করোনাভাইরাসের প্রভাবে সৃষ্ট মহামারী এবং বৈশি^ক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের শ্লথগতির সঙ্গে সংগতি রেখে একদিকে স্বাস্থ্য সুরক্ষা, অন্যদিকে অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখা এ দুই চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করে আমাদের নতুন বছরের কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথচলা। এরূপ পরিস্থিতিতে ২০২১ সাল আমাদের জন্য এসেছে প্রত্যাশা, উন্নয়ন এবং অগ্রগতির পাশাপাশি নিশ্চিতভাবে মানুষের মৌলিক অধিকার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রতিষ্ঠার বারতা নিয়ে।
চীন থেকে উদ্ভূত বিশ^ব্যাপী বিদ্যমান কভিড-১৯-এর তা-বে ২০২০ সালে আমরা ১৯৩০ সালের অনুরূপ আরেকটি অর্থনৈতিক মহামন্দা অতিক্রম করেছি। বিভিন্ন দেশের গবেষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং তাদের সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কারের ফলে আমরা এ মহামারী থেকে শিগগিরই পরিত্রাণ পাব বলে আশাবাদী।
১৯৩০-এর মহামন্দার প্রভাবে বিশে^ সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষত পুঁজিবাজার, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও কর্মসংস্থানসহ সব ক্ষেত্রেই ভয়াবহ ধস নেমেছিল। এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব বিশ^নেতাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল সমন্বিত টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে চুক্তিবদ্ধ হতে। একইভাবে করোনা মহামারী আমাদের জানান দিয়েছে প্রাকৃতিক কারণে অর্থনীতিতে আকস্মিক বিপর্যয় দেখা দিলে তা মোকাবিলায় বিশ^ অর্থনীতি যেন শক্ত অবস্থান নিতে পারে সেজন্য নতুনভাবে সমন্বিত উদ্ভাবনী পরিকল্পনা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার।
করোনাকালীন বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকা-ে শ্লথগতির কারণে সম্প্রতি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের আলোচনা সাপেক্ষে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সময় আরও দুই বছর বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা নিজেদের প্রস্তুত করার কিছুটা সময় পেল। ফলে ২০২৪-এর পরিবর্তে ২০২৬ সালের পর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানিতে বিদ্যমান জিএসপিসহ অন্যান্য সুবিধাসমূহ যেমন শুল্ক সুবিধা, রপ্তানি ভর্তুকি এবং নগদ সহায়তা, কৃষিকাজে ভর্তুকি সুবিধাসমূহ বাতিল হয়ে যাবে। একই সঙ্গে রুলস অব অরিজিনের ক্ষেত্রেও বর্তমান শর্তের তুলনায় জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। বিশেষ করে পণ্যের মূল্য সংযোজন দেশ এবং অঞ্চলভেদে হবে প্রায় ৪৫ শতাংশের ঊর্ধ্বে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্তৃক জিএসপি সুবিধার ধরনও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ফলে এখনই প্রধান রপ্তানি বাজার ইইউর সঙ্গে বাণিজ্যসংক্রান্ত নীতিগত বিষয়ে আমাদের অবস্থানকে ধরে রাখার জন্য দক্ষ পরামর্শকদের সহযোগিতায় জোর তৎপরতা চালানো প্রয়োজন।
১ জানুয়ারি ২০২১ সাল থেকে ‘আফ্রিকা কন্টিনেন্টাল ফ্রি ট্রেড এরিয়া’ (এএফসিএফটিএ) অর্থাৎ আফ্রিকা মহাদেশীয় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল চুক্তি কার্যকর হওয়ার ফলে ওই অঞ্চলের ৫৪টি দেশের সমন্বয়ে বড় পরিসরে যুক্ত হচ্ছে আফ্রিকার মুক্ত বাণিজ্য এলাকা। এর ফলে বর্তমানে বিদ্যমান আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ১৬ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে প্রায় ৫০ শতাংশে। এতে আফ্রিকার বাজারে আমাদের রপ্তানি পণ্য প্রবেশে তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, চীন, জাপান, ইউরোপসহ বিশে^র প্রায় ১১০টির অধিক দেশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কার্বন নিরপেক্ষ দেশ হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ফলে শিল্পকারখানা পরিচালনায় সবুজ জ¦ালানি ব্যবহারের বিষয়টির গুরুত্ব অনেকাংশে বেড়ে যাবে। এরূপ পরিস্থিতিতে পরিবেশবান্ধব এবং ডিজিটাল পদ্ধতির সমন্বয় করে বিনিয়োগের পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং ব্যবসাবাণিজ্য পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি। অধিকাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে গুণগত মানসম্মত পণ্য উৎপাদনই এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে টিকে থাকার অন্যতম উপায়। আর তা করতে হবে যতটুকু সম্ভব নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে।
চীন এবং ইইউর মধ্যে নতুন বিনিয়োগ চুক্তির মাধ্যমে উভয় দেশ সবুজ ও ডিজিটাল পদ্ধতির সমন্বয়ে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং শিল্প খাতে নিজেদের প্রযুক্তিগত অগ্রসরতা ধরে রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরূপ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে আমাদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে শিল্প স্থাপনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং আঞ্চলিক বিনিয়োগ নীতিমালার সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি। তবে অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিটি চ্যালেঞ্জই উন্মুক্ত করে নতুন সম্ভাবনার পথ।
আমাদের এখন আমদানিনির্ভর বিদেশি পণ্যের ব্যবহার কমিয়ে দেশীয় পণ্য ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে হবে। এতে উৎপাদনকারীরা দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যমান প্রায় ১৭০ মিলিয়ন জনসংখ্যার একটি বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার পাবে। একই সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দারিদ্র্য নির্মূলের লক্ষ্যে দেশের শতভাগ জনগণের ক্রয়ক্ষমতা নিশ্চিতকরণে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির পাশাপাশি অধিক কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে আধুনিক প্রযুক্তি ও শ্রমনির্ভর শিল্প স্থাপন অব্যাহত রাখতে হবে। এরূপ পরিস্থিতিতে আর্থিক খাতসমূহের ভূমিকাও অগ্রগণ্য। এ খাতেও সংযুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অনলাইনভিত্তিক নতুন নতুন সেবা। চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আমাদের আরও উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।
পরিশেষে বলা যায়, এটা আশার বিষয় যে বিগত বছর কভিড-১৯-এর প্রভাবে অর্থনীতির চলকসমূহে নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও ইতিমধ্যে ব্যবসায়ীরা বিকল্প প্ল্যাটফর্ম তথা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাণিজ্যিক কার্যক্রম আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছেন। এরূপ পরিস্থিতিতে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং বন্দরসমূহের কার্যক্রমের গতিশীলতাসহ অন্যান্য পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে আমরা কাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হবো বলে আশা করি।
প্রধানমন্ত্রীর ত্বরিত সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে (জানুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত মোট ২৩টি খাতে প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৫৩ কোটি টাকা যা মোট জিডিপির ৪.৪৪ শতাংশ) প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা এবং তা যথাযথ সময়ে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়ার ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। করোনার মহামারীর সময়েও ২০১৯-২০ অর্থবছরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫.২৪ শতাংশ যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি ইতিবাচক।
তথাপি করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত দেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী বৃহৎ খাত, ক্ষুদ্রশিল্প ও স্বল্প পুঁজির ব্যবসায়ীরা এবং আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত কর্মীরা প্রণোদনার সুযোগ পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারছেন না। তাই প্রণোদনার সুযোগ গ্রহণের নীতিমালা আরও সহজতর করে সরকার প্রদত্ত সুবিধাসমূহ সব খাতের জন্য সহজলভ্য করা একান্ত জরুরি। পরিশেষে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে, আমদানিকৃত করোনা প্রতিষেধক টিকা পাওয়ার সুযোগ সমাজের সব শ্রেণির নাগরিক সমানভাবে পাবে বলে আমাদের প্রত্যাশা যার মাধ্যমে মানুষ পাবে নতুন কর্মস্পৃহা, অর্থনীতিতে আসবে পূর্ণ গতিশীলতা।
লেখক সাবেক প্রথম সহসভাপতি, এফবিসিসিআই এবং চেয়ারম্যান, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড
