চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা ছাত্রদের মিছিলে গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত আবুল বরকতকে অন্যদের সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যান তিনি। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি কলা ভবনের ছাদে কালো পতাকা উত্তোলনকারীদের মধ্যেও তিনি অন্যতম। একুশে ফেব্রুয়ারির ওপর ‘রক্তাক্ত ২১শে’ শিরোনামে ১৯৫২ সালেই তিনি লিনোকাট মাধ্যমে একটি ছাপচিত্র আঁকেন, যা হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ শীর্ষক সংকলনে ১৯৫৩ সালে প্রথম মুদ্রিত হয়। ‘রক্তাক্ত ২১শে’কে ভাষা আন্দোলনের ওপর আঁকা প্রথম ছবি হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের ওপর কলকাতা থেকে প্রকাশিত সুভাষ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘পরিচয়’ পত্রিকায় ‘পারবে না’ শিরোনামে মুর্তজা বশীরের কবিতা ছাপা হয় এবং কলকাতা থেকে প্রকাশিত একুশের স্মরণিকায় তার ‘ওরা প্রাণ দিল’ কবিতাটি পুনর্মুদ্রিত হয়। ২০১৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মণিপুরিপাড়ায় শিল্পী মুর্তজা বশীরের বাসায় এ সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আশফাকুর রহমান।
আশফাকুর রহমান : ভাষা আন্দোলনের ৭০ বছর হবে ২০২২ সালে। ২০২০ সালে ২০ বছরে পদার্পণ করবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এ দীর্ঘ সময়ের সাক্ষী আপনি। এ কালপরিক্রমাকে কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
মুর্তজা বশীর : ’৫২-এর পর ’৫৩ সাল থেকে ভাষাশহীদদের স্মরণে যে মিছিল হতো এবং একুশের চেতনা জনগণের মধ্যে যেভাবে প্রোথিত ছিল, ’৭১-এর পরে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সেই চেতনা অবরুদ্ধ হলো। বিজয়ের যে অগ্নিকণা ছিল, জ¦লজ¦ল করে যা চেতনাকে প্রজ্বালিত রাখত, সেটা ক্রমেই নিভে আসতে থাকে। একাত্তরের পর দেখা গেল, এটা এখন একটি উৎসবে পরিণত হয়েছে। আগে একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল প্রতিবাদ এবং একটি লক্ষ্যে সংগ্রাম। কিন্তু একাত্তরের পর যখন বাংলাদেশ পাওয়া হয়ে গেল, তখন মনে হলো আমাদের আর কিছু চাওয়ার নেই। কিন্তু চাওয়া যে ছিল। একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু ভাষার সংগ্রাম ছিল না। বাঙালিত্বের ওপর যে আঘাত জন্মের পর শিশুকে ঘুম পাড়ানোর জন্য মা যে ঘুম পাড়ানির গান গায়, নৌকার মাঝি যে গান গায়, কৃষক যে গান গায় সেগুলোর ওপর ছিল সেই আঘাত। সেই সঙ্গে একটি বিষয় কিন্তু অনেকেই ঠিক স্মরণ করে না এটা শুধু ভাষার আন্দোলন ছিল না। এটা ছিল শ্রেণি-বৈষম্যের প্রতিবাদ, সর্বস্তরে বাংলার প্রচলনের প্রয়াস। যদিও দেখা গেল, ক্রমেই এগুলো বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। দীর্ঘ এত দিন যাওয়ার পর, শহীদ মিনার কী? সেটা মিনারটির চত্বরে কোথাও ঠিকভাবে লেখা নেই। যেমন প্রতœতাত্ত্বিক স্থানগুলোয় সাইনবোর্ডে যে বিবরণ থাকে। ভাষাশহীদের নামে উল্লেখযোগ্য বা প্রধান কোনো রাস্তা ও সড়ক নেই। এখন হয়তো থাকতে পারে। তবে সবাই জানে না। এগুলো খুবই দুঃখজনক। এমনকি ’৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হওয়ার পেছনে ছিল একুশের চেতনা। যার জন্য তাদের ছিল ২১ দফা। তখনো কিন্তু ভাষাশহীদদের নামে এবং শহীদ দিবস স্মরণে রাস্তাঘাট বা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়নি। ’৭১ সাল পর্যন্ত আমি শহীদ মিনারে গিয়েছি। কিন্তু তারপর আর যাই না। শহীদ মিনারে গেলে আমার কাছে মনে হয়, কষ্টিপাথরে আমি নিজেকে বিচার করছি। যে লক্ষ্যে আন্দোলনে জড়িত হয়েছিলাম, সেটা তো সার্বিকভাবে পূরণ হয়নি। নিজেও আমি এখন শারীরিকভাবে এ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত না। ফলে নিজেকে কাপুরুষ মনে হয়, অত্যন্ত স্বার্থপর মনে হয়। তবে আমার ধারণা আগামীতে একুশে ফেব্রুয়ারি একটা আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না চেতনাও থাকবে না।
আশফাকুর রহমান : আপনার বাবা বহুভাষাবিদ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। তিনি বাংলা ভাষার গুরুত্ব এবং ভাষা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের চিন্তা করেছেন, যা আমরা তার লেখা পাঠের মধ্য দিয়ে জানতে পারি। এ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে বলতে অনুরোধ করছি।
মুর্তজা বশীর : ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যখন বগুড়ায় ছিলেন, তখন তিনি বগুড়া আজিজুল হক কলেজের প্রিন্সিপাল। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন যখন শুরু হলো, আমি তখন বগুড়া করনেশন হাইস্কুলে ক্লাস নাইনে পড়ি। আমি পড়েছি, ১৯৪৮ সালে বগুড়ায় আমার বাবা ভাষা আন্দোলনের মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তখন কমিউনিস্ট পার্টির বগুড়ার ছাত্র সংগঠনের সভাপতি ছিলেন কবি আতাউর রহমান। এ তথ্যটি আমি তার লেখায় পেয়েছি। পরবর্তীকালে গাজীউল হকের লেখায় পড়েছি, একুশে ফেব্রুয়ারির দিন বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাচীর ভেঙে যাওয়া শহীদুল্লাহ নাকি এই পথটার কথা নির্দেশ করে দিয়ে বলেছিলেন, এই পথ দিয়ে তোমরা যাও। এসব কোনো ঘটনাই আমি জানি না। কবি আতাউর রহমান ও গাজীউল হকের লেখায় আমি ভাষা আন্দোলনে শহীদুল্লাহর সম্পৃক্ততা সম্পর্কে এসব তথ্য পেয়েছি।
আশফাকুর রহমান : ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষা, মাতৃভাষা ও বাঙালিবোধ নিয়ে বিভিন্ন লেখা লিখেছেন। এ ছাড়া তিনি বাংলাকে ভারতবর্ষের ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ বা ‘সাধারণ ভাষা’ হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাবও করেছিলেন। আপনার বাবা এ নিয়ে গবেষণা করেছেন, লেখালেখি করেছেন।
মুর্তজা বশীর : তার বাহ্যিক যে চেহারা, তাকে দেখলে মনে হয় কট্টর মুসলমান। কিন্তু ভেতরে ছিলেন তিনি পুরোপুরি বাঙালি। এ কারণেই তিনি এ কথাটা ১৯৪৮ সালে ঢাকায় প্রথম সাহিত্য সম্মেলনে বলেছেন মা
প্রকৃতি আমাদের চেহারায় এমন একটি ছাপ মারিয়া দিয়াছে, টিকি টুপি দাড়ি ইত্যাদিতে পরিবর্তন হওয়ার জো নেই। এতেই বোঝা যায় বাঙালিত্বকে তিনি কখনো ভোলেননি। আরেকটা লেখায় তিনি লিখেছেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙ্গালি।’
আশফাকুর রহমান : ভাষা আন্দোলনের সূত্রে আপনার সৃজনশীল প্রয়াসও বহুমুখী। সেটি লেখায় কিংবা রেখায়...
মুর্তজা বশীর : ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে ১৯৭০ সালের প্রেক্ষাপটে আমি একটি ছোট গল্প লিখেছিলাম। গল্পটির নাম ছিল ‘কয়েকটি রজনীগন্ধা’। মুনীর চৌধুরী টেলিভিশনে এক অনুষ্ঠানে এ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের ওপর এটি একটি উল্লেখযোগ্য লেখা’। আমার লেখার বক্তব্য ছিল, যে ছেলে কোনো দিনই ভাষা আন্দোলনের চিন্তা করেনি, শহীদ মিনারে যাওয়ার কথা অনুভব করেনি, সে একজন মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে, মেয়েটি চাকরি করে। মেয়েটি ছেলেটিকে বলে, একুশে ফেব্রুয়ারি ছুটির দিন। তাই সেদিন তাদের দেখা হতে পারে। মেয়েটিকে দেখে ছেলেটি বলেছিল, তাকে দেখতে রজনীগন্ধা ফুলের মতো লাগে। এখন তো নানা ধরনের ফুল পাওয়া যায়। তখন তো এত ফুল পাওয়া যেত না। রজনীগন্ধা তো বর্ষকালের ফুল। শীতকালে রজনীগন্ধা পাওয়া যেত না। আমি ধানমন্ডিতে একটি বাড়িতে দেখেছিলাম, বড়লোকের বাড়ি, বাচ্চারা ট্রাইসাইকেল চালাচ্ছে, ভদ্রমহিলা গায়ে শাল দিয়ে উল বুনছে। সেই বাড়ির বাগানে আমি শীতকালে বাতাসে রজনীগন্ধা ফুল দুলতে দেখেছিলাম। শীতকালে রজনীগন্ধা ফুল পরিচর্যা করা কঠিন কাজ। বিষয়টি আমাকে নাড়া দিয়েছিল। মেয়েটি ছেলেকে বলেছিল, দেখা হবে তোমার সঙ্গে রমনা পার্কে। সেদিন তার জন্য রজনীগন্ধা ফুল নিয়ে আসা হয়। ছেলেটি এখন রজনীগন্ধা ফুল কোথায় পাবে? তখন সেই একটি বাড়িতে রজনীগন্ধা ফুল দেখে সেখান থেকে চুরি করে নিয়ে এলো। মেয়েটির সঙ্গে রমনা পার্কে যে রেস্তোরাঁয় দেখা করার কথা, সে সময়ের অনেক আগেই সে বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছে। শহীদ মিনারের সামনে দিয়ে সে প্রথম যাচ্ছে, সে জীবনে কখনো প্রয়োজনবোধ করেনি শহীদ মিনারে যাওয়ার। তখন সে দেখছে শহীদ মিনার অনেক ফুল দিয়ে সাজানো। কৌতূহলবশত সে শহীদ মিনারে গেল। তখন তার নিজের হাতের দিকে নজর পড়েছে। সে তাড়াতাড়ি হাতে থাকা রজনীগন্ধা ফুল বেদিতে রেখে দিল। তারপর সে রমনা পার্কে এলো। ছেলেটি মেয়েটিকে বলছে, জানো লিলি, আমি কিন্তু রজনীগন্ধা ফুল এনেছিলাম। গল্পটিতে আমি বলতে চেয়েছিলাম, একুশে ফেব্রুয়ারি হলো সবকিছুর ঊর্ধ্বে। ব্যক্তিগত প্রেম, ভালোবাসা চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে হলো একুশে ফেব্রুয়ারি।
আশফাকুর রহমান : আপনি একুশে ফেব্রুয়ারির ঘটনাবলি এবং ভাষা আন্দোলনকে ভিত্তি করে ছাপচিত্রে এঁকেছেন ‘রক্তাক্ত একুশে’। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় রেখাচিত্রও এঁকেছেন।
মুর্তজা বশীর : কবি হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ গ্রন্থটি প্রকাশের পরিকল্পনা করেন। এটি ’৫৩ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয়। তখন আমাকে গ্রন্থটির জন্য কিছু অলংকরণ করতে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের আর্ট ইনস্টিটিউটে দ্বিতীয় বর্ষ থেকে মানুষ দেখে লাইভ ড্রইং করতে দেওয়া হতো। ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলনের জন্য আমি তখন যে ড্রইংগুলো করেছি, শিল্পকলার বিচারে সেগুলো অনেক দুর্বল। তবে সে সময় যেভাবে লাশ ধরা হয়েছিল সেভাবেই আমি এঁকেছি কল্পনা থেকে নয়। সেই হিসেবে এসব রেখাচিত্র ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিল্পগুণের জায়গা থেকে এ কাজগুলো এতটা সৃষ্টিশীল না।
আশফাকুর রহমান : ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমাদের যে অর্জন সেই ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার কারণ হিসেবে আপনি কী মনে করেন?
মুর্তজা বশীর : যারা ক্ষমতায় এসেছে, এটা প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে আন্তরিকতা সেটার অভাব ছিল। এটা আমার মনে হয়েছে।
আশফাকুর রহমান : ’৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের একজন অন্যতম অংশগ্রহণকারী হিসেবে সে সময়ের কোন ঘটনাকে এখন আপনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?
মুর্তজা বশীর : আমি বিষয়টি নিয়ে তেমনভাবে চিন্তা করিনি। তবে একটা ঘটনা আমার মনে আছে। গুলি চালানোর পরে মেডিকেল কলেজের ব্যারাকের সামনে দিয়ে একটি গাড়ি যাচ্ছে। আমরা ধাওয়া করে গাড়িটাকে দাঁড় করালাম। অবাঙালি ড্রাইভার, যাত্রীরাও অবাঙালি, আমার হাতে একটা বড় ইট, গাড়িতে পেছনে বসে আছে একজন অবাঙালি সুন্দর যুবতী। আমি যখন ইট নিয়ে গাড়ির কাচে মারতে গিয়েছি দেখি মেয়েটির ভয়ার্ত চেহারা। এমনভাবে ভয়ে সে মুখ হাঁ করে ফেলেছে। ঠিক তখনই আমার মধ্যে যে শিল্পী মন সেটা জেগে উঠল। একটি সুন্দর কিছুকে আমি ধ্বংস করতে পারি না। তাই ইটসহ হাতটি নামিয়ে ফেললাম। ড্রাইভারকে বললাম, ‘আপ লোক যাইয়ে’।
আশফাকুর রহমান : আপনি বললেন যে, ভবিষ্যতে একুশে ফেব্রুয়ারির আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। এই আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে আপনি কোনো সম্ভাবনা দেখেন কী?
মুর্তজা বশীর : ভবিষ্যতে যাওয়ার দরকার কী? ’৫২ সাল, এরপর আজকে ২০১৯ সাল। এখনই তো দেখা যাচ্ছে, একুশে ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছু নয়। সবাই সাজগোজ করে উদ্যাপন করছে। একুশের যে চেতনা সেটা কিন্তু নেই। পহেলা বৈশাখে যেমন সবাই পরিপাটি হয়ে ঘর থেকে বের হয়, তেমনি একুশে ফেব্রুয়ারিতেও সবাই সাজগোজ করে বের হয়। কারণ আমাদের জীবনে উৎসব বলে কিছু নেই। একুশে ফেব্রুয়ারি এখন একটি উৎসব বিনোদন। (সংক্ষেপিত)
