করোনায় বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবার মেডিকেল ভিসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। এতে সুবিধা পাবে বাংলাদেশসহ বিশে^র ১০টি দেশ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং অবিলম্বে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চুক্তি করার জোর পরামর্শ দিয়েছেন। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেছেন, এটি মূলত এয়ার বাবল চুক্তির আওতায় বিশেষ ব্যবস্থায় ভারতের সঙ্গে অন্যান্য দেশের বিমান চলাচলের মতোই বিশেষ ব্যবস্থা। সপ্তাহখানেকের মধ্যে দেশগুলোর মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন একই তথ্য জানিয়েছে।
বেবিচকসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আলোচনা চলছে। করোনা মহামারীতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কঠোর বিধিনিষেধের দরুন বিশ^ব্যাপী পর্যটন খাতে বিপর্যয় নেমে আসে। এতে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের পর ভারতই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনিতেই নানা কারণে ভারতের অর্থনীতিতে মন্দা পরিস্থিতির সঙ্গে করোনার আঘাত মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দেওয়ায় এখন বিশেষ কৌশল গ্রহণ করতে হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে এর আগে এয়ার বাবল চুক্তিতে বিশেষ ব্যবস্থায় বিশ্বের কয়েকটি দেশের সঙ্গে উড়োজাহাজ চলাচল চালু করা হয়। কিন্তু ট্যুরিস্ট ভিসার ব্যাপক চাহিদা থাকলেও তা চালু করতে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দেওয়ায় এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চুক্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চলতি সপ্তাহে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১০টি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য বিশেষ ভিসা প্রকল্পের ব্যবস্থা করতে একটি আঞ্চলিক এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চুক্তির পরামর্শ দিয়েছেন।
তারা আরও জানান, বাবল এয়ারের মতো এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, ভুটান, মালদ্বীপ, মরিশাস, নেপাল, পাকিস্তান, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চুক্তি করা হলে এ ১০টি দেশের নাগরিকরা মেডিকেল ভিসার সুবিধার পাশাপাশি পর্যটনের সুবিধাও পাবেন। আর এ কারণেই পর্যটনপ্রেমীরা এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চুক্তির জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন।
জানা গেছে, গত সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কভিড-১৯ ব্যবস্থাপনা, অভিজ্ঞতা, সুঅভ্যাস ও ভবিষ্যৎ পন্থা শীর্ষক কর্মশালায় দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি এ ধরনের বিশেষ চুক্তির পরামর্শ দিয়েছেন। এর আগে এয়ার বাবলের আওতায়ও বিশে^র কয়েকটি দেশের সঙ্গে ভারতের ফ্লাইট চলাচল শুরু করা হয়। সেই আদলেই এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চুক্তি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ সংক্রান্ত এক বার্তায় বলা হয়, মূলত করোনা মহামারীর সময় এ দেশগুলো যেভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিষয়ে নিজেদের মধ্যে সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তুলেছিল এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্বে সর্বাধিক জনবহুল অঞ্চলে মহামারীসৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে, প্রধানমন্ত্রী মোদি ওই কর্মশালায় তার প্রশংসা করেন। ওষুধ, পিপিই কিট ও নমুনা পরীক্ষার সরঞ্জামের মতো বিভিন্ন স্বাস্থ্য উপকরণ বণ্টন ও মহামারী মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক ব্যয় নির্বাহের জন্য কভিড-১৯ জরুরি তহবিল গড়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। নমুনা পরীক্ষা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা সংক্রান্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন রাষ্ট্রের সেরা অনুশীলনগুলো ভাগ করে নেওয়া এবং শিক্ষা নেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মহামারী থেকে আমাদের মূল্যবান শিক্ষা হলো সহযোগিতার মনোভাব। আমাদের উদারতা ও দৃঢ়সংকল্পের কারণেই বিশে^ এই অঞ্চলে মৃত্যুহার সর্বনিম্ন রাখতে পারায় সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। আজ আমাদের ও সারা বিশ্বের আশা, সবার কাছেই দ্রুত টিকা পৌঁছে যাক। এ ক্ষেত্রেও আমাদের অবশ্যই একই রকম সহযোগিতার মানসিকতা বজায় রাখতে হবে। এই প্রত্যাশা আরও বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য একটি বিশেষ ভিসা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দেন, যেন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে সেই দেশের অনুরোধক্রমে তারা আমাদের এই অঞ্চলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় দ্রুত ভ্রমণ করতে পারেন।
ভারতের হাইকমিশনের কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ওই ১০টি দেশের বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রীরা চিকিৎসার জন্য একটি আঞ্চলিক এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চুক্তি করতে পারেন কি না, সে বিষয়টি নিয়েও ভাবনা-চিন্তার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি জনসাধারণের মধ্যে কভিড-১৯ টিকার কার্যকারিতা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণের জন্য একটি আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার প্রস্তাবও দিয়েছেন। ভবিষ্যতে মহামারী প্রতিরোধে এ-সংক্রান্ত প্রযুক্তিভিত্তিক গবেষণার বিষয়টি নিয়েও চিন্তাভাবনা করতে পরামর্শ দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। কভিড-১৯ ছাড়াও ভারতের প্রধানমন্ত্রী জনস্বাস্থ্য নীতি ও পরিকল্পনার তথ্য বিনিময়ের পরামর্শ দিয়েছেন। আয়ুষ্মান ভারত ও জন আরোগ্য প্রকল্পের মতো সফল কর্মসূচিগুলো এই অঞ্চলের জন্য প্রয়োজনীয় কেস স্টাডি হতে পারে। এমন বাস্তবতার আলোকেই এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চুক্তির বিষয়টি তুলে আনেন।
বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান বলেন, করোনার প্রকোপ আগের চেয়ে কমে এসেছে। ভারতসহ বিশে^র অনেক দেশের সঙ্গেই আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল কমানো হয়েছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাড়াতে। এয়ার বাবলের মতোই এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে ফ্লাইট চলাচলের চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে কাজ চলছে।
বেবিচকের এক কর্মকর্তা বলেন, করোনার কারণে ভারত সরকার বাংলাদেশ, আমেরিকা, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, মালদ্বীপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, আফগানিস্তান, বাহরাইন, জাপান, কেনিয়া, ভুটান, নাইজেরিয়া, ওমান ও ইরাকের সঙ্গে এয়ার বাবল চুক্তি করেছে। এয়ার অ্যাম্বুলেন্স চুক্তি স্বাক্ষর হলে রোগীসহ অন্যান্য লোকজনও ভারত যেতে পারবে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশই লাভবান হবে। তা ছাড়া অন্য দেশগুলোও লাভবান হবে। সপ্তাহখানেকের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষর হতে পারে বলে আশা করছি।
