মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত

বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করার দাবি

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০২:৪১ এএম

জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলাকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং উচ্চ শিক্ষা ও উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি জানানোর মধ্য দিয়ে গতকাল রবিবার সারা দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একুশের প্রথম প্রহরেই হাজার হাজার মানুষ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আসেন। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে বাঙালির শোক আর অহংকারের এই মিনার। তবে করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে এ বছর কিছু বিধিনিষেধ থাকায় মানুষের উপস্থিতি কিছুটা কম ছিল। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা মানুষ বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের দাবি জানান। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলাদা বাণী দিয়েছেন। দিবসটি উপলক্ষে গতকাল ছিল সরকারি ছুটি।

একুশের প্রথম প্রহরে শনিবার রাত ১২টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তাদের সামরিক সচিবরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। প্রথমে রাষ্ট্রপতির পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এসএম সালাহউদ্দিন ইসলাম এবং এরপর প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল নকীব আহমদ চৌধুরী শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় অমর একুশের কালজয়ী গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ বাজানো হয়। তারা কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এরপর আওয়ামী লীগ সভাপতির পক্ষে দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ সময় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী ও কর্নেল (অব.) ফারুক খান এবং তথ্যমন্ত্রী ও দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, উপদপ্তর সম্পাদক সায়েম খান উপস্থিত ছিলেন।

আওয়ামী লীগের পক্ষে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ শেষে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজকে বিশ্বে বাংলা হচ্ছে ষষ্ঠ ভাষা, জনসংখ্যার দিক থেকে। অথচ জাতিসংঘ এখনো দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। আমরা আজকে একুশের মঞ্চ থেকে সেই দাবি জানাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বাধীনতার এত বছর পরও আমাদের বিজয় সুসংহত হতে পারেনি। কারণ আমাদের প্রধান শত্রু সাম্প্রদায়িকতা। সাম্প্রদায়িকতার ডালপালা বাংলাদেশে এখনো রয়ে গেছে। তাই এবারের একুশের প্রত্যয় হোক, আমরা সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষকে উপড়ে ফেলতে চাই। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের উদার অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির শেকড় উৎপাটনের প্রত্যয় আমাদের।’

গত শনিবার মধ্যরাতে ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছোঁয়ার আগেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় উপস্থিত হন। এ সময় হাজার হাজার মানুষ খালি পায়ে বুকে শোকের প্রতীক কালোব্যাজ ধারণ করে হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি’ গানে কণ্ঠ মিলিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে এগিয়ে যান। একই সঙ্গে তারা সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন এবং অন্যান্য জাতিসত্তার ভাষা ও বর্ণমালা সংরক্ষণের দাবি জানান।

জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের, সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, নৌবাহিনীপ্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শাহীন ইকবাল, বিমানবাহিনীপ্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত, পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ, ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম, র‌্যাবপ্রধান চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং আনসার বাহিনীর প্রধান পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জমানের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ, সাম্যবাদী দল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানায়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, বিদেশি সংস্থার প্রধানরাও শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

একুশে ফেব্রুয়ারির সকালে বিএনপির নেতাকর্মীরা দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমান উল্লাহ আমান ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। প্রথমে নেতাকর্মীরা বলাকা সিনেমা হলের সামনে জড়ো হন। সেখান থেকে তারা আজিমপুর কবরস্থানে গিয়ে ভাষাশহীদদের কবরে শ্রদ্ধা জানান। পরে প্রভাতফেরি করে তারা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর আগে সকালে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। বিকেলে ভার্চুয়ালি এক আলোচনা সভার আয়োজন করে বিএনপি।

এদিকে গতকাল সকালে কালোব্যাজ ধারণ করে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রভাতফেরি করে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। আওয়ামী লীগ নেতা ড. হাছান মাহমুদ, আবদুল মতিন খসরু, লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান ও আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক আবদুস সবুর, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, উপদপ্তর সম্পাদক সায়েম খান প্রমুখ এ সময় উপস্থিত ছিলেন। এর আগে সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, বঙ্গবন্ধু ভবনসহ সারা দেশে দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ ও কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়।

এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ও সিনেট সদস্যরা, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, গণফোরাম, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, শিল্পকলা একাডেমি, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ, গণতন্ত্রী পার্টি, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ভাষাশহীদদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।

এদিকে বেলা ১১টায় ভাষাশহীদদের রূহের মাগফিরাত এবং দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও উন্নতি কামনা করে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে কোরআনখানি, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

একুশের প্রহরে রাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারকে ঘিরে তিনস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। শহীদ মিনারের প্রবেশপথে তল্লাশি, সুশৃঙ্খলভাবে শহীদ মিনারে প্রবেশ করানোসহ নিরবচ্ছিন্নভাবে দায়িত্ব পালন করেন ডিএমপির সদস্যরা। প্রতিটি প্রবেশপথে একজন করে সহকারী পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে বিশেষ নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই রাজধানীতে পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও শহীদ দিবস। ডিএমপির কঠোর নির্দেশনা অনুযায়ী যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে শহীদ মিনারে প্রবেশ করেন শ্রদ্ধা জানাতে আসা লোকজন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ও সংগঠন পর্যায়ে ৫ জনের বেশি ব্যক্তিকে শহীদ মিনারে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

শহীদ মিনার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শহীদ মিনারকেন্দ্রিক প্রত্যেকটি জায়গা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। শহীদ মিনার চত্বরে আর্চওয়ে ও তল্লাশি ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। নিরাপত্তায় পুলিশ ডিএমপির সোয়াট, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও ডগ স্কোয়াডের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। দুই দিন আগে থেকেই পুরো এলাকা সুইপিং করা হয়। সাদা পোশাকে ডিবি, স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও র‌্যাব সদস্যরা দায়িত্ব পালন শুরু করেন।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে (১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ৮ ফাল্গুন) ‘বাংলা’কে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বাংলার (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ছাত্র-যুবসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষ সে সময়ের শাসকগোষ্ঠীর চোখ রাঙানি ও প্রশাসনের জারি করা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে আসে। মায়ের ভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সেদিন ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলি চালায় পুলিশ। শহীদ হন রফিক, শফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ নাম না জানা আরও অনেকে। ভাষার জন্য প্রাণ দিয়ে ইতিহাস গড়েন তারা। পরে বাংলা পায় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা। মাতৃভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গের এই দিনটিকে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো ১৯৯৯ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয়। একুশের চেতনার প্রতীক ‘শহীদ মিনার’ এখন এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ সবকটি মহাদেশের বহুভাষিক চেতনার স্মারক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত