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়নি। কোনো কিছুই দেখিনি আমি। কোনো অসুবিধা হয়নি। ছোটবেলায় যখন স্কুলে পড়তাম, তখন টিকা নিয়েছিলাম, সে সময় জ্বর আসত। তবে এ টিকা নেওয়ার পর ব্যথাও হয়নি, জ্বরও আসেনি। সবাই মেহেরবানি করে টিকা নেবেন।

ঢাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় টিকা নিলেন ১৯,১১৫ জন : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গতকাল এক দিনে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে ১৯ হাজার ১১৫ জন টিকা নিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৮৩৭ জন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকা নিয়েছেন। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ৯৪৬, রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে ৯৯০, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৮৬০ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯৩০ জন টিকা নিয়েছেন।

বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি টিকা নিয়েছেন ঢাকা বিভাগের মানুষ। গতকাল ঢাকা বিভাগে টিকা নিয়েছেন ৪০ হাজার ৯০৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২৮ হাজার ২৯২ জন ও নারী ১২ হাজার ৬১৫ জন। এছাড়া ময়মনসিংহে ৭ হাজার ৫৪৯, চট্টগ্রামে ৩৭ হাজার ৪৫৮, রাজশাহীতে ১৭ হাজার ৯৭১, রংপুরে ১৪ হাজার ২২৪, খুলনায় ১৭ হাজার ১১৫, বরিশালে ৬ হাজার ১৪৭ এবং সিলেট বিভাগে ১৭ হাজার ৮০ জন টিকা নিয়েছেন।

৬৪ শতাংশের বেশি বাংলাদেশি কভিড টিকা নিতে আগ্রহী : ফেইসবুক এবং ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের এক যৌথ জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের যত মানুষ জরিপের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, তার মধ্যে ৬৪ শতাংশের বেশি করোনার টিকা নিতে আগ্রহী। তবে পৃথিবীর সবখানে মানুষের কভিড টিকা নেওয়ার আগ্রহ এক রকম নয়। যেমন ভিয়েতনামে যেখানে গড়ে ৮৬ শতাংশ মানুষের টিকা নেওয়ার আগ্রহ আছে, সেখানে ভারতে ৭২ শতাংশের। 

ডেটা ফর গুড প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে ফেইসবুক অ্যাকাডেমিক সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে জরিপ পরিচালনা করেছে। স্বাস্থ্য গবেষকদের আরও ভালো মনিটরিংয়ে সহায়তা করতে ও কভিড-১৯-এর বিস্তার সম্পর্কে জানতে অন্যতম বৃহত্তম এই জরিপে ২০২০ সালের এপ্রিল মাস থেকে বিশ্বের ২০০ দেশের প্রায় ৪ কোটি মানুষ অংশ নেন। জরিপটি আমাদের অ্যাকাডেমিক সহযোগীদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে এবং ফেইসবুক আলাদা করে কোনো মতামত গ্রহণ করেনি।

ফেইসবুক পিআর পার্টনার ঢাকার অফিস গতকাল এই জরিপ প্রকাশ করে। পিআর অফিসের প্রধান নির্বাহী আশরাফ কায়সার পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জরিপের ফলাফল তুলে ধরা হয়। তবে জরিপের বিস্তারিত জানানো হয়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত