আমাদের রাজনীতি মোটের ওপর নির্বাচননির্ভর গণতন্ত্রেই আটকে আছে। তাও এখন অনেকটা প্রশ্নবিদ্ধ। তার পরও এ দেশে দলীয় রাজনীতির শক্তিশালী তৃতীয় ধারা যেহেতু এখনো গড়ে ওঠেনি, তাই নির্বাচনী হাওয়া এলে সবারই দৃষ্টি চলে যায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দিকে। এরশাদের জাতীয় পার্টির নেতাদের কণ্ঠ মাঝেমধ্যে উচ্চকিত হয় বটে, তবে এ দলের প্রতি মানুষের আস্থাশীল হওয়ার মতো অবস্থা এখনো তৈরি হয়নি। বিএনপি রাজনীতির ব্যাকফুটে চলে যাচ্ছে। রাজনৈতিক ভুলের মিছিলে দাঁড়িয়ে কেবল আন্দোলনের আওয়াজই দিয়ে যাচ্ছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে না গিয়ে এবং সন্ত্রাসের পথে হেঁটে শেষ পর্যন্ত দলকে অনেকটা পিছিয়ে দিয়েছিলেন দলটির নেতারা। এরপর থেকে বিবৃতি পাঠ আর ঘরোয়া অনুষ্ঠানে রাজা-মন্ত্রী মারা ছাড়া রাজপথে দাঁড়ানোর সক্ষমতা দেখাতে পারেনি বিএনপি। সম্প্রতি কয়েকটি ইস্যুতে বিএনপি মাঠে নামার চেষ্টা করছে। কিন্তু তাও তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে দীর্ঘ অনভ্যাসে বিএনপি কর্মী-সমর্থকরাও আন্দোলনে নামাটা ভুলতে বসেছেন। গণতন্ত্রচর্চার দুর্বলতার কারণে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথেও এখন কোনো দলই হাঁটতে পারছে না।
আশাবাদী আমরা, যারা গণতন্ত্রের বিপন্ন দশা দেখেও হতাশ হই না। যদিও চলমান রাজনীতির প্রতি জন-আস্থা তৈরি হয়নি। প্রতিদিনই স্বপ্নবুনি গণতন্ত্র ফিরে আসবে এই আশায়। বিশ্বাস করি মানুষের চাওয়া নিষ্ফল হতে পারে না। আর এ কথাও সত্য যে, হাওয়ায় ভেসে আসে না গণতন্ত্র। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রধান কারিগর হচ্ছেন রাজনীতি অঞ্চলের মহিমান্বিতরা। তাই ক্ষমতার দৌড়ে থাকা আমাদের রাজনীতিবিদদের প্রতি যত অভিযোগই থাকুক তাদের দিকেই অবশেষে আশা নিয়ে তাকাতে হয়। এ কারণেই সচেতন মানুষ কখনো চাইবে না আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো অন্ধকার গহ্বরে নিপতিত হোক। বিএনপি দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকেও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ দেখায়নি। পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের দোসর হয়ে বদনাম কুড়িয়েছে। সন্ত্রাস ও দুর্নীতির কলঙ্ক মেখেছে গায়ে। বারোঘাটে পসরা সাজানো নেতাদের হাট বসিয়েছে নিজ দলে। এসব বাস্তবতার পরও মানতে হবে সময়ের সুবিধায় ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের ব্যর্থতায় বিএনপি এ দেশের অন্যতম বড় দলে পরিণত হয়েছে। তাই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বহুদলীয় রাজনীতির প্রয়োজন অপরিহার্য। এ কারণে বিএনপি অস্তিত্ব সংকটে পড়ে হতাশাক্রান্ত হোক তা গণতন্ত্রপ্রত্যাশী সচেতন মানুষ কামনা করে না।
আমাদের রাজনীতি কি একটি কঠিন সময় পার করছে? আসলে স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে আমাদের রাজনীতি সরল ও কোমল সময় অতিক্রম করেনি কখনো। আমাদের দুর্ভাগ্য এ দেশের রাজনীতিকরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দিয়ে রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করে গণতন্ত্রের পথে কখনো হাঁটলেন না। জন-আকর্ষকও হতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধোত্তর রাজনীতি যদি দলীয়করণের বদ্ধ চিন্তায় আটকে না যেত, তাহলে আমাদের রাজনীতির ভাগ্যাকাশে বোধ হয় অন্যভাবে সূর্য উঠত। দ্বিধাবিভক্ত হতো না সমাজ। জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধার গৌরব সরিয়ে রেখে পাকিস্তান পন্থার প্রায়োগিক রূপ দিতে মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতাকারী যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন করতেন না। আওয়ামী লীগ নেতারা জাতীয় নেতৃত্ব ধারণের প্রসারতায় না গিয়ে দলীয় নেতৃত্বের বলয়ে আটকে গেলেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ শক্তি বলে সমাজে ভাঙন এলো। এভাবে গণতন্ত্রের পথ ক্রমাগত বন্ধুর হতে থাকল।
প্রত্যক্ষভাবে গণতন্ত্র নির্বাচনী গণতন্ত্রের মধ্যেই আটকে গেল। নির্বাচন হলো আইনিভাবে ক্ষমতা পালাবদলের হাতিয়ার। তাই গণতান্ত্রিক পরিচ্ছন্ন পথে নয়, ছলে-বলে-কৌশলে নির্বাচনকে ক্ষমতাপ্রিয় দলগুলো যার যার মোক্ষে পৌঁছার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে লাগল। ফলে আমাদের রাজনীতিতে গণতন্ত্রচর্চার সব পথ বন্ধ করে দিয়ে নির্বাচনী হাতিয়ার যার যার মতো করে খুঁজতে লাগল। অর্থাৎ ক্ষমতাপ্রিয় সব পক্ষের একমাত্র চাওয়া মসনদে বসা। ক্ষমতাবান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সবাইকেই একাধিকবার সরকার পরিচালনা করতে দেখেছে এ দেশের মানুষ। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কারও মনোযোগ ছিল এমন কথা বলা যাবে না। সরকার চালাতে গিয়ে কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করতেই হয়। তেমন কাজে কোনো পক্ষ একটু বেশি সফল, কোনো পক্ষ একটু কম সফল। এ নিয়েই নিজ গুণগান গাইতে থাকে দলগুলো। সংশ্লিষ্ট মহাজনরা একবারও বলেন না তারা প্রশাসনিক ও সামাজিক দুর্নীতি থেকে কেন সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে পারেন না! কেন রাজনীতি দুর্নীতিপরায়ণ রাজনীতিক, আমলা ও ব্যবসায়ীদের হাতে বন্দি হয়ে পড়ছে! দলবৃত্তিতে পূর্ণ মনোযোগ থাকায় কেন গণতান্ত্রিক সব কাঠামো একে একে ভেঙে পড়ছে!
আমাদের রাজনীতির নেতা-নেত্রীরা প্রায়ই আক্ষেপ করেন, রাজনীতিকদের ঢালাওভাবে সমালোচনা করা হয়। আসলে সমালোচনার বদলে শব্দটা হবে ‘নিন্দা’। ওটা অবশ্য মুখ ফুটে তারা বলেন না। তবে আমাদের দেশের নেতা-নেত্রীদের একা দোষ দিয়ে লাভ নেই। দক্ষিণ এশিয়ার সব রাজনীতিকের দশাই এক। ভারতীয় টিভি চ্যানেলের নাটক, চলচ্চিত্র সর্বত্রই নীতিহীনতা, পেশিশক্তি পোষণ, দুর্নীতির গডফাদার হওয়া এমনি সব নেতিবাচক কর্মকা-ে রাজনীতিকদের চরিত্র চিত্রণ করা হচ্ছে। এসব চরিত্র জীবন থেকে নেওয়া বলে তা দেখে মানুষ বিস্মিত হচ্ছে না। চারপাশের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছে। শুধু এ কারণে আমাদের রাজনীতিকদের দুঃখ করে লাভ নেই। ভক্তির ইমেজ তলানিতে নামিয়ে এনেছেন তারাই। ফলে বক্তৃতায় দুঃখ না করে ইমেজ বাড়ানোর বাস্তব কর্মপন্থা তাদেরই বের করতে হবে। কিন্তু দেখে মনে হয় না এ পথ মাড়াবেন তারা।
আমার এক পরিচিত পরিবারের মেয়ের জন্য বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাবক জানালেন মেয়ের ভাই অমুক সিটি করপোরেশনের একজন ওয়ার্ড কমিশনার। সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের মা বেঁকে বসলেন। বললেন, সন্ত্রাসী পরিবারে মেয়ের বিয়ে দেবেন না। তিনি ছেলের পরিবার সম্পর্কে জানেন না। ছেলের ভাইয়ের নামও শোনেননি। কিন্তু সাধারণ ধারণা তৈরি হয়ে গেছে আজকাল যারা ‘জনপ্রতিনিধি’ হন তারা সুস্থধারার পরিবার নন। যদিও এমন সাধারণীকরণে অনেক শোভন মার্জিত নেতাদের প্রতি অবিচার করা হবে। কিন্তু কঠিন বাস্তবতার কারণে সাধারণ মানুষ দলীয় বৃত্তে থাকা নেতাদের একটি শ্রেণিচরিত্রই যেন তৈরি করে ফেলেছে। এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে রাজনৈতিক নেতাদেরই ভাবতে হবে।
সেই ফখরুদ্দীন-মইনউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে যতই দোষারোপ করুন না কেন, আমি তো বলব সেই সরকারের মধ্য দিয়ে পাপমোচন করে নবজন্ম নেওয়ার একটি সুযোগ রাজনীতিকদের এসেছিল। কিন্তু সে সুযোগ তারা গ্রহণ করেননি।
সে সময়ের ঘটনাপ্রবাহ স্মরণে আনা যাক। মনে হয়েছিল দীর্ঘদিনের সুবিধাবাদের জরা ভেঙে রাজনীতিকরা পরিশুদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করবেন। সচেতন যুক্তিবাদী মানুষ মানবেন, আমাদের দেশের বাম ঘরানার রাজনীতি অনেক আগেই তাদের শৌর্যবীর্য হারিয়ে ফেলেছেন। রাজনৈতিক আদর্শ আর ব্যক্তিগত জীবনাচার্যে বাম রাজনীতিকদের অনেকেই সম্মিলন না করতে পেরে খেই হারিয়ে ফেলেছেন। বাস্তবতার সঙ্গে আদর্শের সমন্বয় না ঘটিয়ে তত্ত্বনিষ্ঠ হয়ে গুটিয়ে গেছেন। বুর্জোয়া রাজনীতির ধারক হলেও দীর্ঘ ঐতিহ্য এবং মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগের কাছে মানুষের প্রত্যাশা তাই একটু বেশিই। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কখনো হতাশা লুকোতে পারেননি। তারা জনগণের শক্তির ওপর ভরসা না রেখে আমলা ও ব্যবসায়ীদের ওপর অধিক ভরসা রেখে ক্ষমতাকেন্দ্রে পৌঁছার চেষ্টা করেছে। ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনের মধ্য দিয়ে পেশিশক্তি তৈরি করতে চেয়েছে। তৈরি করেছে বশংবদ বুদ্ধিজীবী শ্রেণি। ফলে তৃণমূল পর্যন্ত দল সুসংহত করার তেমন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাই আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক আচরণ তেমন প্রকাশ্য হয়নি মানুষের সামনে। নানা সময়ে সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সে সময় আওয়ামী লীগ আত্মবিশ্বাসী হলে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন থেকে বেরিয়ে আসতে পারত।
নির্বাচনী ট্রেন মিস করা বিএনপি হতাশায় না ডুবে, গৎবাঁধা সরকার সমালোচনায় ব্যস্ত না থেকে ঘর গুছানোয় সময় দিতে পারত। আওয়ামী লীগ সরকারের দৃশ্যমান অর্থনৈতিক উন্নয়নকে হালকাভাবে হলেও সাধুবাদ জানাতে পারত। অন্তত বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পরও একটি অভিনন্দন বার্তা পাঠাতে পারত। কিন্তু এসব আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নেই। দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণে এমন সংস্কৃতির চর্চা করতে পারে না কেউ। মাঝেমধ্যে নিজেকেই প্রশ্ন করি, ভালোকে ভালো বলে একটি ইতিবাচক ধারা লালন করার সাহস বা শোভন আচরণ কি আমাদের রাজনীতিকরা দেখাতে পারবেন না? বাস্তবতা দেখে মনে হয় আমাদের রাজনীতিকরা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাজনীতি করছেন। মানুষ কীভাবে তাদের বক্তব্য নিল বা না নিল তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। তারা হাস্যকরভাবে প্রলাপ বকেই যাচ্ছেন।
দলীয় রাজনীতিকে এতটাই নীতিহীন করে ফেলা হয়েছে যে, রাজনীতিসংশ্লিষ্টরা দলকে ভালোবাসছেন বিবেককে বলি দিয়ে। এর পেছনে বোধহয় কিছুটা লাভ-লোভ, কিছুটা দলের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা আর কিছুটা বিরোধী পক্ষকে শত্রু জ্ঞান করার সংস্কৃতি কাজ করে। তাই নিজ দলের অন্যায়ের সমালোচনা দল-সংশ্লিষ্ট মানুষরা করতে শেখেননি। ফলে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে দলের পরিশুদ্ধি হওয়ার যে সুযোগ ছিল তা তিরোহিত হয়েছে বারবার। সংগতভাবেই আশা করার কারণ থাকে যে, দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সুশীলসমাজের বুদ্ধিজীবীরা অন্তত বিবেকের শাসনে চলবেন। তারা লাইনচ্যুত দলকে লাইনে তুলে দেবেন। সঠিক পথ দেখিয়ে দলের কল্যাণ করবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নেতা-নেত্রীর সুনজর পাওয়ার জন্য তারাও ব্যতিব্যস্ত থাকেন। এসব কারণে রাজনীতির প্রতি জন-আস্থা তৈরি হচ্ছে না।
এসবের পরও আশা করতে ইচ্ছা হয়। একটু-আধটু আলোর আভাস পেয়ে প্রত্যাশা জাগে, হয়তো রাজনীতিতে সুবাতাস বইবে। রাজনীতিবিচ্ছিন্ন হওয়া কারও কাম্য হতে পারে না। রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন না এলে আমাদের সব অর্জনই রসাতলে যাবে। আর এত কিছুর পরও যদি আমরা ঘুরে না দাঁড়াই তাহলে আলিঙ্গন করতে হবে অন্ধকারকেই।
আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, বিভিন্ন দলের রাজনীতিক আর কর্মী-সমর্থকরা যাতে মুক্তচিন্তা ও বিবেককে জাগিয়ে রেখে যার যার দলকে ভালোবাসেন। রাজনীতিকে জন-আস্থায় আনতে পারাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
লেখক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
