নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের চাপরাশিরহাটে আওয়ামী লীগের বিবদমান দু’পক্ষের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ নিহত সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজাক্কিরের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল রবিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে চর ফকিরা ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডে পারিবারিক কবরস্থানে তার মরদেহ দাফন করা হয়। এর আগে মুজাক্কিরের মৃত্যুর খবরে গত শনিবার রাত থেকে গতকাল দিনভর তার বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের মাতম চলে। এ ছাড়া মুজাক্কির হত্যার বিচার দাবিতে গতকাল জেলাজুড়ে বিক্ষোভ-সমাবেশ হয়েছে।
এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা কোম্পানীগঞ্জে তার পূর্বঘোষিত সব কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। গত শনিবার রাত ৯টার দিকে নিজের ফেইসবুক আইডি থেকে লাইভে এসে এবং ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে তিনি পূর্বঘোষিত সব কর্মসূচি প্রত্যাহার করার ঘোষণা দেন।
কোম্পানীগঞ্জে গত শুক্রবার আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে গুলিবিদ্ধ হন সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন। পরে গত শনিবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। গতকাল সন্ধ্যার কিছু পরে ঢাকা থেকে স্বজনরা মুজাক্কিরের বাড়িতে তার মরদেহ নিয়ে পৌঁছান। এ সময় সেখানে হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। রাত সাড়ে ৮টায় চর ফকিরা ইউনিয়নের আজগর আলী দাখিল মাদ্রাসা মাঠে মুজাক্কিরের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং মুজাক্কিরের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধব অংশ নেন। এরপর পারিবারিক কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
মুজাক্কিরের মৃত্যুর খবরে গত শনিবার রাত থেকে গতকাল দিনভর তার বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের আহাজারি চলে। এ সময় মুজাক্কিরের মা-বাবা, ভাই-বোনদের কান্নায় এলাকার বাতাস যেন ভারী হয়ে ওঠে। সকাল থেকে আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী ও এলাকাবাসী মুজাক্কিরের বাড়িতে গিয়ে শোকাহত পরিবারকে সমবেদনা জানায়। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
চরফকিরা ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের নোয়াব আলী মাস্টারের ছেলে বুরহান উদ্দিন মুজাক্কির (২৫) সাত ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন। তিনি ২০২০ সালে নোয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে দর্শন বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে অনার্স পাস করে মাস্টার্সে পড়াশোনা করছিলেন। সমাজ বদলের স্বপ্ন নিয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি সাংবাদিকতায় যুক্ত হন মুজাক্কির। দৈনিক বাংলাদেশ সমাচার ও অনলাইন পোর্টাল বার্তা বাজারের প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী ও এলাকাবাসী সবার মুখে মুখে তার সুনাম। সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজাক্কিরের এমন মৃত্যুকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও ন্যক্কারজনক ঘটনা উল্লেখ করে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদেরকে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
জেলা পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দিলে তা গ্রহণ করা হবে এবং হত্যাকারীদেরকে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। এ ছাড়া সংঘর্ষের ঘটনায় এর আগে দায়ের করা দুটি মামলার তদন্ত এবং আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ।’
শুক্রবার বিকেলে চাপরাশিরহাট পূর্ব বাজারে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা অনুসারী ও উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন মুজাক্কির। এ সময় তার বুক, গলাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলির স্পিøন্টার লাগে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে প্রথমে ২৫০ শয্যা নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) শনিবার রাত ১০টা ৪০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।
সব কর্মসূচি প্রত্যাহার কাদের মির্জার : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর ছোট ভাই নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা তার ঘোষিত সব কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। গত শনিবার রাত ৯টার দিকে মেয়র মির্জা তার ফেইসবুক আইডিতে লাইভে এসে এ ঘোষণা দেন।
এক মিনিট পঁচিশ সেকেন্ডের লাইভে মির্জা বলেন, ‘নোয়াখালীর রাজনীতিতে চলমান সংকট নিরসনের সকলের আস্থার শেষ ঠিকানা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমি নেত্রীর সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে আমার ইতঃপূর্বে ঘোষিত সকল ধরনের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নিলাম।’ একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও ওবায়দুল কাদেরের হস্তক্ষেপে শিগগিরই সকল সমস্যার সমাধান ও কমিটিতে দলের ত্যাগী নেতাদের স্থান হবে বলেও আশা করেন তিনি।
গত ১৬ জানুয়ারি বসুরহাট পৌরসভা নির্বাচনের আগ থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনায় আসে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা। আর এ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন বসুরহাট পৌরসভার নবনির্বাচিত মেয়র আবদুল কাদের মির্জা। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই। এরই মধ্যে আবদুল কাদের মির্জা জেলার ডিসি, এসপি, কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি, পরিদর্শকসহ পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তোলেন। একইসঙ্গে নোয়াখালী-৪ আসনের সাংসদ একরামুল করিম চৌধুরী ও ফেনী-২ আসনের সাংসদ নিজাম উদ্দিন হাজারীর ‘অপরাজনীতি, টেন্ডার বাণিজ্য, চাকরি বাণিজ্য ও কমিশন বাণিজ্য বন্ধসহ’ বিভিন্ন অভিযোগের বিচারের দাবিতে বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা আন্দোলন করে আসছেন। এ সময় তিনি নোয়াখালী ও ফেনীর ওই দুই নেতার সঙ্গে আঁতাত করার অভিযোগ এনে নোয়াখালীর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি, পরিদর্শকের প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আন্দোলন, বিক্ষোভ মিছিল, অবস্থান ধর্মঘট ও হরতালসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছিলেন।
শটগানের গুলিতে মুজাক্কিরের মৃত্যু : গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজাক্কিরের মৃত্যু হয়েছে শটগানের গুলিতে। ফুসফুসে গুলি লাগায় তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন ঢামেকের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস।
তিনি বলেন, ‘নিহত সাংবাদিক মুজাক্কিরের মুখ, গলা, বুকে অসংখ্য ছিদ্র পাওয়া গেছে। এগুলো শটগানের গুলিজনিত ইনজুরি। শটগানের গুলিতে তার ফুসফুস ও রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে তিনি মারা যান।’
হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় শুক্রবার রাতে তাকে ঢামেক হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন শনিবার রাত ১১টায় তিনি মারা যান। রবিবার সকালে ময়নাতদন্ত শেষে তার লাশ নোয়াখালী জেলার নিজ বাড়িতে নিয়ে যান স্বজনরা। নিহত সাংবাদিকের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে শাহবাগ থানা পুলিশ।
