সাত মাসে সর্বনিম্ন লেনদেন

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০২:৫১ এএম

মার্জিন ঋণ সংকট পুঁজিবাজারে নতুন করে মন্দা ডেকে আনছে। মার্জিন ঋণের সুদহার বেঁধে দেওয়ায় শেয়ার কেনায় নতুন করে ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। আবার বেশি সুদে দেওয়া পুরনো মার্জিন ঋণ সমন্বয় হচ্ছে। এতে করে একদিকে বিক্রিচাপ বাড়ছে, অন্যদিকে ক্রেতাসংকট তৈরি হচ্ছে। ফল হিসেবে গত পাঁচ সপ্তাহ ধরে পুঁজিবাজারে দরপতন চলছে। গতকাল ক্রেতাসংকট তীব্র হওয়ায় বড় দরপতনের পাশাপাশি কেনাবেচা তলানিতে নেমে এসেছে। গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হয়েছে ৪৬৭ কোটি টাকার সিকিউরিটিজ, যা গত বছরের ২৯ জুলাইয়ের পর সর্বনিম্ন।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, টানা পতনে ফ্লোর প্রাইসে ফিরে এসেছে ১০১টি কোম্পানির শেয়ার। অবশিষ্ট ২৪২টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে গতকাল দর বেড়েছে মাত্র ২৩টির। বিপরীতে কমেছে ২১৯টির। বড় মূলধনীসহ বেশিরভাগ শেয়ারের দর কমায় গতকাল ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ৯০ পয়েন্ট হারিয়ে ৫৩৮৫ পয়েন্টে নেমে এসেছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত ১৪ জানুয়ারি মার্জিন ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ নির্ধারণ করে যে নির্দেশনা এসইসি দিয়েছে, তার পর থেকেই পুঁজিবাজারে টানা পতন হচ্ছে। মাঝে মধ্যে এসইসির হস্তক্ষেপে বাজারে সাময়িক চাঙ্গাভাব ফিরে এলেও তা স্থিতিশীল হচ্ছে না। গত ১৭ জানুয়ারি থেকে বাজার পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। পরবর্তী সময়ে মার্জিন ঋণ সমন্বয়ে পাঁচ মাস সময় বাড়িয়ে ১ জুলাই থেকে নতুন মার্জিন ঋণ নীতিমালা কার্যকরের কথা থাকলেও পুঁজিবাজার ক্রমেই পেছনের দিকে যাচ্ছে। বেশি সুদে দেওয়া মার্জিন ঋণ সমন্বয়ের অংশ হিসেবে এখন থেকেই ঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ার বিক্রি করে অর্থ আদায় করছে। আবার ১২ শতাংশ সুদে নতুন করে কোনো প্রতিষ্ঠান ঋণও দিচ্ছে না। এটিই বাজার পতনের প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মার্জিন ঋণ সংকট প্রসঙ্গে এসইসির কমিশনার ড. শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে এখন ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ। এ প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ৬ শতাংশে আমানত নিয়ে ৯ শতাংশে ঋণ দিতে পারে, তাহলে পুঁজিবাজারে মার্জিন ঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোরও পারা উচিত। এ ক্ষেত্রে যারা ব্যর্থ হবে, তাদের জায়গায় নতুনরা আসবে।

ঋণ সংকট ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে বাজারের উত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শেয়ারগুলোর দর কমে যাওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী আটকে যাওয়ায় লেনদেনে নেতিবাচক প্রভাব রাখছেন। এর আগে বীমা খাতেও অনেক বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ আটকে রয়েছে। আবার কিছু বিনিয়োগকারী মূলধনী মুনাফা তুলে নিয়ে সাইড লাইনে ফিরে যাওয়ার কারণেও লেনদেন কমতে শুরু করেছে। এর বাইরে নতুন আইপিওর চাপও রয়েছে। প্রতি মাসে একাধিক আইপিওর শেয়ার নিলাম থাকায় বিনিয়োগের একটি বড় অংশ সেখানে আটকে থাকছে। আবার সেকেন্ডারি বাজারে নতুন আইপিওর শেয়ার কেনার জন্যও অনেকে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। এসব কারণেই বাজারে ক্রেতাসংকট দেখা দিয়েছে।

গত এপ্রিলে এসইসিতে নতুন কমিশন যোগদানের পর পুঁজিবাজারে চাঙ্গাভাব দেখা দিয়েছিল। তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিত ৩০ শতাংশ শেয়ারধারণ বাধ্যতামূলক করা, জেড ক্যাটাগরির কোম্পানির উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপসহ নতুন কমিশনের  বিভিন্ন উদ্যোগে গত আগস্ট থেকে চাঙ্গাভাব দেখা দেয়। তবে মার্জিন ঋণের সুদহার বেঁধে দেওয়াকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি থেকে দীর্ঘদিন পর আবারও মন্দার কবলে পড়েছে বাজার পরিস্থিতি। বর্তমানে বিদেশিদের পাশাপাশি স্থানীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বিক্রি করছেন বলে জানা গেছে। আর ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীরা অনেক শেয়ারে আটকে গিয়ে নতুন করে বিনিয়োগ সক্ষমতা হারিয়েছেন। এ কারণে ব্যক্তি বিনিয়োগকারী-নির্ভর বাজার ব্যবস্থায় চিড় ধরেছে।

চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথমার্ধে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) দিনের লেনদেন দুই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে দেখা গেছে। গত সপ্তাহেও গড় লেনদেন ৮৮৭ কোটি টাকা হতে দেখা গেছে। তবে বেশিরভাগ শেয়ার দর হারানোয় অনেকেই লোকসানে শেয়ার বিক্রি করতে চাননি। ফলে লেনদেন আরও কমে গিয়ে গতকাল তা ৪৬৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, যা আগের কার্যদিবসের চেয়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ কম।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গতকাল একমাত্র প্রকৌশল খাত ছাড়া অন্যসব খাত বাজার মূলধন হারিয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছে টেলিযোগাযোগ খাত, প্রায় ৪ শতাংশ। এছাড়া সূচকে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যাংক, এনবিএফআই, ফার্মাসিউটিক্যালস, সিমেন্টসহ অন্যান্য খাত শূন্য দশমিক ৯ থেকে ২ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত দর হারিয়েছে। বিপরীতে ওয়ালটন ও কয়েকটি ইস্পাত কোম্পানির  শেয়ারের দরবৃদ্ধির কারণে প্রকৌশল খাতের বাজার মূলধন প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে।   

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত