এ লেখা লিখতে লিখতেই চোখের সামনে জাভেদ হুসেনের মুখ ভেসে উঠছে। শেষ যখন ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল তখন জাভেদের বয়স ছিল মেরে কেটে দশ। তার ঠিক দু’বছর আগে দু’হাজার দুই সালে ভয়ংকর গুজরাট গণহত্যার পরে পরেই দীর্ঘ এক ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম চোখের সামনে পরিবারের দশ জন স্বজন হারানো জাভেদের। সারা গুজরাট তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান বা ইরাকের চেহারা নিয়েছে।
আহমেদ শাহ আবদালির সাধের আহমেদাবাদ এক পরিত্যক্ত নগরী। আপাত স্বাভাবিক শহরের জনজীবন থেমে নেই। বাস, প্রাইভেট গাড়ি একের পর এক হু হু করে সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে। দোকান বাজার খোলা। মাঝেমধ্যে হোর্ডিংয়ে ঝুলছে সে সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাসিমুখের ছবি। নীরবে সারিবদ্ধভাবে হেঁটে যাচ্ছে প্যারা মিলিটারির দল। সব আছে। সব চলছে। কিন্তু কারোর মুখে কোনো কথা নেই। হাসি নেই। যেটুকু যা হাসিমুখ তা ওই হোর্ডিংয়ে ঝোলা একজনেরই। নরেন্দ্র ভাই দামোদর দাস মোদির। এমন নিস্পৃহ শহর আগে কখনো কোথাও দেখিনি। শহরের প্রাণশক্তি অজ্ঞাত কেউ সম্পূর্ণ কেড়ে নিয়ে যেন ছিবড়ে করে ফেলে রেখেছে। সরকারি জবানিতে গুজরাট আসা ইস্তক শুনে আসছি আর কোথাও কোনো গোলমাল নেই। সব এখন শান্ত। কিন্তু সন্ধ্যে নামতে না নামতেই জনশূন্য শহরে শুধুই মিলিটারি বুটের মশমশ আওয়াজ। হোটেলের ছাদ থেকে চোখে পড়ছে এখানে ওখানে আগুনের হলকা। দূর থেকে ভেসে আসা লোকজনের আর্তচিৎকার।
ওই প্রথম এদেশের নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের ওপর সংঘ পরিবারের আক্রোশ দেখতে দেখতে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল আমাদের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার আসল চেহারা। ওই একটা ডকুমেন্টারি করার অভিজ্ঞতা আমার জীবন দর্শন বদলে দিয়েছে। আজ এত বছর পরেও কেমন আঁতকে উঠে মনে পড়ে যায় জাভেদ হুসেনদের সব খোয়ানো হাহাকার। কালুপুরা খানপুরা নারোদা পাতিয়ায় হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়া টুকরো টুকরো দগ্ধ আখ্যান। শাহ আলম দরগায় আশ্রয় নেওয়া জাভেদ যেমন অঝোরে কাঁদছিল প্রিয়জন চলে যাওয়ার কথা বলতে বলতে।
গণহত্যার ঠিক দু’বছর পরে ফের গিয়েছিলাম গুজরাট। মহাত্মা গান্ধীর সবরমতী তখন শান্ত। নদীতীরে তরুণ-তরুণীর জমজমাট আড্ডা। নারোদা পাতিয়ার মসজিদে রং হচ্ছে। আপাত শান্ত পরিস্থিতি। কিন্তু দুটো সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন কি চট করে মুছে যায়! গণহত্যার গুজরাট নিয়ে ছবিটা জাভেদ একা একা মন দিয়ে দেখছে। নিজের ইন্টারভিউ দেখার সময় ওর চোয়াল কেমন শক্ত হয়ে উঠল। তারপর আর কখনো জাভেদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি। শুনেছি ওর কোনো সম্পর্কিত মামার কাছে চলে গিয়েছিল হায়দ্রাবাদে। এখন ওর বয়স ছাব্বিশ-সাতাশতো হবেই। চোয়াল নিশ্চয়ই এখনো শক্ত হয়ে যায় গুজরাটের কথা মনে পড়লে। মনে মনে নিশ্চয়ই খোঁজ করে ঠিক কী অপরাধে তার জীবনটা কেন এক রাত্তিরে তছনছ হয়ে গেল!
আমরা সবাই যদি এই এক প্রশ্নের উত্তর খুঁজি তাহলেই দেখবেন ঘৃণা বিদ্বেষের রাজনীতি থেকে মুক্ত হব। শুধুই মুখে মুখে ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ বললে কখনো কোথাও সার্বিক বিকাশ হতে পারে না।
হতে যে পারে না তার বড় প্রমাণ এক বছর আগে দিল্লির দাঙ্গা। আসলে মুখে যতই মিষ্টি মিষ্টি কথা বলি না কেন অস্বীকার করে লাভ নেই, যত দিন যাচ্ছে ততই আমাদের অভিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা দূরে সরে যাচ্ছে। নেলি, ভাগলপুর, মুজাফফরনগর, ভাওনা এসব তো ছিলই, তার সঙ্গে নতুন সংযোজন গত বছরের দিল্লি।
গত বছরের তেইশে ফেব্রুয়ারি আগুন জ্বলে উঠেছিল উত্তর-পূর্ব দিল্লির খাজুরি খাসের শেরপুর চকে। সন্ধ্যে সাতটা সাড়ে সাতটায় আচমকাই স্লোগান উঠল ভারত মাতা কি জয়, অমুক জিন্দাবাদ, জয় শ্রী রাম, ইত্যাদি। হাড়হিম করা স্লোগান দিতে দিতে উন্মত্ত জনতা হামলা চালাতে লাগল নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের ওপর। তারপর যা হয়। কত কত নতুন নতুন লাশের সংখ্যা এদেশের দাঙ্গার ইতিহাসে ঢুকে পড়ে কোনো কারণ ছাড়াই।
শাহীনবাগের ‘এনআরসি’ ও ‘সিএএ’ বিরোধী ধরনা তুলে দেওয়ার হুমকি চলছিল প্রকাশ্যেই। তা যে ফাঁকা আওয়াজ নয় তা একতরফা হামলা চালিয়ে প্রমাণ করে দিল শাসক ঘনিষ্ঠ দুর্বৃত্তরা। খবরের কাগজে আজ তাদের নেতা কপিল মিশ্র বলেছেন, যা করেছি তার জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। দরকার হলে আবার করব।
১৯৯১ সালের একই দিনে, ২৩ ফেব্রুয়ারি কাশ্মীরের কুপওয়ারা জেলার দুটি গ্রাম পোশপোরা ও ক্যাননে গভীর রাতে বেছে বেছে আক্রমণ চালানো হয়েছিল মেয়েদের ওপরে। তখন কিছুদিন তা নিয়ে হৈচৈ হয়েছিল তারপর যা হয় গণতন্ত্রের সুবাতাসের ছন্দে পুরনো ক্ষত চাপা পড়ে যায়। এক বছর আগে কাশ্মীরের চিন্তায় ঘুম ছিল না আমাদের সরকারের। এখন সে কেমন আছে তা কেউ জানি না।
ফেব্রুয়ারি এদেশে বড় গুরুত্বপূর্ণ মাস। এ মাসেই কখনো দিল্লি, কাশ্মীর বা গুজরাট সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হয়। সাতাশে ফেব্রুয়ারি গোধরা কা-ের মধ্য দিয়ে গণহত্যার সূচনা হয়েছিল। বলা যেতে পারে গুজরাট ছিল হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির গবেষণাগার। আজ তার যে রমরমা তা ওই জাভেদ হুসেনদের যন্ত্রণা হাহাকারের মধ্য দিয়েই। কাশ্মীর, গুজরাট, দিল্লি কোনো কিছুই বিচ্ছিন্ন নয়।
এখন সামনে পশ্চিমবঙ্গের ভোট। চরম সাম্প্রদায়িক তাস ইতিমধ্যেই ফেলা শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচনের দিন যতই এগোবে ততই এই বিভাজনের রাজনীতি তীব্র হবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা
