এ বছর করোনার মধ্যেই এসেছে বসন্ত। যদিও করোনা মহামারী নিয়ন্ত্রণে আসছে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। পুরো বিশ্বেই টানা চার সপ্তাহ করোনার সংক্রমণ নিম্নমুখী। শুধু তা-ই নয়, টানা দুই সপ্তাহ করোনায় মৃত্যুও কমছে। বাংলাদেশেও করোনার সংক্রমণ পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের পথে। টানা ৯ সপ্তাহ নতুন রোগী কমছে। আর সাত সপ্তাহ ধরে মৃত্যুও কমছে। রোগী শনাক্তের হারও টানা তিন সপ্তাহ ৫ শতাংশের নিচে।
করোনা নিয়ন্ত্রণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে টিকা প্রদান কর্মসূচি চলছে। বাংলাদেশেও করোনা টিকার প্রয়োগ শুরু হয়েছে। মহামারী মোকাবিলায় টিকা কর্মসূচি দ্রুত ও ব্যাপকভাবে বাস্তবায়িত হলে মহামারী নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দৃশ্যত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পথে থাকলেও বিপদ কেটে গেছে, এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। কারণ, এখনো ট্রান্সমিশন (সংক্রমণ ছড়ানো) চলছে। কাজেই সবাইকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সচেতন থাকতে হবে।
করোনা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যেই এ বছর প্রকৃতিতে এসেছে বসন্ত। বাঙালি মধ্যবিত্ত নাগরিকের মধ্যে দেখা দিয়েছে চাঞ্চল্য। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক, আজ বসন্ত!’ কবির কথাই যেন সত্য হতে চলেছে। করোনার আবহেও বসন্তবরণের সমারোহ চলছে। যদিও গ্রামবাংলা জুড়ে এখনো শীতের প্রকোপ। এলোমেলো দখিনা বাতাসের দাপটও তেমনভাবে দেখা যাচ্ছে না। কোকিলের কুহুধ্বনিও শোনা যাচ্ছে না। গাছের পাতায় পুরু ধুলো। গাছে গাছে নতুন পাতার সমারোহ এখনো দেখা যাচ্ছে না। তার পরও অবশ্য কবি আর বাঙালি মধ্যবিত্তের মনে ধ্বনিত হচ্ছে বসন্তের আগমনী গান।
আবহাওয়া-বিজ্ঞানের সূত্র মেনে বলতে গেলে বলতে হয় বসন্ত ঋতুটির অস্তিত্বই নেই। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে তাই আমাদের এখানেও চারটে ঋতু! বর্ষা, বর্ষা-পরবর্তী শরৎ, শীত ও গ্রীষ্ম। আমাদের দেশে শরৎকালের স্বীকৃতি থাকলেও বসন্ত নিরুদ্দেশ! নিরুদ্দেশ, কেন না, বসন্ত যৌবনের চেয়েও ক্ষণস্থায়ী। শীতের দাপট শেষে ধুলাবালি মাখা দখিনা বাতাস বয়ে যাওয়ার সময়টিকেই আমরা বসন্ত বলছি। হিমালয় থেকে আসা উত্তুরে বাতাসে জলীয় বাষ্প কম, শরীর থেকেও সে জল শুষে নিতে পারে। ফলে শীতকালে ঠোঁট ফাটে, ত্বক রুক্ষ হয়ে যায়। আর সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আসা দখিনা বাতাসে জলীয় বাষ্প থাকে, ফলে আরাম বোধ হয়। এই দখিনা বাতাসকেই সংস্কৃতে ‘মলয় সমীরণ’ বলে।
উৎসবপ্রিয় বাঙালির অবশ্য বসন্ত নিয়ে হামলে-পড়া আদিখ্যেতার শেষ নেই। এ সময় হিন্দুধর্মাবলম্বীদের আছে দোল উৎসব। দোল ছাড়াও এই ষষ্ঠ ঋতুতে সরস্বতী পূজা, ভ্যালেন্টাইন’স ডে, বইমেলা, একুশে ফেব্রুয়ারি, শিবরাত্রি, বিয়ে এমন অনেক কিছুই ক্যালেন্ডারে জায়গা করে নেয়। ফাল্গুন-চৈত্রের সবচেয়ে বড় শহুরে উৎসবটি অবশ্য ক্যালেন্ডারে লেখা থাকে না। পুরো শহরে ফুটপাত থেকে বড় বড় দোকানে এবং শপিং মলে তখন ‘স্প্রিং সেল’-এর দামামা। সোয়েটার, জ্যাকেট, ব্লেজারকে এক বছরের জন্য নির্বাসন দিয়ে হাল্কা পোশাকে ফিরে আসা। পোশাকই বসন্তের অন্যতম দিকচিহ্ন। মধ্যবিত্ত ও উচ্চবর্গের নাগরিকদের জন্য ফ্যাশন ডিজাইনারদের ‘স্প্রিং কালেকশন’-এর হাতছানি। তারাই যে এই বসন্ত-ভ্যালেন্টাইন’স-এর প্রধান খদ্দের। আর আমাদের জীবনে তো এখন বাজার সংস্কৃতির কাছেই সমর্পিত!
তবু বসন্তের জয়গান গাইতেই হয়! বসন্তের জয়ধ্বজা আসলে এক জায়গায়। হৃদয়ের গোপন স্বেচ্ছাচারী কামনাকে ছাড়পত্র দেয় সে। কালিদাসের ‘ঋতুসংহার’ কাব্যে বসন্ত বর্ণনার প্রথম শ্লোকের অর্থই : ‘প্রিয়ে! রতি-লালসকামীগণের হৃদয় বিদ্ধ করিবার নিমিত্ত, ওই দেখ, প্রবল যোদ্ধার মতো বসন্তকাল উপস্থিত। সুন্দরী, তোমার ন্যায় বসন্তের সবই সুন্দর। ওই দেখো, গাছে গাছে ফুল, জলে জলে পদ্ম এবং অঙ্গনা মাত্রেই আজ কামশরে জর্জরিত।’ সংস্কৃত কবিরা কামকে যে মর্যাদা দিয়েছিলেন, বাঙালি আজও পারল না। তাই তো ভ্যালেন্টাইন’স ডে-তে প্রকাশ্য ‘চুমুর’ ঘোষণা নিয়ে এখনো বাহুল্য বাদানুবাদ হয়!
যা হোক, তার পরও তিন সত্যি হলো বসন্ত এসে গেছে। আর বসন্ত কখনো নেতির কথা বলে না, সে আশার ঋতু। শীতের জীর্ণতা, পাতা ঝরার শেষে কচি সবুজ পাতায় প্রাণের ছন্দ নিয়ে আসে সে। শীতের ঝরা পাতাতেই তো লুকিয়ে থাকে তার আগমনবার্তা। রবীন্দ্রনাথ শীত-বসন্তের এই ভাগটা ধরেছিলেন আরও জটিলভাবে। বসন্তে নতুন ফুল ফোটে, আবার শুকনো পাতাও ঝরে যায়। ‘বসন্তে কি শুধু কেবল ফোটা ফুলের মেলা রে/দেখিস নে কি শুকনো-পাতা ঝরা-ফুলের খেলা রে।’ ফোটা ফুল ও শুকনো পাতা আমাদের জীবনের একই ডায়ালেকটিকের অঙ্গ। বসন্ত উধাও, কিন্তু কামনাবাসনা আর জীবনের ডায়ালেকটিক আজও রয়ে গেছে! তাই তো বসন্ত নিয়ে আমাদের আলাপ কিংবা বিলাপেরও শেষ নেই।
সত্যি, ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক’, বসন্ত তো এসে গেছে-ই। আর বসন্ত এলে আমরা বাঙালি মধ্যবিত্তরা একটু উড়–উড়– হব না তাই কী সম্ভব? গরিব মানুষের জন্য, সংখ্যাগরিষ্ঠ বঞ্চিত মানুষজনের জন্য অবশ্য এই বসন্ত নয়! কিন্তু তাদের নিয়ে আমরা ভাবব কেন? এজন্য মার্কসবাদীরা আছেন, আছেন বুদ্ধিজীবীরা। তা ছাড়া ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে?’ তার চেয়ে ঢের ভালো আনন্দ-উৎসবে মেতে থাকা। অকারণ উল্লাসে মেতে থাকা। দিনশেষে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার আগে জীবনটাকে যতটা রঙিন করা যায়, রঙিন ভাবা যায়!
প্রকৃতিতে লেগেছে ফাগুনের মাতাল হাওয়া। পলাশ, শিমুল গাছে লাগে আগুন রঙের খেলা। চলছে মধুর বসন্তে সাজ সাজ রব। আর এ সাজে মন রাঙিয়ে গুন গুন করে অনেকেই গেয়ে ওঠেন ‘মনেতে ফাগুন এলো...’। বনের নিভৃত কোণে বা মেঠোপথের ধারে কারও দেখার অপেক্ষা না করেই ফুটে উঠেছে আরও নাম না জানা কত ফুল। এদিনেই অসংখ্য তরুণ-তরুণী বাসন্তী রঙে নিজেদের রাঙিয়ে রাজধানীর রাজপথ, পার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরসহ পুরো নগরী সুশোভিত করে তোলে। তরুণীরা গালে আঁকে নানা রঙের বসন্তবরণ উলকি, মাথায় ফুলের তাজ। বসন্তের পূর্ণতার এই ছোঁয়া শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নয়, ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে থাকা সব বাঙালির আবেগী মনে। কোকিলের কুহুতান, দখিনা হাওয়া, ঝরা পাতার শুকনো নূপুরের নিক্বণ, প্রকৃতির মিলন, সবই ঘটে যায় এই বসন্তে। যদিও এ বছর করোনার কারণে বইমেলা না হওয়ায় রাজধানীর বসন্ত-উৎসব যেন অনেকটাই মøান হয়ে গেছে!
বসন্ত মানে জড়তাকে ঝেড়ে ফেলা, বসন্ত মানে পূর্ণতা, বসন্ত মানে নতুন প্রাণের কলরব, বসন্ত মানে একে অপরের হাত ধরে হাঁটা। মিলনের ঋতু বসন্তই মনকে সাজায় বাসন্তী রঙে, মানুষকে করে আনমনা। বসন্তের এ সময়ে শীতের জীর্ণতা সরিয়ে ফুলে ফুলে সেজে ওঠে প্রকৃতি। গাছে গাছে নতুন পাতা, স্নিগ্ধ সবুজ কচি পাতার ধীর গতিতে বাতাসের সঙ্গে বয়ে চলা জানান দেয় নতুন কিছুর। পহেলা ফাল্গুন আমাদের শীতের রুক্ষতাকে বিদায় জানিয়ে নবীন বসন্তকে আহ্বান জানায়। বসন্ত যদি শুধু আমাদের ঋতু পরিবর্তনকে মনে করাত, তাহলে বসন্তের মহিমা ক্ষুণœ হতো না কিছুই। কিন্তু শুধু এইটুকু পরিচয়ের মাধ্যমে বসন্তকালের পরিচয় দেওয়া যায় না। বসন্তকাল আমাদের নতুনভাবে বাঁচতে সাহায্য করে, নতুন উৎসাহ জোগায় আমাদের অন্তরে। সেজন্যই হৃদয় বলে ওঠে, ‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে/ময়ূরের মতো নাচেরে।’
ফাগুন সন্ধ্যায় আকাশে পূর্ণচন্দ্র যখন আলোয় চতুর্দিক উদ্ভাসিত করে তোলে, তখন কার প্রাণ বলে উঠবে না ‘কে রক্ত লাগালে বনে বনে/ঢেউ জাগালে সমীরণে/আজ ভুবনের দুয়ার খোলা/দোল দিয়েছে বনের দোলা/দে দোল দে দোল দে দোল!’ আমরা জানি, জীবন সব সময় সুখের নয়। বিবাদ অশান্তি দুঃখ-দুর্দশা সেখানে আছেই। এসব নিয়েই আমাদের চলতে হয়। কিন্তু দুঃখ-অশান্তির কালিমায় মনে আবৃত রাখলে কি আমাদের জীবন সুচারু রূপে চলবে? না। কারণ জীবন পরিবর্তনশীল। আর বসন্তবরণ বা ফাগুন উৎসবের মধ্যে রয়েছে সেই উৎসাহের বার্তা। যে উৎসব বার্তা দেয় সব দুঃখ দৈন্য তুচ্ছ হোক, মুছে যাক সব ক্লেদ-কালিমা জীবন পূর্ণ হোক আনন্দরসে। আমরা আরও প্রত্যাশা করি, আমাদের রাজনীতিতে বসন্ত-বাতাস বয়ে যাক, প্রতিষ্ঠিত হোক গণতান্ত্রিক-সংস্কৃতি, ঘুচে যাক বিদ্বেষ-হানাহানি।
লেখক লেখক ও কলামনিস্ট
