সব বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা স্থগিত

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০৬:২২ এএম

বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সর্বস্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধের পর শুধুমাত্র আটকে যাওয়া স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের শেষ বর্ষের বাকি পরীক্ষাগুলো গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু পরীক্ষাগুলো শেষ না হতেই আবারও স্থগিত করা হলো। সম্প্রতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো খুলে দেওয়ার দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করলে গত সোমবার শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি জরুরি সংবাদ সম্মেলনে পরীক্ষাগুলোও স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন। এ ছাড়া ১৭ মে আবাসিক হল খোলার এবং ২৪ মে ক্লাস কার্যক্রম শুরুর তারিখও ঘোষণা করেন তিনি। মন্ত্রীর ঘোষণার পর গতকাল পর্যন্ত দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে পরীক্ষা কার্যক্রম স্থগিত করেছে। এতে পরবর্তী শিক্ষাজীবন ও চাকরিতে প্রবেশ নিয়ে আবারও সংশয়ে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা।

গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কর্র্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, আগামী ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল খোলার কথা থাকলেও সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ১৭ মে হল খোলার ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল মতিন চৌধুরী ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের এক জরুরি সভায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভা শেষে সিদ্ধান্তগুলোর বিষয়ে উপাচার্য আখতারুজ্জামান বলেন, ১৩ মার্চকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের হলে উঠাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে আয়োজন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমরা ১৭ মে থেকে শিক্ষার্থীদের হলে উঠানোর উদ্যোগ নিয়েছি সকল শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ভ্যাক্সিনের আওতায় আনার জন্য। এদিকে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় খোলা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে হল খোলার দাবিতে গত সোমবার ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি), শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি),ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাবি অধিভুক্ত ৭ কলেজ কর্র্তৃপক্ষও তাদের পরীক্ষা কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে।

গত সোমবার শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণার পর সন্ধ্যায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পরীক্ষা কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এরপর গতকাল দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় তাদের স্ব স্ব ওয়েবসাইটে পরীক্ষা স্থগিতের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।

এদিকে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশনার পরেও হলে থাকার বিষয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরা। উপরন্তু হল খুলে প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিতের পাশাপাশি চার দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। তবে গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি হল সিলগালা এবং আরও দুটি হলে তালা দিয়ে শিক্ষার্থীদের বের করে দেয় সংশ্লিষ্ট হল প্রশাসন। এদিকে হলে থাকার বিষয়ে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে শাখা ছাত্রলীগ।

গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবনের কাউন্সিল কক্ষে প্রাধ্যক্ষ কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিক্ষার্থীরা হল না ছাড়া পর্যন্ত প্রাধ্যক্ষরা হলে অবস্থান করবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়। এরপরই প্রাধ্যক্ষরা হলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়তে অনুরোধ করেন। পরে শহীদ রফিক-জব্বার হল, শহীদ সালামন্ডবরকত হল ও ছাত্রীদের বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল সিলগালা করা হয়। এছাড়া আ ফ ম কামালউদ্দিন হল ও মীর মশাররফ হোসেন হলে শিক্ষার্থীদের বের করে তালা লাগিয়ে দেয় প্রশাসন।

বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের একাধিক ছাত্রী বলেন, ‘আমরা ছেলেদের হলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করব। ছেলেরা যদি হলে থাকে তবে আমরাও আবার হলে উঠব।’

অন্যদিকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চলমান পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে ১ মার্চের মধ্যে হল না খুললে যেকোনো মূল্যে ওইদিন হলে উঠবেন বলে জানিয়েছে ইবির আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডায়না চত্বরে সাংবাদিক সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।

পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় বিপাকে শিক্ষার্থীরা : পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। পরীক্ষা শুরুর নির্দেশনা দেওয়ার পর হল বন্ধ থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই মেসে অবস্থান করে পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিলেন এইসব শিক্ষার্থী। কিন্তু এখন আবার হঠাৎ পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় মেস ছেড়ে যাবেন কি না, সেটা নিয়েও দ্বিধায় রয়েছেন। এছাড়া শারীরিক ও মানসিকভাবেও তারা ভেঙে পড়েছেন। তারা বলছেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রীতিমতো রসিকতা করা হচ্ছে।

দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়েই চলমান স্নাতক চতুর্থ বর্ষ ও স্নাতকোত্তরের পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১৭ জানুয়ারি পরীক্ষা শুরু হলেও তা শেষ করার কথা ছিল ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে। তবে অধিকাংশ বিভাগ নির্ধারিত সময়ে সব পরীক্ষা শেষ করতে পারেনি। অধিকাংশ বিভাগের দু-একটি পরীক্ষা ও ভাইবা বাকি থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন এসব বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এদিকে বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত অনুসারে অসম্পূর্ণ পরীক্ষাগুলো শেষ করতে শিক্ষার্থীদের মাস তিনেকের মতো সময় অপেক্ষা করা লাগবে। ফলে মেস নিয়ে ভোগান্তি, অর্থনৈতিক সমস্যা ও মানসিকভাবে হতাশায় পড়েছেন বলে দাবি করছেন তারা।

এদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) প্রশাসনের চলমান চূড়ান্ত পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্তে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর মিলিয়ে আটকে গেছে ৫৮টি সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা। এতে করে ফের ভয়াবহ সেশনজটের কবলে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সর্বত্র স্বাভাবিক চলাচল থাকলেও হঠাৎ করেই চলমান পরীক্ষা বন্ধ করা অযৌক্তিক। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্নাতকের ১৮টি এবং স্নাতকোত্তরের ১৪টি সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। হঠাৎ পরীক্ষা স্থগিত করায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর মিলিয়ে মোট ৫৮টি সেমিস্টারের চলমান পরীক্ষা আটকে যায়।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের বলেন, সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করে ডিন ও প্রভোস্টদের সম্মতিক্রমে সব ধরনের পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমাদের কিছু করার নেই। সরকারি নির্দেশনা পেলে আমরা আবার পরীক্ষা শুরু করব।

প্রতিবেদনটি তৈরি করতে দেশ রূপান্তরের নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি সহযোগিতা করেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত