রাজনীতিবিদ ও আমলাদের অঙ্গীকার

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১১:৪২ পিএম

কয়েক দিন আগে সকাল বেলার আড্ডায় এক বন্ধু মন্তব্য করে বসলেন যে, দেশে প্রকৃত শাসন ক্ষমতা আমলারাই ভোগ করে থাকেন; রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিরা কালিক ব্যবধানে ক্ষমতার কাঠামোতে আসা-যাওয়া করেন মাত্র, সেটা ভোগ করতে পারেন না। তার যুক্তি আমলাতন্ত্র স্থায়ী, সেখানকার নিয়োজিত লোকবল মেধাবী, শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত, প্রশাসন চালাতে তারা অভিজ্ঞ, তারা উচ্চ বেতনভুক্ত, তাদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পর্যাপ্ত, থাকেন শহরের বনেদি এলাকায়, কাজকর্ম যাই করুন না কেন, গাড়ি-ঘোড়া সারাক্ষণ, আবার কাজ করেন পর্দার আড়াল থেকে, উতরে গেলে সে নেপথ্য নায়ক, আর গড়বড় হলে পগার পাড়। পক্ষান্তরে রাজনীতিবিদদের অবস্থা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উল্টো। তাছাড়া, তাদের প্রায় সার্বক্ষণিক থাকতে হয় জনমানুষের সঙ্গে, তাদের কথা শুনতে এবং সমস্যা মোকাবিলায় অবস্থান করতে হয় মফস্বলে। কাজেই যে স্বল্প সময়ের জন্য তারা ক্ষমতায় আসীন হতে পারেন, তাত্ত্বিকভাবে তখন সব কিছু থাকলেও ভোগের সময় কোথায়?

বন্ধুর সঙ্গে তর্কে না জড়িয়ে শুধু এই কথা বললাম যে, রাজনীতি আর আমলাতন্ত্রের মাঝে কোনো তুলনা চলে না; দুটো এক জিনিস নয়, এদের কাঠামো, অবয়ব ও লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ক্ষমতায় থাকলে দক্ষ আমলাতন্ত্র যেমন রাজনীতির জন্য সহায়ক, তেমনি ক্ষমতার বাইরে থাকলে ওটা তার জন্য উৎপীড়ক। অপর পক্ষে রাজনীতি একটি মিশন; একটি ভিশন, একটি অঙ্গীকার ও একটি আদর্শ। ব্যক্তিগত স্বার্থের সেখানে স্থান নিতান্তই গৌণ; সমষ্টির মুক্তি, স্বাধীনতা, ভাগ্যোন্নয়ন সেখানে বড় কথা। এটা কোনো পেশা নয়, বরং নেশা, যাকে আসক্তিও বলা চলে। এই আদর্শের আসক্তিতেই চে গুয়েভারা পুরো ল্যাটিন আমেরিকা ও আফ্রিকা চষে বেড়িয়েছেন, আর্জেন্টিনার নাগরিক হয়েও কিউবায় বিপ্লব করেছেন, মন্ত্রিত্বের বিলাসিতা ছেড়ে কঙ্গো-বলিভিয়ার বৈপ্লবিক রঙ্গমঞ্চে অবস্থান নিয়েছিলেন।

আর আমলাতন্ত্র ব্যক্তির জন্য একটি পেশা; প্রতিষ্ঠানের জন্য লক্ষ্য অর্জনের মোক্ষম হাতিয়ার। আমলার লক্ষ্য ব্যক্তিগত ও পেশাগত উন্নতি, আরাম-আয়েশ বর্ধন, যশ ও প্রতিপত্তি লাভ; সেখানে নীতি-নৈতিকতা বা আদর্শ তেমন একটা কল্কে পায় না। এজন্য সে তার পেশাদারিত্ব দিয়ে তার প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখেন এবং অধস্তন কার্যালয় ও লোকবল বৃদ্ধির কাজে প্রবৃত্ত হন, পরিণামে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হলেও সমস্যা নেই। ব্রিটিশ অধ্যাপক C. Northcote Parkinson তার বিখ্যাত Z Parkinson’s Law বইয়ে সেই ষাটের দশকে অনেক তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে ব্রিটিশ নেভিতে কাজ কমে যাওয়া সত্ত্বেও লোকবল বৃদ্ধি পাচ্ছিল ১৯১৪ সালে যুদ্ধজাহাজ ছিল ৬২টি, আর অ্যাডমিরালটি অফিশিয়াল সংখ্যা ছিল ২,০০০। ১৯২৮ সালে জাহাজের সংখ্যা নেমে আসে ২০টিতে, অথচ তখন অফিশিয়াল সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩,৫৬৯; কাজের ৬৭.৭৪ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির বিপরীতে লোকবলের ৭৮.৪৫ শতাংশ ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি। এই প্রবণতা আমলাতন্ত্রের সর্বত্র দৃশ্যমান।

মহাত্মা গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় চুক্তিভিত্তিক কাজ করা ভারতীয় শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং তাদের কল্যাণে কাজ করতে গিয়ে নিজেকে নেতা হিসেবে আবিষ্কার করেন। সেখানে তিনি তাদের জন্য Natal Indian Congress প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানকার ভারতীয়দের জন্য তার স্বার্থহীন সেবার নিদর্শন হিসেবে নাটাল কংগ্রেস তার ভারত প্রত্যাবর্তনের মুহূর্তে অনেক সোনা, রুপা ও হীরার জুয়েলারি উপঢৌকন হিসেবে দেন। এর আগে ১৮৯৬ সালেও ভারত আসার প্রাক্কালে তারা তাকে প্রচুর সোনাদানা উপহার দেন। তার অভিমত ছিল এই যে, জনসেবকদের মূল্যবান উপহার গ্রহণ করা সাজে না। কাজেই আগের গুলোসহ তাকে দেওয়া সমস্ত জুয়েলারি তিনি সেখানকার ভারতীয় সম্প্রদায়ের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য অছি-দলিল করে কংগ্রেসে ফেরত দেন। তার সন্তান-সন্ততিরা এই কাজে সম্মতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তার স্ত্রী কস্তুরবাই সে সময় যে সোনার কণ্ঠহারটি উপহার পেয়েছিলেন, সেটি তিনি কিছুতেই ফেরত দিতে রাজি ছিলেন না। তার কথা ছিল যে তিনি সাত্ত্বিক হতে পারেন, কিন্তু তার পুত্রবধূদের সোনার প্রয়োজন হবে। অনেক তর্কাতর্কির পর অনেকটা জবরদস্তি করে তিনি ঐ কণ্ঠহারও ফেরত দিতে সক্ষম হন।

আজকের দিনে হজরত মোহানিকে অনেকেই চিনবেন না; কিন্তু ওস্তাদ গুলাম আলি ও জগজিৎ সিং-এর গাওয়া ‘চুপকে চুপকে রাত দিন’ গজলটি এবং ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি সম্ভবত অনেকেই শুনে থাকবেন। এ দুটিই এই উর্দু কবি, দার্শনিক ও স্বাধীনতা যোদ্ধা রাজনীতিকের অমর সৃষ্টি। মানুষের মুক্তির জন্য স্বার্থহীন আত্মোৎসর্গের তিনি ছিলেন এক জ্বলন্ত উদাহরণ। তার পুরো নাম ছিল সৈয়দ ফজল-উল-হাসান। উত্তর প্রদেশের মোহানে তার জন্ম হওয়ায় তিনি ‘হজরত মোহানি’ নামে সমধিক পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভ্য ছিলেন, আবার ১৯১৯ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম লিগেরও সভাপতিত্ব করেন। তিন ছিলেন দেশবিভাগের ঘোরতরবিরোধী; দেশবিভাগের পরিকল্পনা ঘোষিত হওয়ার পর তিনি মুসলিম লিগ থেকে পদত্যাগ করেন এবং স্বাধীন ভারতবর্ষে থেকে যান। তিনিই একমাত্র রাজনীতিক যিনি ১৯২১ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লিগের সভায় প্রথম পুরো আজাদির দাবি তোলেন। তিনি ভারতের সাম্যবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ১৯২৫ সালে ভারতবর্ষকে সোভিয়েত ধাঁচে ছয়টি ফেডারেল রাজ্যে ভাগ করে ইউনিয়ন গঠনের প্রস্তাব করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে তার অবদানের জন্য স্বাধীন ভারতে তাকে সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন কমিটিতে একজন অন্যতম সদস্য মনোনয়ন করা হয়। কিন্তু সংবিধানে মুসলিম জনতার জন্য প্রয়োজনীয় রক্ষাকবচ না থাকায় তিনি খসড়া সংবিধানে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকেন। তিনি জীবনে কখনো কোনো সরকারি ভাতা বা সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেননি। সব সময় রেলগাড়ির তৃতীয় শ্রেণিতে ভ্রমণ করতেন। কারণ জিজ্ঞাসিত হলে বলতেন এর নিচে আর নিচে কোনো ক্লাস নেই যে। অন্যান্যের মধ্যে ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক কুলদিপ নায়ার এবং তৎকালীন বাংলার প্রগতিশীল মুসলিম লিগ অংশের অন্যতম নেতা আবুল হাশিম ছিলেন তার অনুসারী।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম যোদ্ধা এবং ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের হিরো হিসেবে খ্যাত জয় প্রকাশ নারায়ণ (জেপি) রাজনীতিতে এসেছিলেন মাওলানা আবুল কালাম আজাদের অসাধারণ বাগ্মিতায় মুগ্ধ হয়ে। ১৯১৯ সালের রাওলাট অ্যাক্টের প্রতিবাদে মহাত্মা গান্ধী যখন অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন, তখন তার অংশ হিসেবে ইংরেজি শিক্ষা বর্জনে মাওলানার উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে পরীক্ষার মাত্র ২০ দিন বাকি থাকতে তিনি বিহার ন্যাশনাল কলেজ ছেড়ে রাজেন্দ্র প্রসাদ প্রতিষ্ঠিত বিহার বিদ্যাপীঠে চলে আসেন। এরপর উচ্চশিক্ষার্থে কার্গো শিপে করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ১৯২২ সালে সেখানে পৌঁছে প্রথমে বার্কলে’তে ভর্তি হন। তারপর আর্থিক অনটনে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তন করতে থাকেন। লেখাপড়ার খরচ জোগাতে সেখানে মোটর গ্যারেজে মেকানিক, কসাইখানার কর্মচারী হিসেবে কাজ করা থেকে শুরু করে হেন নিম্নমানের কাজ ছিল না, যেটা তিনি করেননি। এখানেই কার্ল মার্ক্সের উধং Das Kapital এর সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। এখানেই শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তার দৃঢ় প্রতীতি জন্মে যে, মার্ক্সবাদই তাদের দুঃখ-কষ্ট ঘোচানোর একমাত্র পথ।

১৯২৯ সালে ভারতবর্ষে ফিরলে জওয়াহেরলাল নেহরুর আমন্ত্রণে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান করেন। ১৯৪৮ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করে প্রজা সোশালিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় দীক্ষিত এই নির্লোভ ও স্পষ্টবাদী মানুষটাকে নেহরু সব সময় পাশে রাখতে চাইতেন। নেহরু মনে করতেন যে, তিনি অভ্রান্ত কোনো দেবপুত্র নন। কিন্তু তার সহকর্মীরা তার সামনে কোনো দ্বিমত পোষণ করার ক্ষমতা রাখেন না। এই জন্য ১৯৫২ সালে লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের বিপুল বিজয়ের পর নেহরু জেপিকে মন্ত্রিসভায় বিবেকের ধারক-বাহক হয়ে তার ডেপুটি হিসেবে যোগদানের প্রস্তাব করেন। কিন্তু ক্ষমতার প্রতি নির্মোহ এই মানুষটি নেহরুর সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হওয়ার লোভনীয় প্রস্তাবটি অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করেন।

ব্রিটিশ ভারতে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের এক সময়ের তরুণ ছাত্রনেতা রাজনীতির উদীয়মান বরপুত্র বঙ্গবন্ধু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি এবং বাঙালি জাতির জনক হয়েছিলেন তার অসামান্য ত্যাগ ও অদম্য সাহসিকতার জন্য। বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে তিনি তার ৫৫ বছরের জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন জেলের মধ্যে কাটিয়েছেন, দুই বার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন। তারপর স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি বেঁচেছিলেন মাত্র ১ হাজার ৩১৪ দিন। মানুষ যেখানে সব সময় ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়, সেখানে ১৯৫৭ সালে তিনি প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে পূর্ণকালীন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দল গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। আসল রাজনৈতিক কর্মীর এই হলো অঙ্গীকার, এই হলো আদর্শ। 

একজন রাজনৈতিক কর্মী মানুষকে স্বপ্ন দেখান, মুক্তির পথ বাতলান, জনমত গঠনে প্রবৃত্ত হন, সুযোগ দেখে বিপ্লব ঘটান। এই পথ বড়ই কণ্টকাকীর্ণ, বন্ধুর ও পিচ্ছিল। এ পথে বাঁধাধরা কোনো ছক নেই, পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী ছক আঁকতে হয়। দুর্ভোগ, নির্যাতন, নিপীড়ন সেখানে অনিবার্য; সাহস সেখানে অপরিহার্য। এর বিপরীতে আমলার কাজ হলো তার রাজনৈতিক প্রভুর নির্দেশে প্রশাসনিক কাঠামো গঠন ও আইনকানুন প্রণয়নে সহায়তা দান, লক্ষ্য অর্জনে আইনকানুন, বিধিবিধান ও নীতি-নির্দেশনার বাস্তবায়ন। এ পথ মসৃণ ও স্বচ্ছন্দ। এখানে ব্যস্ততা আছে, সেই সঙ্গে আছে ভৃতি ও বৈভব। আছে আইনকানুন ও বিধিবিধানের ছক। আর আছে ক্ষমতা, দায়িত্ব ও পদোন্নতির পিরামিডিক স্তর-বিন্যাস; আরও থাকে যে কোনো সংস্কার এবং পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। কিন্তু সেখানে লক্ষ্য অর্জনে থাকে না সেই অর্থে কোনো অঙ্গীকার। এই ছকের গণ্ডিতে এবং স্তরে থেকে কাজ করার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞ হয়ে আমলা তার সৃজনশীলতা ও গতিশীলতা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেন। শেষে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে আইনকানুন রক্ষা করাই যেন তার মোক্ষ, মানুষের কল্যাণ সাধন সেখানে গৌণ।

প্রখ্যাত হিন্দি সাহিত্যিক কৃষণ চন্দর তার ‘জামুন কা পেড’ (জামগাছ) গল্পে এই বিষয়টি বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিতে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন; যেখানে দেখানো হয়েছে যে, সেক্রেটারিয়েটের পাশে জামগাছে চাপা পড়ে মানুষ মারা যাচ্ছে, তা দেখতে আমলাদের কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু আইনকানুন আর স্তর-বিন্যাস ভেঙে তাকে উদ্ধার করতে গেলে অসুবিধা আছে। এই বিধিবিধানের দৌরাত্ম্য ও লক্ষ্য অর্জনে অঙ্গীকারের অভাবে সহজে ব্যবসা করার সূচকে আজ আমাদের অবস্থান ১৬৮; দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু আফগানিস্তানের সামান্য ওপরে। বুঝুন ঠেলা।

অনেক সংগ্রামের পর বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে উঠেছে; আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনেক বড় স্বপ্ন আমাদের সামনে হাজির করেছেন। কিন্তু সেখানে যেতে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। এদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দেশ-বিদেশের বড় বড় খ্যাতিমান সব প্রতিষ্ঠান যেভাবে উচ্ছ্বসিত প্রশংসার প্রাক্কলন উপস্থাপন করছে, তাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন সংবেদনশীল, গতিশীল ও দক্ষ আমলাতন্ত্র। পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা সমূলে উৎপাটনের ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের দেশের প্রধান নির্বাহী যথার্থই বলেছেন যে আইনকানুন ও বিধিবিধান উন্নয়নের পরিপন্থী হলে সেগুলো দ্রুত পরিবর্তন করে অগ্রযাত্রার পথকে মসৃণ করতে হবে। আগের চেয়ে এখন এই পরিবর্তন-যোগ্যতা ও গতিশীলতার প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি।

এখন পরিবর্তনের গতিতে ক্রমবর্ধমান ত্বরণ যুক্ত হচ্ছে; বিগত শতাব্দীতে সমাজ, অর্থনীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে যে পরিবর্তন এসেছে, এখন তার অনেকটা এক দশকেই পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থা আমাদের দ্রুত উন্নতি করার সুযোগও এনে দিয়েছে। আমাদের এখন শুধু সেই স্বপ্ন সময় মতো বাস্তবায়ন, ধারণ ও লালন করার সামর্থ্য অর্জন করতে হবে; প্রশাসন ও আমলাতন্ত্রে আনতে হবে রাজনৈতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ সংস্কার; একে করতে হবে ক্ষুদ্রকায়, কিন্তু সর্বাধুনিক জ্ঞানে আলোকিত ও দক্ষ।    

আমাদের দুর্ভাগ্য এই যে, বর্তমানে আদর্শবাদী নির্মোহ রাজনীতিকের সংখ্যা দ্রুত ক্রমহ্রাসমান; জাতীয় সংসদের সদস্যদের ষাট শতাংশের বেশি ব্যবসায়ী; বাকিদের অনেকেই পুঁজির আগ্রাসনের শিকার হতে বেশি সময় নেবে বলে মনে হয় না। ব্যবসা আর জনসেবা কখনো একসঙ্গে ভালো চলতে পারে না; গরু মেরে জুতা দানের মতো অবস্থা হয় আর কি। সেই জন্য আদর্শবান অঙ্গীকারবদ্ধ রাজনীতিকদের সামনে আনতে হবে; আনতে হবে সুশাসন। বেসরকারি খাতকে প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, আর ব্যবসাকে রাজনীতি থেকে যতটা সম্ভব বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা নিতে হবে। সেই সঙ্গে রাজনীতিতে যেভাবে ক্ষমতালোভী ও অর্থলিপ্সু কাউয়াদের আবির্ভাব ঘটছে, সেটাও থামানো দরকার। এটা যত তাড়াতাড়ি করা সম্ভব হবে, ততই দেশের জন্য মঙ্গল হবে। আমলারা যতই আগডুম বাগডুম করুন না কেন, আসল ক্ষমতা ও তার দায় জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে রাজনীতিকদেরই; দেশের সংবিধান সে-কথাই বলে।

লেখক খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত