পায়রা সমুদ্রবন্দরের প্রথম টার্মিনাল স্থাপন

নকশা বদলে ব্যয় বাড়ছে ৪৫৫ কোটি টাকা

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০৫:১৯ এএম

পায়রা সমুদ্রবন্দরের প্রথম টার্মিনাল স্থাপন প্রকল্পে ডিজাইন পরিবর্তনের ফলে ব্যয় বাড়ছে ৪৫৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকার বেশি। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে নেওয়া এই প্রকল্পে সার্বিক অগ্রগতি মাত্র ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুমোদন পেলে বরাদ্দ দাঁড়াবে ৪ হাজার ৫১৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে, পায়রা বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনা (২য় সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পের অগ্রগতি বেশ ভালো। এ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে ৭২ শতাংশ। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজও শেষ হতে পারে বলে মনে করছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সম্প্রতি বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প দুটি সরেজমিন পরিদর্শন করে এমন প্রতিবেদন দিয়েছেন প্রকল্প তদারকি সংস্থা আইএমইডি সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী।

গত জানুয়ারিতে প্রকল্প দুটি পরিদর্শন করে এসে আইএমইডি সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী এ প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। এ প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, পায়রা বন্দরকে ঘিরে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ চলছে। সরেজমিনে গিয়ে এসব প্রকল্পের কাজে যেন আরও গতি আসে সে চেষ্টা করেছি। কোনো সমস্যা থাকলে তা সমাধানেও ব্যবস্থা করা হবে। তিনি বলেন, প্রকল্প দুটির যেন নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়, তার জন্য দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশা করি এর কাজ শেষ হলে ওই অঞ্চলের যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পায়রা সমুদ্রবন্দরের প্রথম টার্মিনাল এবং আনুষঙ্গিক সুবিধাদি নির্মাণ প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এ ব্যাপারে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, পরামর্শক কর্র্তৃক জেটির ডিটেইল্ড ডিজাইন প্রণয়নকালে জেটির পাইলগুলোর উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া পূর্বের ডিজাইনে ছিল আরসিসি পাইল যা নতুন ডিজাইনে স্টিল পাইলে রূপান্তর হয়েছে এবং পাইলের সংখ্যা ও ব্যাস বৃদ্ধি পেয়েছে। পূর্বের ডিজাইনে পাইলের ব্যাস ছিল ১০০০ মিমি এবং আরসিসি পাইলের সংখ্যা ছিল ৯৮১টি, যা নতুন ডিজাইনে পরিবর্তিত হয়ে ব্যাস হয়েছে ১১১৭.৬০ মিমি এবং পাইলের সংখ্যা হয়েছে ১৩৯১টি। যার ফলে জেটির নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি পাবে ৪৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা।

এ ছাড়া আন্দারমানিক নদীর ওপর নির্মিতব্য ব্রিজ ব্যবহার করে হ্যাবি লোডেড ভেহিক্যাল চলাচল করবে বিধায় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্রিজের গ্যাডিয়েন্ট শ্লোপ ৪ শতাংশ নির্ধারণ করায় ব্রিজের দৈর্ঘ্য ১৩০ মিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। মাটি পরীক্ষা করে মাটির ধারণক্ষমতা খারাপ পাওয়ায় ব্রিজের পাইলের সংখ্যা, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ বৃদ্ধি পায়। যার ফলে সেতুর নির্মাণ ব্যয় ৪১১ কোটি ২৭ লাখ টাকা বৃদ্ধি পাবে।

প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে বাস্তবায়নের কথা ছিল। এরপর সংশোধনী এনে এর মেয়াদকাল ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন পায়রা বন্দর কর্র্তৃপক্ষ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। সম্পূর্ণ জিওবি অর্থায়নে প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৯৮২ কোটি ১৯ টাকা, যা প্রথম সংশোধনী অনুমোদনের পর দাঁড়াবে ৪ হাজার ৫১৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।

প্রকল্পের অধীনে ৪৬২০০ বর্গমিটার প্রয়োজনীয় সুবিধাদিসহ জেটি নির্মাণ, ৬ লেন ৬ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ, আন্দারমানিক নদীর ওপর ১১৮০ মিটার সেতু নির্মাণ, ৩ লাখ ২৫ হাজার বর্গমিটার ব্যাকআপ ইয়ার্ড নির্মাণ, সার্ভিস জেটি ১০০ মিটার ও জেটি সংলগ্ন রাস্তা নির্মাণ, ২টি ওয়ার্ক বোট, ২টি টাগ বোট ও ইক্যুইপমেন্ট ক্রয়, বৈদ্যুতিক ট্রান্সমিশন লাইন নির্মাণ ৫ কিমি এবং অপটিক্যাল ফাইবার লাইন নির্মাণ ১০ কিমি ও অন্যান্য কাজ করা হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পের বিভিন্ন অঙ্গের কাজ চলমান রয়েছে। এ পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। যেহেতু প্রকল্পটি বৃহৎ আকৃতির তাই সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা (সময়াবদ্ধ) প্রণয়ন এবং পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ করে দ্রুত প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয় আইএমইডি। অন্যদিকে পায়রা বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো/সুবিধাদির উন্নয়ন (২য় সংশোধিত) প্রকল্পটির ২০১৫ সালের জুলাইয়ে অনুমোদন পায়, যা ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। সম্পূর্ণ জিওবি অর্থায়নে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন পায়রা বন্দর কর্র্তৃপক্ষ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৪ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা।

প্রকল্পটির আওতায় ৬৫৩২ একর ভূমি অধিগ্রহণ, ৩৫০০ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসন, ৪২০০ জনকে প্রশিক্ষণ, জাহাজ নির্মাণ ৭টি, বন্দরের ডিটেইল মাস্টার প্ল্যানিং ও ডকুমেন্টেশন, সংযোগ সড়ক নির্মাণ, ওয়্যার হাউজ নির্মাণ, প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ নৌরুটে ড্রেজিং করার কথা রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুসারে এ পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ, ওয়্যার হাউজ নির্মাণ, প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ এবং অভ্যন্তরীণ নৌরুটে ড্রেজিংয়ের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া বন্দরের ডিটেইল মাস্টার প্ল্যান এবং ডকুমেন্টেশনের কাজ ৫০ শতাংশ, জাহাজ নির্মাণের (৭টি) কাজ ৯৮ শতাংশ, প্রশিক্ষণ ৬১ দশমিক ৯০ শতাংশ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কাজ ৬৪ দশমিক ৫১ শতাংশ (১৩৫০ ঘরের নির্মাণকাজ সমাপ্ত) এবং ভূমি অধিগ্রহণের কাজ ৬৮ শতাংশ সমাপ্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করার লক্ষ্যে নির্মিত ১৩৫০টি বসতঘরের মধ্যে কয়েকটি ভিজিট করি। বসতঘরগুলো দুই ধরনের। একটির রুমসংখ্যা ৪টি (সাইজ : ৯৭৮ বর্গফুট) এবং অপরটির রুমসংখ্যাও ৪টি (সাইজ : ৮৮৫ বর্গফুট)। প্রকল্পের সার্বিক আর্থিক অগ্রগতি ৬১ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ৭২ দশমিক ১২ শতাংশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত