জাল জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও ব্যবসায়িক সনদ (ট্রেড লাইসেন্স) দিয়ে বিভিন্ন লিজিং কোম্পানির কাছ থেকে ঋণ নিয়ে তা আত্মসাৎ করতেন বহুল আলোচিত প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার) ও তার সহযোগীরা। তারা মাত্র দুটি ঠিকানা ব্যবহার করে নামসর্বস্ব ১৪টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জে কে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নামে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। আরেকটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান এফএএস ফাইন্যান্স থেকেও জালিয়াতির মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকা তুলে নেন তারা। এ ছাড়া ব্যাংকবহির্ভূত তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ভুয়া এনআইডি ব্যবহার করে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। আর এসব জালিয়াতিতে প্রশান্তের সহযোগী ছিলেন তার বন্ধু চট্টগ্রামের ঋণখেলাপি ব্যবসায়ী আব্দুল আলিম চৌধুরী। তিনি কক্সবজারের র্যাডিসন
পৃষ্ঠা ১১ কলাম ৩ > ব্লু হোটেলের একক মালিক ছিলেন; যা প্রশান্তের কাছে ৮৪ কোটি টাকায় বিক্রি করেন। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে এসব জালিয়াতির তথ্য সামনে আসে।
প্রশান্ত ও তার সহযোগীদের দুর্নীতি অনুসন্ধান করছেন দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান। তিনি এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও নানাবিধ অনিয়মের মাধ্যমে ঋণের নামে লেয়ারিং করে বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্যাপিটাল মার্কেট থেকে অর্থ সরিয়ে আত্মসাৎ করেন প্রশান্ত। এ ক্ষেত্রে ১৪টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র দুটি।
ওই প্রতিবেদনের তথ্যমতে, রিলায়েন্স লিজিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) থাকাকালে প্রশান্ত জাল এনআইডি ব্যবহার করে দুই ব্যক্তির নামে ১৫০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছেন। তারা হলেন জে কে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক ইরফান আহমেদ খান এবং ভার্স মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক ফয়সাল মোস্তাক। এই দুই ব্যক্তির দুই প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া ঋণ দিয়েছেন প্রশান্ত। বাস্তবে ইরফান আহমেদ খান ও ফয়সাল মোস্তাক নামে কারও কোনো অস্তিত্বই খুঁজে পায়নি দুদকের অনুসন্ধান দল। ভুয়া এনআইডি তৈরি করে তাদের নামে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে। এনআইডি ও ট্রেড লাইসেন্সের ঠিকানাও ছিল ভুয়া। জে কে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নামে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে আরও প্রায় ২০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার নামে আত্মসাৎ করা হয়। আর এফএএস ফাইন্যান্স থেকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ভুয়া ঋণ দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আব্দুল আলিম চৌধুরী বেশ কয়েকটি ঋণ ইস্যু করেন পি কে হালদারের মাধ্যমে। বিনিময়ে তিনি পি কে হালদারকে বিভিন্ন ঋণ জালিয়াতি ও বিদেশে অর্থ পাচারে সহায়তা করেন। আব্দুল আলিম চৌধুরী নিজেও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন বলে তথ্য পেয়েছে দুদক। আলিম চৌধুরী কানাডার মন্টেনিগ্রোতে ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণ করেছেন। ওই হোটেলে পি কে হালদারের অংশীদারিত্ব রয়েছে। জে কে ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের নামে চট্টগ্রামে ওয়ান ব্যাংকের জুবিলি ও স্টেশন রোড শাখায় বেশ কয়েকটি হিসাব খোলা হয়েছে। একইভাবে বিডি ট্রেডিং নামে একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান খোলা হয়। যার মালিক দেখানো হয় ইরফান নামে এক ব্যক্তিকে। জে কে ট্রেডিং ও বিডি ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়ে বিদেশে পাচার করা হয়েছে ৪০০ কোটি টাকা।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনের তথ্যমতে, আলিম চৌধুরীর মাধ্যমে প্রশান্ত দুবাইয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন। দুবাইয়ে রোয়েল আমরো লিমিটেড নামে একটি হিসাবে শত শত কোটি টাকা পাচার করেছেন প্রশান্ত। প্রশান্ত একই কৌশলে ভুয়া এনআইডি দিয়ে দ্রিনান অ্যাপারেলস নামে একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ভুয়া ঋণ দিয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে। কিন্তু চেকে স্বাক্ষর করেছেন রাজীম সোম। যার এনআইডি ভুয়া ছিল। ব্যাংক এশিয়ার ধানমন্ডি শাখার যে হিসাবে টাকাগুলো স্থানান্তর হয়েছে সেখানেও তাদের এনআইডি ছিল ভুয়া। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান দ্রিনান অ্যাপারলেস লিমিটেডের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির এমডি মোহাম্মদ আবু রাজীব মারুফ ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ২০১৬ সালের ৯ মার্চ ২০ কোটি টাকা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ এবং ৪০ কোটি টাকার স্বল্পমেয়াদি মূলধনের জন্য প্রশান্তের কাছে আবেদন করেন। এই ৬০ কোটি টাকা ঋণের জামানত হিসেবে দেখানো হয় মানিকগঞ্জের ১০০ ডেসিমেল জমি। যা আনান কেমিক্যালসের নামে রেজিস্ট্রি করা ছিল। আনান কেমিক্যালসের পক্ষে কেনা পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেডের ১ কোটি ৪ লাখ ৪০ হাজার ৯০০টি শেয়ারও জামানত দেখানো হয়। গ্রাহকের আবেদন পেয়ে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ প্রস্তাব প্রস্তুত করেন ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ম্যানজেমেন্ট ট্রেইনি মর্জিনা চৌধুরী। প্রস্তাব যাচাই করেন ব্যবস্থাপক রাফসান চৌধুরী। এতে সুপারিশ করেন ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক আল মামুন সোহাগ। ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ ঋণের পক্ষে ক্রেডিট ম্যামো প্রস্তুত করেন আল মামুন সোহাগ। সেটি অনুমোদন করেন সাবেক এমডি রাশেদুল হক। প্রতিষ্ঠানের ১৮৮তম বোর্ড সভায় ঋণ অনুমোদন ও মঞ্জুর করা হয়। বোর্ড সভায় উপস্থিত থেকে স্বাক্ষর করেন চেয়ারম্যান এম এ হাসেম, পরিচালক নুরুল আলম, জহিরুল আলম, মোহাম্মদ আবুল হাশেম ও মো. নুরুজ্জামান। এভাবে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। দুদক পর্যায়ক্রমে বিষয়গুলো তদন্ত করছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুদক প্রশান্ত কুমার হালদার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা করেছে। আরও মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
পি কে হালদার বর্তমানে কানাডায় আত্মগোপন করে আছেন বলে জানিয়েছে দুদক কর্মকর্তারা।
